ভারতের ‘ককরোচ’ আন্দোলনে মুসলিম তরুণদের ভূমিকা কী

 ভারতের ‘ককরোচ’ আন্দোলনে মুসলিম তরুণদের ভূমিকা কী

ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লেও মুসলিম তরুণদের একটি অংশ আন্দোলনে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। এর পেছনে আন্দোলনের আদর্শের সঙ্গে মুসলিম তরুণদের মতপার্থক্য নয়; বরং হয়রানি, মিথ্যা মামলা, নজরদারি ও ভীতির আশঙ্কা কাজ করেছে। হোয়্যার ডু মুসলিম ইউথস ফিট ইন ইন্ডিয়াজ ‘ককরোচ’ প্রোটেস্টস শীর্ষক প্রবন্ধে এসব তথ্য জানিয়েছেন কবি ও গবেষক নাবিয়া খান।

মধ্যপ্রদেশ ও দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে সিজেপির বিক্ষোভের সময় কিছু মসজিদ থেকেও মুসলিম তরুণদের আন্দোলন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। অনেক মুসলিম শিক্ষার্থীর কাছে দেশের শিক্ষা, চাকরি ও পরীক্ষাব্যবস্থার সমস্যা নিয়ে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া নাগরিক দায়িত্বের অংশ হলেও, মুসলিম পরিচয়ের কারণে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিণতি তাদের জন্য অন্যদের চেয়ে আলাদা হতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ভারতের তরুণদের মধ্যে সিজেপি একটি নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার ধারণা তৈরি করেছে। আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি রসিকতা হিসেবে। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার তরুণদের ‘ককরোচ’ হিসেবে উল্লেখ করার পর সেই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। পরে তা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে এবং পরীক্ষা বাতিল, বেকারত্ব ও জবাবদিহির অভাব নিয়ে ক্ষুব্ধ বিপুলসংখ্যক তরুণ এতে যুক্ত হন।

মুসলিম তরুণদের আন্দোলন থেকে দূরে থাকার আহ্বানের পেছনে শুধু ভয় নয়, অতীত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও কাজ করছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২০ সালের দিল্লির সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর গ্রেপ্তার ও দীর্ঘমেয়াদি আটক থাকার ঘটনাগুলোকে মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক স্মৃতির অংশ। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার পরিণতি সম্পর্কে মুসলিমদের সতর্কতা তাই কেবল অনুমাননির্ভর নয়; বরং অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বারবার বলেছেন, ‘ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; এর পরিবর্তে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।’ পরীক্ষার অনিশ্চয়তা বা বেকারত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলনে একজন শিক্ষার্থীর ন্যায়বিচারের দাবি তোলার ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় বাধা হওয়া উচিত নয়। মুসলিমদের ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থেকে আলাদা হয়ে কেবল শিক্ষা ও চাকরির প্রশ্নে রাজনীতি করা সবসময় সম্ভব নয়।

মুসলিমদের রাজনৈতিক পরিচয় ও অধিকার নিয়ে বিতর্কের শিকড় বর্তমান সরকারের সময়ের চেয়েও পুরোনো। হিন্দুত্বের মতাদর্শিক বিকাশের প্রসঙ্গে বিনায়ক দামোদর সাভারকারের ১৯২৩ সালের ‘এসেনশিয়ালস অব হিন্দুত্ব’ গ্রন্থ উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতি ভারতের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলেছে।

মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহারের কারণে মুসলিম তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কতা তৈরি হয়েছে। মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘সন্ত্রাসী’ বা ‘দেশবিরোধী’ হিসেবে উপস্থাপনের রাজনৈতিক প্রবণতা তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও অন্যভাবে মূল্যায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে। একই সঙ্গে সিজেপি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিতর্ক আরো উত্তপ্ত হয়েছে।

সিজেপির আন্দোলন দেখিয়েছে যে ভারতের তরুণরা সংগঠিত হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চাপ সৃষ্টি করতে এবং সরকারের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু কোনো আন্দোলনকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক ও সর্বজনীন হতে হলে শুধু কত মানুষ রাস্তায় নামল, তা দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। বরং প্রশ্ন হলো—কোনো ব্যক্তি তার নাম, এলাকা বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে পরবর্তী সময়ে কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন, সেই হিসাব না করেই আন্দোলনে অংশ নিতে পারেন কি না।

ভারতের তরুণদের জন্য যে রাজনৈতিক আন্দোলন শিক্ষা, চাকরি ও জবাবদিহির কথা বলছে, সেখানে মুসলিম তরুণদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটি কতটা জায়গা পাচ্ছে। মুসলিমদের অভিজ্ঞতাকে ‘মূল সমস্যার বাইরে’ রেখে কোনো আন্দোলন যদি নিজেকে সব ভারতীয় তরুণের আন্দোলন হিসেবে দাবি করে, তবে সেই দাবির মধ্যে একটি মৌলিক অসঙ্গতি থেকে যায়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন