কলকাতার হোটেলে আগুন: চোখের সামনে আটকে ছিলেন অনেকে, আর্তচিৎকার

কলকাতার হোটেলে আগুন: চোখের সামনে আটকে ছিলেন অনেকে, আর্তচিৎকার

‘এখান থেকে যখন আমি ব্যাগ নিয়ে বের হচ্ছি, তখন দেখি চার তলা থেকে একজন টর্চ জ্বালিয়ে চিৎকার করছেন—দাদা, হেল্প!’ কলকাতার একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে কোনোমতে বেরিয়ে আসা এক বাংলাদেশি পর্যটক এভাবেই বর্ণনা করছিলেন তার আতঙ্কের মুহূর্তের কথা। আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে ওই ব্যক্তির সাহায্যের আকুতি শুনলেও তখন তাকে উদ্ধার করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। পরে দমকলকর্মীরা তাকে উদ্ধার করেন বলে জানতে পারেন ওই পর্যটক।

বুধবার ভোররাতে কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে আগুন লাগে। পাঁচতলা ভবনটিতে একাধিক হোটেল চলছিল। আগুনে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছে ভারতীয় ও বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ।

বিজ্ঞাপন

ঘটনাস্থলটি কলকাতায় বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে বেশ পরিচিত। চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া অনেক বাংলাদেশি পর্যটক নিউ মার্কেট, মারকুইস স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ও আশপাশের এলাকায় তুলনামূলক কম খরচের হোটেলে থাকেন।

অগ্নিকাণ্ডের সময় হোটেলে থাকা বাংলাদেশি পর্যটকদের কয়েকজন জানিয়েছেন, গভীর রাতে হঠাৎ তাদের ঘর ধোঁয়ায় ভরে যায়। অনেকেই ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। ঘুম ভাঙার পর চারপাশ থেকে মানুষের চিৎকার ও আর্তনাদের শব্দ শুনতে পান তারা।

ঢাকা থেকে কলকাতায় যাওয়া নাজিমুল ইসলাম ও তার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তারও ছিলেন ওই হোটেলে। তাদের ভাষ্য, রাত আনুমানিক ১টা ৪০ থেকে ৫০ মিনিটের দিকে দরজায় নক করে একজন আগুন লাগার খবর দেন।

তখন তারা দরজা দিয়ে বের হওয়ার পরিবর্তে জানালা দিয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে থাকেন। ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন তারা। পরে একজন পথচারী বিষয়টি দমকলকে জানান। দমকলকর্মীরা গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন।

অগ্নিকাণ্ডে ভবনের ভেতরে ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক কক্ষ থেকে বের হওয়ার পথও সংকীর্ণ ছিল। কয়েকটি কক্ষে পর্যাপ্ত জানালা না থাকায় আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করতে দমকলকর্মীদের বেগ পেতে হয়।

এই ঘটনায় অন্তত নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিক ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বাসিন্দা রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে।

বাংলাদেশি নিহতদের মধ্যে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের আরেক সদস্য থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। দেবাশীষ দত্ত একটি পত্রিকার কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, চিকিৎসার জন্য প্রায় ১৫ দিন আগে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন দেবাশীষ। প্রথমে বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা নেওয়ার পর কলকাতায় ফেরেন তারা। বুধবারই তাদের বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিল।

মঙ্গলবার পরিবারের সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলার সময়ও দেবাশীষ জানিয়েছিলেন, পরদিন সকালে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু তার আগেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পরিবারের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে তার মৃত্যু হয়।

মৃতদের শনাক্ত করতে কলকাতার মর্গ ও পুলিশ কাজ করছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের শনাক্তকরণে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

যে ভবনে আগুন লাগে, সেটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার একটি পুরোনো ও সংকীর্ণ ভবন। ভবনের ভেতরের সিঁড়িও ছিল তুলনামূলক সরু। ফলে আগুন লাগার পর দ্রুত নিচে নেমে আসা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এ ধরনের ভবনে একাধিক হোটেল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না। আগুন লাগার পর ভবনের বিভিন্ন অংশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

প্রাথমিকভাবে আগুনের কারণ নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে এলেও এখনো নিশ্চিত কোনো কারণ জানায়নি কর্তৃপক্ষ। শর্ট সার্কিট বা বৈদ্যুতিক ত্রুটির সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ ও দমকল বিভাগ তদন্ত শুরু করেছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতার পুরোনো ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা অভিযোগ করেছেন, কিছু হোটেল প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সংগঠনের পক্ষ থেকেও এসব হোটেল ও গেস্টহাউসের নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

ঘটনার পর কলকাতার বিভিন্ন হোটেল ও গেস্টহাউসে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনার দাবি জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে পর্যটক ও চিকিৎসা নিতে যাওয়া বিদেশি নাগরিকেরা যেসব বাজেট হোটেলে অবস্থান করেন, সেসব প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কুষ্টিয়ায় দেবাশীষ দত্তের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার বাড়িতে স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় সাংবাদিকেরা ভিড় করেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, চিকিৎসা শেষে বুধবার তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল।

দেবাশীষের এক আত্মীয় কৃষ্ণ নন্দী কলকাতার মর্গে গিয়ে লাশ শনাক্তের প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন দেবাশীষ। চিকিৎসার জন্য পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন তিনি।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক কর্মকর্তারাও নিহত বাংলাদেশিদের শনাক্তকরণ ও লাশ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।

কলকাতার এই অগ্নিকাণ্ডের মাত্র কয়েক দিন আগে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠে একটি অগ্নিকাণ্ডে কয়েকজনের মৃত্যু হয়। পরপর এসব ঘটনায় রাজ্যের হোটেল, গেস্টহাউস ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

কলকাতার সাম্প্রতিক এই ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য। চিকিৎসা, ব্যবসা ও অন্যান্য প্রয়োজনে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কলকাতায় যান এবং তাদের বড় একটি অংশ নিউ মার্কেট ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করেন।

একটি রাতের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে যে হোটেলে উঠেছিলেন তারা, সেই হোটেলই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে। আগুনের মধ্যে জানালা দিয়ে সাহায্যের আকুতি, ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে আসা এবং সংকীর্ণ সিঁড়িতে বের হওয়ার মরিয়া চেষ্টা—বেঁচে ফেরা পর্যটকদের বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই ভয়াবহ রাতের অভিজ্ঞতা।

অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো অনিয়ম ছিল কি না, তদন্ত শেষে তা স্পষ্ট হবে। তবে এই ঘটনায় কলকাতার হোটেলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন