দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে বর্তমানে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের ঢেউ লক্ষ করা যাচ্ছে, যা তামিলনাড়ু ও কেরালার চিরাচরিত ক্ষমতার সমীকরণকে তছনছ করে দিয়েছে। তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে রুপালি পর্দার জনপ্রিয় নায়ক থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম বা টিভিকে এক প্রবল ঝড়ের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তামিলনাড়ুর রাজনীতি মূলত ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে— এ দুই দ্রাবিড়ীয় শক্তির হাতেই আবর্তিত হয়েছে।
কিন্তু বিজয়ের সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ এবং তার দলের অভাবনীয় উত্থান এই দ্বিমুখী লড়াইকে এক ত্রিপক্ষীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ দিয়েছে। বিশেষ করে রাজ্যের তরুণ ভোটার এবং প্রথমবার ভোট দেওয়া ভোটারদের একটি বিশাল অংশ বিজয়ের জনমুখী ইশতেহার ও পরিবর্তনের ডাককে সাদরে গ্রহণ করেছে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ফলাফল অনুযায়ী, বিজয়ের দল শুধু গ্রামীণ এলাকাতেই নয়, বরং শহরাঞ্চলেও শাসক শিবিরের ভোটে বড়সড় থাবা বসিয়েছে, যা তামিল রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সাম্প্রতিক ফলাফল এবং গণনা অনুযায়ী তামিলনাড়ু ও কেরালার চিত্রটি বেশ রোমাঞ্চকর। কেরারায় দীর্ঘ দশ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগোচ্ছে। মোট ১৪০টি আসনের মধ্যে ইউডিএফ বর্তমানে ১০০টি আসনে এগিয়ে রয়েছে, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৭১টি আসনের ম্যাজিক ফিগার অনায়াসেই অতিক্রম করেছে। বিপরীতে সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন এলডিএফ মাত্র ৪০টি আসনে এগিয়ে আছে। অত্যন্ত চমকপ্রদ তথ্য হলো, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন তার নিজের কেন্দ্র ধর্মদমে কংগ্রেস প্রার্থীর কাছে পিছিয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া রাজ্যের ১৪ জন মন্ত্রীও এই মুহূর্তে হারের মুখে রয়েছেন। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট কেরলে মাত্র একটি আসনে এগিয়ে রয়েছে।
তামিলনাড়ুর ২৩৪টি আসনের গণনায় দেখা যাচ্ছে যে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে, কিন্তু প্রচারের সব আলো কেড়ে নিয়েছে অভিনেতা বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম বা টিভিকে। বিভিন্ন বুথফেরত জরিপ এবং প্রাথমিক ট্রেন্ড অনুযায়ী, বিজয়ের দল বড় বড় জোটের ভোটে বড়সড় ফাটল ধরিয়েছে। কিছু সংস্থার জরিপে দাবি করা হয়েছে যে টিভিকে ১০০-র কাছাকাছি আসন পেতে পারে, আবার কেউ কেউ বলছে তারা ১০ থেকে ২৬টি আসন জিতলেও কিং-মেকার হিসেবে আবির্ভূত হবে। তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনের জন্য ১১৮টি আসন প্রয়োজন, কিন্তু যেভাবে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-র মধ্যে লড়াই জমেছে, তাতে বিজয়ের দলের বিধায়করাই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার চাবিকাঠি হাতে রাখতে পারেন। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিনের ডিএমকে জোট ১১০ থেকে ১৩০টি আসনের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, অন্যদিকে এআইএডিএমকে জোট ১০০-র কাছাকাছি আসনে লড়াই দিচ্ছে।
কেরালায় বিগত কয়েক বছর ধরে চলে আসা বামপন্থী আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক সূর্যোদয় ঘটিয়েছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোট। কোরালার রাজনীতিতে সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ক্ষমতা পরিবর্তনের একটি প্রথা ছিল, যা গত নির্বাচনে পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট ভেঙে দিয়েছিল। তবে এবারের নির্বাচনে বাম দুর্গের পতন ঘটিয়ে কংগ্রেস প্রমাণ করেছে যে কেরলের মানুষের আস্থা তারা আবারও ফিরে পেতে সক্ষম হয়েছে।
এই নির্বাচনে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া এবং সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগকে কংগ্রেস অত্যন্ত সুচারুভাবে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেছে। কেরালায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ এবং কর্মসংস্থানের প্রত্যাশায় থাকা যুবকরা এবার বামপন্থিদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কংগ্রেসের হাতকে শক্তিশালী করেছে। কেরালার মতো একটি রাজ্যে যেখানে বামপন্থি আদর্শের শেকড় অনেক গভীরে, সেখানে কংগ্রেসের এই জয় জাতীয় রাজনীতিতেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
এই দুই রাজ্যের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— দক্ষিণের মানুষ কেবল পুরনো ঐতিহ্যে আটকে না থেকে নতুন নেতৃত্ব ও সচ্ছল প্রশাসনিক বিকল্পের দিকে ঝুঁকছে। একদিকে থালাপতি বিজয়ের কারিশমা এবং অন্যদিকে কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধি দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রকে আগামী দিনে আরও গতিশীল করে তুলবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই জোড়া পরিবর্তন আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধী শিবিরের পালে নতুন বাতাস যোগ করল।
এমবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

