আজ ২০ জুন সরকারিভাবে প্রথমবারের মতো ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ উৎসব হিসেবে পালিত হচ্ছে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করার পর দিনটিকে ‘পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি’ এবং ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার দিন হিসেবে উদযাপন করছে। তবে আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও এই দিনটি পালনের কোনো চল ছিল না।
বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অবস্থান ছিল, বাংলা ভাগ হওয়া কোনো উদযাপনের বিষয় নয়। কারণ এই দেশভাগের ফলে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন এবং স্বজন হারিয়েছিলেন।
সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০ জুনের পরিবর্তে পহেলা বৈশাখকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে বিজেপি সরকার গঠনের পর সেই সিদ্ধান্ত বদলে ২০ জুনকেই সরকারিভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
যেসব কারণে বিজেপি সরকার এই দিনটি উদযাপন করছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো
ইতিহাসের পাতায় ২০ জুনের সিদ্ধান্ত ও ভারতভুক্তি
আজ থেকে ৭৯ বছর আগে, ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় অবিভক্ত বাংলা ভাগ করা হবে কি-না, তা নিয়ে ভোটাভুটি হয়। ওই দিন মুসলিম সংখ্যাগুরু পূর্ববঙ্গ এবং হিন্দু সংখ্যাগুরু পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রতিনিধিরা আলাদাভাবে ভোট দেন। পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতাদের অধিকাংশ বাংলা ভাগের বিপক্ষে ভোট দিলেও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু জনপ্রতিনিধিরা বাংলা ভাগের পক্ষে ভোট দেন। এর ফলেই সিদ্ধান্ত হয় যে বাংলার পূর্ব অংশ পাকিস্তানে যাবে এবং পশ্চিম অংশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হবে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো একে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির দিন হিসেবে গণ্য করে।
আরএসএসের ইতিহাসবিদ রবি রঞ্জন সেনের মতে, এই দিনটিকে বাংলা ভাগের দিন হিসেবে না দেখে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি ও তার ভারতভুক্তির দিন হিসেবে দেখা উচিত।
‘বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড’ ও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর অবদান
স্বাধীনতার আগে বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং কংগ্রেস নেতা শরৎ চন্দ্র বসু বাংলাকে ভাগ না করে একটি স্বাধীন ‘যুক্তবঙ্গ’ গঠনের পরিকল্পনা (ইউনাইটেড বেঙ্গল প্ল্যান) করেছিলেন। হিন্দু মহাসভার নেতা ও জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করেন। জওহরলাল নেহেরু ও বল্লভভাই প্যাটেলও এর বিরোধী ছিলেন। বিজেপি ও আরএসএস শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে ‘পশ্চিমবঙ্গের জনক’ বলে মনে করে।
বিজেপির দাবি, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর লড়াইয়ের কারণেই বাঙালি হিন্দুরা নিজেদের জীবন সুরক্ষিত করার জন্য একটি ‘হোমল্যান্ড’ বা আবাসভূমি পেয়েছিল।
রাজনৈতিক স্বত্বা ও দুই বাংলার ভিন্ন পরিচয় প্রতিষ্ঠা
রাজ্যের বর্তমান মন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত মনে করেন, বাংলা ভাগ হওয়াটা অনিবার্য ছিল। তার মতে, দুই বাংলা যুক্ত থাকলে হিন্দু বাঙালিদের সমস্যা আরো বাড়ত। তিনি এক প্রবন্ধে লিখেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার চিরকাল বাংলায় হিন্দু রাজনৈতিক চেতনাকে অস্বীকার করেছে।
তিনি আরো দাবি করেন, ভারতের বাঙালি স্বত্বা এবং বাংলাদেশের বাঙালি স্বত্বার মধ্যে কিছু মিল থাকলেও দুটি পরিচয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই ভিন্ন পরিচয়কে উদযাপন করা এবং ‘বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড’ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসগত ভিত্তি তৈরি করতেই বিজেপি এই দিনটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
সরকারিভাবে যেভাবে পালিত হচ্ছে
পশ্চিমবঙ্গ দিবস উদযাপন করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কলকাতা সফরে এসেছেন। পশ্চিমবঙ্গ দিবস ও ২১ জুনের যোগ দিবস উপলক্ষে কলকাতায় তার দুই দিনের কর্মসূচি রয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন জেলা, ছোট শহর ও গ্রামে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ছবিতে মাল্যদান অনুষ্ঠান চলছে। সকালে কলকাতার ভবানীপুরে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মূর্তিতে মালা পরান বিজেপি নেতা অগ্নিমিত্রা পাল।
তিনি বলেন, ‘ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর জন্যই আমরা আজ বাংলাদেশে নেই। উনি না থাকলে হয়তো আমরা থাকতাম না।’
তবে এই উদযাপনের ভিন্ন মতও রয়েছে। ইতিহাসবিদ ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুগত বসু জানান, মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনায় আগেই দেশভাগ নিশ্চিত হয়েছিল, ২০ জুনের ভোটে শুধু সিলমোহর পড়েছিল। তার মতে, ‘এটা কোনো গৌরবের দিন নয়, এটি আত্মঘাতী বাঙালীর লজ্জার দিন।’
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


