পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শুরু

বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শুরু
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম দফার ভোটগ্রহণ কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। আজ স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাজ্যের উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে এই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। দ্বিতীয় দফায় ২৯ এপ্রিল বাকি ১৪২ আসনে ভোট হবে। আগামী ৪ মে ফল ঘোষণার মাধ্যমে এ ‘যুদ্ধের’ অবসান ঘটবে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস ও বিরোধী দল বিজেপির মধ্যে রীতিমতো যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

নির্বাচন ঘিরে রাজ্যে কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর কয়েক হাজার কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন কমিশন প্রতিদিনিই নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করছে, যা নিয়ে বাংলার সমাজ ও ভোটার স্পষ্টতই বিভক্ত হয়ে পড়েছে। মেরূকরণ ঘটেছে রাজ্যের রাজনীতিতে। একদিকে দিল্লির নির্দেশে ‘এসআইআর’ নামক বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে লাখ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া, অন্যদিকে দিল্লির দাপট ও বঞ্চনার প্রতিবাদে ‘ভোটাধিকার রক্ষা মঞ্চ’ আজকের নির্বাচনকে ‘কালো দিবস’ হিসেবে পালনের ডাক দিয়েছে। সব মিলিয়ে এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার নির্বাচন।

বিজ্ঞাপন

এদিকে গতকাল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, বিজেপি নির্বাচনে জিততে রাফাল বিমান ছাড়া সব নামিয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, যুদ্ধের সাঁজোয়া গাড়ি এখানে! মানুষকে এত ভয় কেন? সাঁজোয়া গাড়ি নিয়ে এসেছো কেন, গুলি চালাবে? মানুষকে হত্যা করবে?

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মমতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে বলেন, তরুণদের প্রতি বছর এক লাখ সরকারি চাকরি দেবে বিজেপি। ধর্মীয় মেরূকরণ করতে শাহ বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে বাবরি মসজিদ হতে দেওয়া হবে না। এ সময় তিনি হুমায়ুনকে মমতার চ্যালা বলেও কটাক্ষ করেন।

এ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট অন্যবারের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও সংঘাতপূর্ণ। অভিযোগ উঠেছে, বিজেপি স্বাভাবিক পথে ক্ষমতায় আসতে পারবে না জেনেই সুকৌশলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে বাংলা দখলের ছক কষছে, যে কৌশল মাস কয়েক আগে তারা বিহারে প্রয়োগ করে সফল হয়েছে। এসআইআরের নামে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৯১ লাখ মানুষ, যার মধ্যে অন্তত ৪০ লাখ বৈধ ভোটার রয়েছে। যদিও সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল ২১ এপ্রিলের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল যেসব বিবেচনাধীন ভোটারের তথ্য নিষ্পত্তি করবে, তাদের নাম তালিকায় তুলে ভোট দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু সে প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ রেখেই নির্বাচনের এ উন্মাদনা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ তৃণমূলের।

পরিসংখ্যান বলছে, প্রথম দফার আসনগুলোয় আগে যেখানে তিন কোটি ৯৮ লাখের বেশি ভোটার ছিল, নাম বাদ যাওয়ার পর সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিন কোটি ৬০ লাখ ৭৭ হাজার ১৭১ জনে। নিজের ভিটামাটিতেই আজ অস্তিত্বের লড়াইয়ে নামতে হয়েছে কয়েক লাখ মানুষকে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ায় কলকাতার পার্ক সার্কাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়ে অনেকেই তাদের ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।

বিশিষ্ট অধ্যাপক ও সমাজকর্মীরা সাফ জানিয়েছেন, জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২১(২) ধারা লঙ্ঘন করে অসম্পূর্ণ তালিকায় ভোট করানো মানে গণতন্ত্রের পবিত্রতা নষ্ট করা। ২০২৫-এর সঠিক ভোটার তালিকায় নির্বাচনের দাবিতে এ আন্দোলন এখন জনযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। ২২ এপ্রিলও পার্ক সার্কাস থেকে রাজাবাজার পর্যন্ত বিশাল গণমিছিল হয়েছে, যার রেশ আছড়ে পড়ছে শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে।

প্রথম দফার এ নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, দার্জিলিং থেকে শুরু করে দুই দিনাজপুর, মালদা ও মুর্শিদাবাদের পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের বীরভূম, পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং দুই মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে ভোটগ্রহণ হবে। নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এবং স্পর্শকাতর পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় ইতোমধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। ২১ এপ্রিল থেকেই এসব এলাকায় যেকোনো ধরনের জমায়েত, মিছিল, বাইক র‍্যালি, লাঠি বা অস্ত্র বহন এবং বহিরাগতদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে কমিশন।

এছাড়া ভোটের দিন জনসভা, লাউড স্পিকার ব্যবহার বা ভোটকেন্দ্রের ২০০ মিটারের মধ্যে কোনো ধরনের জটলা করা আইনত দণ্ডনীয়। কমিশন এবার কোনো ঝুঁকি না নিয়ে রেকর্ড দুই হাজার ৪০৭ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করছে, যার সিংহভাগ অর্থাৎ ৩১৬ কোম্পানি থাকছে স্পর্শকাতর মুর্শিদাবাদে। হেভিওয়েট আসন নন্দীগ্রামের দিকেও বিশেষ নজর রয়েছে বাহিনীর।

রাজনৈতিক সমীকরণের দিক থেকে প্রথম দফার নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মালদা ও মুর্শিদাবাদের মতো সংখ্যালঘু প্রধান জেলাগুলোয় তৃণমূল কংগ্রেস এবার মুসলিম ভোট হারাতে পারে বলে প্রবল গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তবে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, বিজেপির আগ্রাসন ও ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার ভীতি সংখ্যালঘু ভোটকে উল্টোভাবে শাসক দলের দিকেই সংহত করতে পারে।

বিভিন্ন জনমত সমীক্ষা যাই হোক না কেন, পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছে এবার লড়াইটা শুধু সরকার গড়ার নয়; বরং নিজের পরিচয় ও ভোটাধিকার বাঁচানোর। দিল্লির ক্ষমতার আস্ফালন বনাম বাংলার অধিকার রক্ষার এ দ্বৈরথে শেষ হাসি কে হাসবে, তা জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৪ মে পর্যন্ত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন