কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার জোনাইডাঙ্গাসহ আশপাশের প্রায় দশ গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের চাওয়া ছিল বুড়ি তিস্তার ওপর একটি ব্রিজ নির্মাণের। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিয়েও কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা না হওয়ায় অনেক ঝুঁকি ও কষ্ট করেই যাতায়াত করে আসছিল জনগণ। অবশেষে উলিপুর বাজারে বিভিন্ন মালামাল ওঠা-নামার কাজে নিয়োজিত কুলি আব্দুল করিম নিজে উদ্যোগী হয়ে নির্মাণ করে দেন সেই ব্রিজ।
উলিপুরের জোনাইডাঙ্গা গ্রামের পাশেই খালের ওপর কংক্রিটের পিলারে ভর করে আছে ইট, কাঠ আর লোহার তৈরি একটি ব্রিজ। যে ব্রিজের প্রতিটি পরতে পরতে লেগে আছে গরিব-অসহায় একজন মানুষের শরীরের ঘাম। নিজের পিঠে অন্যের মালামাল পরিবহন করে দীর্ঘ ২৫ বছরের সঞ্চয় দিয়ে অনেক শখ করে কিনেছিলেন একটি মোটরসাইকেল। শখের সেই মোটরসাইকেল ও দুটি ছাগল বিক্রি করে এবং সঞ্চিত সামান্য পুঁজি হাতে নিয়েই শুরু করেন ব্রিজের নির্মাণকাজ। অর্থ সংকুলান না হওয়ায় এক লাখ টাকা লোন নিয়ে ব্রিজের নির্মাণকাজ শেষ করেন। অবশেষে গত শুক্রবার সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় ব্রিজটি।
কুলি আব্দুল করিম বলেন, ‘আমি দীর্ঘ দুই যুগ ধরে এ খালের পাশের রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করি। এদিক দিয়ে যাওয়ার সময় স্কুলের ছাত্রছাত্রী, হাসপাতালগামী রোগী ও বৃদ্ধ মানুষকে অনেক কষ্ট করে যাতায়াত করতে দেখি। তখনই আমার মাথায় আসে এ খালের ওপর একটি ব্রিজ নির্মাণ করার, কিন্তু টাকা-পয়সা না থাকায় এতদিন শুরু করা সম্ভব হয়নি। এরপর আমার মোটরসাইকেল বিক্রি করে এবং জমানো কিছু টাকা দিয়ে কাজ শুরু করি। তাতেও সংকুলান না হওয়ায় এক লাখ টাকা লোন নিয়ে ব্রিজের কাজ শেষ করি।’
তিনি আরো বলেন, ‘সাধারণ মানুষের কষ্ট দূর করার উদ্দেশ্যেই ব্রিজটি নির্মাণ করি। এতে আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণ হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা যোবায়ের রহমান বলেন, ‘পাশেই হাসপাতাল অথচ সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিতে অনেক দূর ঘুরে আসতে হতো। অনেক সময় রোগী মারাও যেত। একজন গরিব মানুষ হয়ে আব্দুল করিম ভাই যে উদ্যোগ নিয়েছেন এটা অনেক সম্পদশালী মানুষের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে।’
ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম বলেন, একটা শখের মোটরসাইকেল ছিল, একটা খাসি ছিল, সেগুলো বিক্রি করে এবং কিছু টাকা লোন নিয়ে আব্দুল করিম ব্রিজটি তৈরি করেছেন। অনেক এমপি-মন্ত্রী ছিল কেউ সাহস পায়নি এ ব্রিজ করার। নিম্নআয়ের একজন কুলির মাধ্যমে এ ব্রিজটি হওয়াতে খুব সহজে এবং স্বল্প খরচেই আমরা পণ্য বাজারে নিয়ে যেতে পারছি।
স্কুলশিক্ষক শারমিন জাহান বলেন, বর্ষা মৌসুমে খাল পার হয়ে যেতে হয়। তাই স্কুলের ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে অনেক চিন্তায় থাকতাম আমরা। ব্রিজটি করে দেওয়ায় সময় বাঁচার সঙ্গে কষ্টও অনেক কমে গেছে।
এ বিষয়ে উলিপুর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম মেহেদী হাসান বলেন, ‘মানুষের দুর্দশা দূর করার জন্য আসলে সবাইকে এগিয়ে আসা দরকার। আমরা তা না করে শুধু প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে থাকি। সমাজের একেবারে নিম্নআয়ের একজন কুলি নিজের জমানো কয়েক লাখ টাকা খরচ করে মানুষের জন্য ব্রিজ করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তার এ কাজ অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

