ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকায় অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে সমাবেশ করেছে বিরোধী জোট। রোববার রামলীলা ময়দানে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। একই দিন পশ্চিম দিল্লিতে ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে পাল্টা মিছিল করেছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
বিরোধীদের ‘চলো দিল্লি’ কর্মসূচির মূল দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। অন্যদিকে বিজেপি বিরোধীদের এই কর্মসূচিকে ‘নাটক’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, এটি গণতন্ত্রের প্রতি অসম্মান।
বিরোধী জোটের সমাবেশে কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি এবং আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। প্রায় এক ডজন বিরোধী দলের নেতার উপস্থিতিতে আয়োজিত এ সমাবেশে কয়েক হাজার কর্মী-সমর্থকও যোগ দেন।
কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল গত মাসে এই সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ‘চলো দিল্লি, ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে আয়োজিত কর্মসূচিকে তিনি নির্বাচনী কারচুপি বন্ধ এবং দেশের গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করেন।
বিরোধীদের অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন রাজ্যে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম মুছে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া সংসদের অনুমোদন ছাড়াই ফরম-৬-এ পরিবর্তন আনা এবং ইসিনেটের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগও তুলেছে তারা।
সমাবেশের আগের দিন শনিবার বিরোধী জোটের একটি কর্মসূচিতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ছয় দফা অভিযোগসংবলিত একটি প্রতীকী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এতে অভিযোগ করা হয়, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের ষড়যন্ত্র করছে, ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ২০ লাখ ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে এবং সংসদীয় নজরদারি ছাড়াই ফরম-৬ পরিবর্তন করেছে। এ ছাড়া ইসিনেটের মাধ্যমে ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।
প্রস্তাবে আরো বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে অপর দুই নির্বাচন কমিশনারকে কার্যত বাইরে রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের প্রসঙ্গও তুলে ধরে বিরোধীরা।
কংগ্রেস নেতা বেণুগোপাল বলেন, ভোটার তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম হচ্ছে এবং একের পর এক রাজ্যে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। রাহুল গান্ধী নির্ভয়ে এসব প্রশ্ন তুলছেন এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা করছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বিজেপি বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এই কর্মসূচিকে ‘রাজনৈতিক নাটক’ বলে অভিহিত করেন। তার অভিযোগ, বিরোধীরা অরাজকতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে। তিনি বলেন, এ ধরনের সমাবেশ গণতন্ত্রের প্রতি অসম্মান এবং জনগণ বিরোধীদের এই রাজনৈতিক নাটক বুঝতে পারছে।
এদিকে বিরোধীদের সমাবেশে যোগ দিচ্ছে না ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে শনিবার দিল্লিতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তরুণদের আন্দোলনে সমর্থন দেওয়ার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানান। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, সিজেপি নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখবে এবং রোববারের বিরোধী জোটের কর্মসূচিতে অংশ নেবে না।
দিপকে বলেন, জন্তর মন্তরে তাদের প্রথম আন্দোলনের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তরুণদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। দিল্লি পুলিশ যখন সৌরভ ও আশুতোষকে গ্রেপ্তার করেছিল, তখনো তিনি আন্দোলনকারীদের সমর্থন দিয়েছিলেন। এ কারণে তাকে ধন্যবাদ জানাতেই মমতার সঙ্গে দেখা করেছেন বলে জানান তিনি।
সমাবেশকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর কেন্দ্রীয় ও নতুন দিল্লি এলাকায় প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে রামলীলা ময়দান এবং মিন্টো ব্রিজ থেকে সমাবেশস্থল পর্যন্ত এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় চার হাজার সদস্য। দিল্লি পুলিশ, কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (সিআরপিএফ) ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
কনট প্লেস, জন্তর মন্তর, ভগবান দাস রোড, সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের আশপাশে বহুস্তরবিশিষ্ট ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মধ্য দিল্লির বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও পথ পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা হয়। যাত্রীদের আগেভাগে যাতায়াতের পরিকল্পনা করার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ।
দিল্লি পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রোহিত রাজবীর জানান, পুরো এলাকায় ২০০ থেকে ২৫০টি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে। আয়োজকদেরও নিজস্ব নিয়ন্ত্রণকক্ষ রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও আয়োজকেরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।
কর্তৃপক্ষের অনুমতি অনুযায়ী, রামলীলা ময়দানের সমাবেশ বিকেল ৫টায় শেষ হওয়ার কথা। তবে ওই সময়ের পর কোনো ‘অপ্রত্যাশিত কর্মসূচি’ নেওয়া হতে পারে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অন্যদিকে, ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে পশ্চিম দিল্লিতে পাল্টা মিছিল করেছে বিজেপি। দলটির অভিযোগ, কংগ্রেস দাঙ্গার বার্ষিকীর সময়কে বেছে নিয়ে সমাবেশের আয়োজন করেছে। হরি নগর বাস ডিপো থেকে তিলক নগর মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত এ মিছিলে অংশ নেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, প্রতিমন্ত্রী হর্ষ মালহোত্রা, এইচ এস ফুলকা, মনজিন্দর সিং সিরসা এবং বিজেপি সাংসদ বাঁসুরি স্বরাজ।
বিজেপি সাংসদ বিক্রমজিৎ সিং সাহনিও দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে শহীদগঞ্জ সাহিব গুরুদুয়ারায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। ১৯৮৪ সালের সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের স্বজন ও বেঁচে যাওয়া অনেকে বিজেপির কর্মসূচিতেও যোগ দেন।
রাজনৈতিক দুই পক্ষের কর্মসূচির মধ্যে দিল্লির ব্যবসায়ীরাও উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, সড়ক বন্ধ ও যানজটের কারণে দীপাবলির আগে উৎসবের কেনাকাটার মৌসুমে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রতিবাদ করার অধিকারকে সমর্থন করলেও সমাবেশের স্থান ও সময় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
অটোমোটিভ পার্টস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিনয় নারাং বলেন, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের বিরোধীও নন। তবে সমাবেশের সময় ও স্থান ঠিক হয়নি। তাঁর ভাষ্য, চাঁদনি চক, সদর বাজার, দরিয়াগঞ্জ, মোরি গেট ও কাশ্মীরি গেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ পাইকারি বাজার সমাবেশস্থল থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে। এ ধরনের কর্মসূচির কারণে দিল্লির বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ীরা সাধারণত তিন দিন আগে ও পরে শহরে আসা এড়িয়ে চলেন।
সংগঠনটির সহসভাপতি রবীন্দর সিং কোহলি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দিনমজুর, কুলি, মালবাহী শ্রমিক ও ঠেলাগাড়িচালকেরা। তাদের অনেকের দৈনিক আয় ২০০ থেকে ৩০০ রুপি। এই আয়ের ওপরই তাঁদের পরিবারের খাবার জোটে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ধরমপাল রাত্রা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বিক্ষোভের কারণে ব্যবসায়ীদের দুই হাজার রুপির বেশি ক্ষতি হতে পারে।
তবে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়েছেন রাহুল গান্ধী। সমাবেশে আসা লোকজনকে প্রতিবাদের পাশাপাশি দিল্লির বাজার থেকে কেনাকাটা করার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এতে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। রাহুল বলেন, সমাবেশের কারণে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হবে না; বরং বিজেপি ভয় পেয়েছে বলেই এ ধরনের আশঙ্কা ছড়াচ্ছে।
এদিকে দিল্লির এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও সমাবেশের মূল বিষয় হয়ে উঠেছে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা এবং ১৯৮৪ সালের দাঙ্গা নিয়ে কংগ্রেস-বিজেপির পাল্টাপাল্টি অবস্থান। আগামী দিনে নির্বাচন কমিশন ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এ বিরোধ কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নজর রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

