মজলুমের অশ্রুভেজা আসামের মাটি, ইতিহাসের সত্য ও বর্তমানের নিপীড়ন

মজলুমের অশ্রুভেজা আসামের মাটি, ইতিহাসের সত্য ও বর্তমানের নিপীড়ন

আসামের মাটি শুধু পাহাড়, নদী, চা-বাগান আর সবুজ উপত্যকার ইতিহাস ধারণ করে না; এই মাটির গভীরে মিশে আছে পরিশ্রমী মানুষের ঘাম, বাস্তুচ্যুত পরিবারের কান্না, রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের দীর্ঘ ছায়া এবং পরিচয় রক্ষার সংগ্রাম। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ঘর হারানো মানুষ, অনাবাদি জমিকে চাষযোগ্য করে তোলা কৃষক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করা বাংলাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠী আজও নিজেদের অস্তিত্ব ও নাগরিক পরিচয়ের প্রশ্নে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। তাদের ইতিহাসকে কেবল ‘অনুপ্রবেশ’-এর একরৈখিক বয়ানে সীমাবদ্ধ করে দেখা হলে আসামের বাস্তবতা, ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার এবং বর্তমানের মানবিক সংকট—কোনোটিই যথাযথভাবে বোঝা সম্ভব নয়।

আসামের বর্তমান সংকটের শিকড় খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দিকে। ১৮২৬ সালের ইয়ানডাবু চুক্তির পর ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসামের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো বদলাতে শুরু করে। কৃষি সম্প্রসারণ, রাজস্ব আদায় এবং অনাবাদি জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনার স্বার্থে ঔপনিবেশিক সরকার বিভিন্ন সময়ে কৃষকদের বসতি স্থাপন ও জমি চাষে উৎসাহিত করে। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহ, রংপুর ও পাবনা অঞ্চল থেকে বহু দরিদ্র কৃষক জীবিকার সন্ধানে আসামে আসেন। নদীবিধৌত চরাঞ্চল, জলাভূমি ও বনভূমির কিছু অংশে তারা কৃষিকাজ শুরু করেন, বসতি গড়ে তোলেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখেন।

বিজ্ঞাপন

এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মানুষের স্থানান্তরকে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে চলে না; এর পেছনে থাকে রাষ্ট্রের ভূমিনীতি, অর্থনৈতিক প্রয়োজন, নদীভাঙন, দারিদ্র্য এবং জীবিকার সংকট। ব্রিটিশ শাসকেরা যে কৃষি সম্প্রসারণ ও রাজস্ব আদায়ের নীতি গ্রহণ করেছিল, স্বাধীনতার পর সেই ইতিহাসের দায়ভার অনেক সময় বহন করতে হয়েছে সাধারণ কৃষক ও তাদের উত্তরসূরিদের। একদিকে তাদের শ্রমে জমি উৎপাদনশীল হয়েছে, অন্যদিকে সময়ের পরিবর্তনে সেই জমিতে বসবাসের অধিকারই তাদের জন্য অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

‘লাইন সিস্টেম’: বিভাজনের ইতিহাস

আসামের বাংলাভাষী মুসলিম কৃষকদের ইতিহাসে ‘লাইন সিস্টেম’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়। ঔপনিবেশিক আমলে অভিবাসী কৃষকদের বসতি ও চাষাবাদ নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা বা সীমানা নির্ধারণের যে ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তা শুধু ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল জাতিগত পরিচয়, সামাজিক দূরত্ব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অভিবাসী কৃষকদের সম্পর্কের জটিলতা।

এই ব্যবস্থার পেছনে জমির ওপর চাপ, স্থানীয় অধিবাসীদের অধিকার এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মতো বাস্তব প্রশ্ন থাকলেও, এর প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে বাংলাভাষী কৃষকদের আলাদা করে দেখার প্রবণতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। ফলে জমি ও জীবিকার প্রশ্ন ক্রমে ভাষা, জাতিগত পরিচয় এবং ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে।

এখানে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা জরুরি: স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমি, সংস্কৃতি ও ভাষার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বহু প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী অন্য জনগোষ্ঠীর জীবন, জীবিকা ও নাগরিক মর্যাদাও উপেক্ষা করা যায় না। এক পক্ষের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে অন্য পক্ষকে স্থায়ীভাবে সন্দেহভাজন করে রাখা ন্যায়বিচারের পথ নয়। ইতিহাসের দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র নিজের অতীত নীতির জটিলতা থেকে মুক্ত হতে পারে না।

১৯৭১: নাগরিকত্ব নির্ধারণের সীমারেখা

১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আসামের জনমিতি, অভিবাসন ও নাগরিকত্বের বিতর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। যুদ্ধের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আশ্রয় নেয়। পরবর্তী সময়ে অনিয়মিত অভিবাসনের প্রশ্নও রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে থাকে। তবে আসামের সব বাংলাভাষী মুসলিমকে সাম্প্রতিক অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো ভিত্তি নেই। অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অঞ্চলে বসবাস করছে।

১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তিতে ২৪ মার্চ ১৯৭১-কে নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে নাগরিকত্ব আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধির আওতায় আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি হালনাগাদের প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। আসামের এনআরসি কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ১৯৫১ সালের নাগরিকপঞ্জি, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ মধ্যরাত পর্যন্ত নির্বাচনি তালিকা এবং নির্ধারিত অন্যান্য নথি নাগরিকত্বের যোগসূত্র প্রমাণের ক্ষেত্রে বিবেচিত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল নাগরিকদের শনাক্ত করা; কিন্তু বাস্তবে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনে এটি অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট প্রকাশিত চূড়ান্ত এনআরসি থেকে ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জনের নাম বাদ পড়ে। কিন্তু এই সংখ্যা দিয়ে বাদ পড়া ব্যক্তিদের ধর্মীয় পরিচয় নির্ধারণ করা যায় না। ধর্মভিত্তিক নির্ভরযোগ্য সরকারি বিভাজন ছাড়া তাদের সবাইকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা ভাষাগত জনগোষ্ঠীর সদস্য বলা তথ্যসম্মত হবে না। একইভাবে, তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে চূড়ান্তভাবে বিদেশি ঘোষণা করা নয়; আইনি প্রক্রিয়ায় নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা ও চ্যালেঞ্জ করার সুযোগের প্রশ্নও রয়েছে।

কিন্তু এখানেই প্রশ্ন ওঠে—দশকের পর দশক ধরে একটি অঞ্চলে বসবাস করা মানুষের নাগরিকত্বের দাবি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া যদি দীর্ঘদিন অসম্পূর্ণ থাকে, তাহলে তাদের দৈনন্দিন জীবন কীভাবে স্বাভাবিক থাকবে? পরিচয়পত্র, জমির কাগজ, জন্মনিবন্ধন, পুরোনো ভোটার তালিকা কিংবা পারিবারিক নথির সামান্য ঘাটতি কি একজন মানুষের জীবনের সব অর্জনকে সন্দেহের মুখে ঠেলে দিতে পারে? দারিদ্র্য, নদীভাঙন, ঘন ঘন স্থানান্তর এবং নথি সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা যাদের বাস্তবতা, তাদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরো মানবিক ও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।

এনআরসি প্রকাশের সাত বছর পরও প্রক্রিয়ার পরবর্তী আইনি ধাপ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা এই অনিশ্চয়তাকে আরও স্পষ্ট করে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা এক আবেদনে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয়পত্র প্রদান এবং বাদ পড়াদের আপিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি তোলা হয়। অর্থাৎ, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া কেবল তালিকা প্রকাশের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় না; সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের আইনি অধিকার নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

উচ্ছেদ: জমি উদ্ধারের নামে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত

আসামের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান। সরকারি জমি, বনভূমি কিংবা জলাভূমি দখলমুক্ত করার যুক্তিতে পরিচালিত এসব অভিযানে বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। জমির মালিকানা ও সরকারি সম্পত্তি রক্ষার প্রশ্নকে একেবারে অস্বীকার করা যায় না; কিন্তু সেই যুক্তি দিয়ে উচ্ছেদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক পরিণতি উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

২০২৫ সালের জুনে গোলপাড়ার হাসিলাবিল এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। জলাভূমি এলাকার ১ হাজার ৫৫০ বিঘা জমি থেকে ৬০০টির বেশি পরিবারকে সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। একই বছরের জুলাইয়ে ধুবড়ি জেলায় বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত জমি থেকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ পরিবার উচ্ছেদের খবর প্রকাশিত হয়। এসব পরিবারের বড় অংশ বাংলাভাষী মুসলিম।

এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে হাজার হাজার মানুষের জীবন। একটি বাড়ি ভেঙে ফেলা মানে শুধু ইট, কাঠ, টিন কিংবা বাঁশের কাঠামো সরিয়ে দেওয়া নয়। এর সঙ্গে ধ্বংস হয় একটি পরিবারের সঞ্চয়, শিশুদের পরিচিত পরিবেশ, শিক্ষার ধারাবাহিকতা, নারীদের নিরাপত্তা এবং বয়স্কদের আশ্রয়। বহু পরিবার ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে পূর্বের বসতি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত হওয়ার পরও যদি তারা স্থায়ী নিরাপত্তা না পায়, তাহলে তাদের জীবনে বাস্তুচ্যুতি যেন এক অবিরাম চক্র হয়ে দাঁড়ায়।

নদীভাঙন, জমির নীতিমালা ও বাংলাভাষী মুসলিমদের ভূমিহীনতার মধ্যকার সম্পর্ক রয়েছে। ধুবড়ির উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের বসতি হারানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। অর্থাৎ, বর্তমানের ভূমিসংকটকে শুধু ‘অবৈধ দখল’ শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে নদীভাঙন, দারিদ্র্য, পুনর্বাসনের অভাব এবং জমির অধিকারসংক্রান্ত জটিল বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়।

রাষ্ট্রের জমি রক্ষা করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের পদ্ধতিও আইন, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদার সীমার মধ্যে থাকতে হবে। উচ্ছেদের আগে যথাযথ নোটিশ, অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ, জমির মালিকানা বা দখলসংক্রান্ত দাবি যাচাই এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন—এসব প্রশ্নকে গুরুত্ব না দিলে প্রশাসনিক অভিযান সামাজিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

গোলপাড়ার হাসিলাবিল এলাকায় উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বিষয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গৌহাটি হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়। অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকা পরিবারগুলোর জন্য বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্যসহায়তা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে আদালত প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়। এই ঘটনা দেখায়, উচ্ছেদ-পরবর্তী মানবিক সংকট কোনো গৌণ বিষয় নয়; বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবন ও মর্যাদা রক্ষাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।

পরিচয়ের রাজনীতি ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন

বাংলাভাষী মুসলিমদের ঘিরে ‘মিয়া’ পরিচয়, ‘বিদেশি’ তকমা এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দের ব্যবহার আসামের সামাজিক বাস্তবতাকে আরো জটিল করে তুলেছে। কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে আইনগত প্রশ্ন থাকলে তার উত্তর হওয়া উচিত প্রমাণ, নথি ও ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কিন্তু ভাষা, ধর্ম কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখা হলে ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ ও একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সামগ্রিক বিদ্বেষের পার্থক্য মুছে যায়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২০ সালের প্রতিবেদনে আসামের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন বিতর্কে বাংলাভাষী মুসলিমদের সামগ্রিকভাবে সন্দেহভাজন হিসেবে দেখার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করা বাংলাভাষী মুসলিমদেরও অনেক সময় অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ ধরনের সাধারণীকরণ ভূমি ও জীবিকার প্রশ্নকে সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের সংঘাতে পরিণত করতে পারে।

এখানে স্থানীয় আদিবাসী ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অধিকার, ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য এবং ভূমির ওপর ন্যায্য দাবিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু অধিকার রক্ষার নামে আরেকটি জনগোষ্ঠীর নাগরিক মর্যাদা খর্ব করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। বরং ন্যায়সংগত ভূমিনীতি, স্বচ্ছ নাগরিকত্ব যাচাই, বৈষম্যহীন প্রশাসন এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনই বিরোধ কমানোর কার্যকর পথ।

ইতিহাসের দায়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব

আসামের বাংলাভাষী মুসলিমদের ইতিহাস কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। ঔপনিবেশিক ভূমিনীতি, কৃষি সম্প্রসারণ, দেশভাগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, নাগরিকত্বের আইনি কাঠামো, নদীভাঙন এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘ পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে এই ইতিহাসের জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই জটিলতাকে অস্বীকার করে কোনো জনগোষ্ঠীকে এককভাবে দায়ী করা যেমন ইতিহাসের প্রতি অবিচার, তেমনি সব ভূমিসংক্রান্ত বিরোধকে নিছক পরিচয়গত নিপীড়ন বলে ঘোষণা করাও বাস্তবতার পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। প্রয়োজন হলো প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিটি প্রশ্নের ন্যায়সংগত সমাধান।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: সরকারি জমি উদ্ধারের নামে কোনো পরিবারকে আশ্রয়হীন করে ফেলার পর তার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো দায় থাকবে না—এমন ধারণা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া যদি মানুষের জীবনকে বছরের পর বছর অনিশ্চয়তায় রাখে, তাহলে সেই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। আর কোনো জনগোষ্ঠী যদি ভাষা ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বারবার সন্দেহ, অপমান কিংবা উচ্ছেদের মুখে পড়ে, তাহলে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা আরো জরুরি হয়ে ওঠে।

আসামের ইতিহাসকে বুঝতে হলে কেবল মানচিত্রের সীমানা কিংবা সরকারি নথির দিকে তাকালেই চলবে না; তাকাতে হবে সেই কৃষকের দিকে, যে অনাবাদি জমিতে ফসল ফলিয়েছে; সেই পরিবারের দিকে, যার বসতি ব্রহ্মপুত্রের স্রোতে বিলীন হয়েছে; সেই শিশুর দিকে, যে ঘর হারিয়ে অস্থায়ী আশ্রয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে; আর সেই নাগরিকের দিকে, যে নিজের জন্মভূমিতেই পরিচয়ের প্রমাণ দিতে দিতে ক্লান্ত।

শ্যামল আসামের মাটিতে বহু জনগোষ্ঠীর শ্রম, স্মৃতি ও ইতিহাস মিশে আছে। এই মাটির ওপর অধিকার নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, আইনগত বিরোধও থাকতে পারে। কিন্তু সেই বিরোধের নিষ্পত্তি হতে হবে ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে—সামগ্রিক সন্দেহ, বৈষম্য কিংবা পুনর্বাসনহীন উচ্ছেদের মাধ্যমে নয়। ইতিহাসের সত্যকে স্বীকার করা এবং বর্তমানের নিপীড়ন ও মানবিক সংকটের অবসান ঘটানো—আসামের ভবিষ্যৎ শান্তি ও সহাবস্থানের জন্য এই দুই কাজই অপরিহার্য।

সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ, স্ক্রল, অক্সফোর্ড রিসার্চ এনসাইক্লোপিডিয়া অব এশিয়ান হিস্ট্রি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...