কলকাতার হোটেলপাড়ায় অগ্নিকাণ্ডে

হঠাৎ ২০০ হোটেল বন্ধ, ফিরছেন বাংলাদেশিরা

হঠাৎ ২০০ হোটেল বন্ধ, ফিরছেন বাংলাদেশিরা
ফাইল ছবি

কলকাতার নিউমার্কেট-সংলগ্ন এলাকা বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে খুবই পরিচিত একটি নাম। সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, লিন্ডসে স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট তথা ফ্রি স্কুল স্ট্রিট নিয়ে কলকাতার এই বিখ্যাত ‘হোটেলপাড়া’ গড়ে উঠেছে। মূলত চিকিৎসার প্রয়োজনে বাংলাদেশ থেকে আসা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পর্যটকেরা এসব হোটেলে অবস্থান করেন। কারণ, এ এলাকায় সুলভে হোটেল বা গেস্ট হাউসে থাকার সুবিধা রয়েছে।

তাছাড়া এখানে হাতের কাছেই মানি এক্সচেঞ্জ, দূরপাল্লার বাস কাউন্টার এবং ফুটপাতে নানা ধরনের খাবারের দোকান রয়েছে। এতে তারা নানাবিধ সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

তবে অতি সম্প্রতি এই এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেল ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাতজন বাংলাদেশির প্রাণহানিতে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ীসহ বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। টাকা খরচ সত্ত্বেও নানা অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতায় ক্ষুব্ধ এখানে আসা বাংলাদেশিরা। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর অনেকেই তড়িঘড়ি করে হোটেল ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছেন।

এত বড় প্রাণহানির পেছনে প্রশাসনের চরম গাফিলতি এবং অবৈধ ব্যবসাকেই সরাসরি দায়ী করছেন অনেকে। এই এলাকায় বেআইনি হোটেল ও গেস্ট হাউসের ছড়াছড়ি দেখা যায়। এখানকার বাড়ির মালিকেরা বেশি টাকার লোভে নিজেদের বাড়িগুলো সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে আবাসিক হোটেলে পরিণত করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা এসব অনিয়ম দেখেও না দেখার ভান করেন। যে হোটেলে অগ্নিকাণ্ড হয়, তার একটা ভবন পরেই পশ্চিমবঙ্গের ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তর। তাই প্রশাসনিক মদত ছাড়া এসব হোটেল চলতে পারে না। অনেক হোটেলের কোনো বৈধ লাইসেন্স পর্যন্ত নেই। দেখা যায়, একটি পাঁচতলা ভবনেই ১০টি পর্যন্ত ছোট ছোট হোটেল বা গেস্ট হাউস চালানো হচ্ছে। ঘরের ভেতরে পার্টিশন দিয়ে অত্যন্ত ছোট আকারের কক্ষে চলছে হোটেল ব্যবসা।

এসব হোটেলে পর্যটকদের নিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থা রাখা হয়নি। বাংলাদেশি পর্যটক উজ্জ্বল খান জানান, অনেক হোটেলের প্রবেশ এবং বের হওয়ার পথ এতটাই সরু যে বিপদের সময় দ্রুত বের হওয়ার কোনো উপায় থাকে না। আগুন লাগার খবর পেয়ে তিনি নিজে হোটেলের বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

এলাকার বেশিরভাগ হোটেলেই ফায়ার এক্সিট বা জরুরি নির্গমন পথ নেই। লোহার সিঁড়ি বানিয়ে দোতলা বা তিনতলায় ওঠার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া যত্রতত্র বিদ্যুতের তার জোড়া লাগিয়ে এসি ও টিভি চালানো হচ্ছে। এসব হোটেলের পরিবেশ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কখনো জরিপও চালানো হয়নি।

সাম্প্রতিক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড পর্যটকদের মনে গভীর ক্ষোভ ও ভীতি তৈরি করেছে। খবর পেয়ে অনেকেই ভয়ে কাতর হয়ে পড়েন এবং সারাদিন তারা খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত করতে পারেননি। বাংলাদেশের যাত্রাবাড়ী থেকে আসা পর্যটক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কলকাতার মতো এত বড় শহরে হোটেলের এমন বেহাল দশা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। তার মতে, হোটেলগুলো প্রচুর টাকা নিলেও তাদের সেবা অত্যন্ত নিম্নমানের এবং সেখানে নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাই নেই। পুরনো ভবনগুলোতে সিঁড়ি এতই সরু যে, একসঙ্গে দু-তিনজন মানুষও ঠিকমতো নামতে পারেন না।

তিনি অভিযোগ করেন, স্থানীয় লোকজন পর্যটকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের ঠকায় এবং গলা কেটে ফায়দা লোটে। তিনি প্রশাসনকে প্রতিটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে বৈধ কাগজপত্র ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখার জোর দাবি জানান।

মির্জা গালিব স্ট্রিটের ব্যবসায়ী সমীর দাসও স্বীকার করেন যে, এই ঘটনায় বাংলাদেশি পর্যটকদের মনে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

তবে দুর্ঘটনার পর অবশেষে প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। ইতোমধ্যে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং এই এলাকার হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর আইনগত বৈধতা নিয়ে জোর তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রশাসনের এই আকস্মিক তৎপরতায় অবৈধ হোটেল মালিকরা এখন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

চরম দুর্ভোগে বাংলাদেশি পর্যটকরা

কলকাতার হৃৎপিণ্ড বলে পরিচিত নিউ মার্কেট, মারকুইস স্ট্রিট আর মির্জা গালিব স্ট্রিটের চেনা কোলাহল আচমকাই উধাও হয়ে গেছে। ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত এই চত্বরে এখন শুধুই অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের ছায়া।

মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে সাম্প্রতিক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর নিয়ম ভাঙার অভিযোগে গত ৪৮ ঘণ্টায় দুই শতাধিক হোটেল ও গেস্ট হাউস সিলগালা ও বন্ধের নোটিস দিয়েছে কলকাতা পৌরসভা, দমকল ও পুলিশ বিভাগ।

এই সাঁড়াশি অভিযানের ফলে সরাসরি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কলকাতায় চিকিৎসার জন্য কিংবা স্রেফ বেড়াতে আসা হাজার হাজার বাংলাদেশি। এখন তারা আশ্রয়হীন যাযাবরের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন।

অভিযানের তীব্রতায় রাতারাতি হোটেল ছাড়ার নোটিস পেয়ে অনেক পর্যটককে মালামাল নিয়ে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। বর্তমানে নিউ মার্কেট এলাকায় অবস্থানরত প্রায় সাত হাজার বাংলাদেশির বেশিরভাগই এখন তীব্র আবাসন সংকটে রয়েছেন। অল্প কিছু হোটেল খোলা রয়েছে, সেখানে চাহিদার সুযোগ নিয়ে রুমের ভাড়া এক ধাক্কায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।

ঢাকার সাভার থেকে চিকিৎসার জন্য আসা এক দম্পতি জানান, তারা যে হোটেলে বুকিং করেছিলেন সেটি পুলিশ বন্ধ করে দিয়েছে, আর অন্য হোটেলগুলো চড়া দাম হাঁকাচ্ছে। নিরুপায় হয়ে অনেকেই এখন তাদের ভ্রমণের সময় সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য লোকাল ট্রাভেল এজেন্সিগুলোতে ভিড় করছেন, যার ফলে ফিরতি বাসের টিকিটের চাহিদাও আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে।

এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বিষয়ে স্থানীয় নিউ মার্কেট ও পার্ক স্ট্রিট থানার একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আইন অমান্য করে কোনোভাবেই মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া যাবে না। হোটেলগুলোর ভেতরে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন বা বিকল্প সিঁড়ি না থাকায় যে কোনো দুর্ঘটনা বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে। বিদেশি পর্যটকদের সাময়িক অসুবিধা আমরা বুঝতে পারছি, তবে মানুষের জীবনের সুরক্ষাই প্রশাসনের কাছে সবার আগে।

তবে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কোনো পর্যটক যাতে পুলিশি বা স্থানীয় স্তরে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও থানা কড়া নজর রাখছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। নিয়মের এই কড়াকড়ির মাঝে মধ্যবিত্ত বাংলাদেশিদের চেনা কলকাতা আজ যেন এক অচেনা ও আতঙ্কের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন