ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কাজের খোঁজে যাওয়া বাংলাভাষী মানুষদের জোর করে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পার করে দেওয়ার এক ঘৃণ্য চক্রান্ত ফের সামনে আসছে। অতি সম্প্রতি জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ১৫০ জনকে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে করে পশ্চিমবঙ্গের বাগডোগরা বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হয়েছে। সেখান থেকে তাদের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে তাদের বাংলাদেশে পুশব্যাক বা জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো যায়।
৭ অক্টোবর তাদেরকে একইভাবে সীমান্ত পার করার ছক কষেছে প্রশাসন। এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এর আগেও ঠিক একইভাবে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশি তকমা দিয়ে রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে পুশব্যাক করেছিল ভারতীয় পুলিশ, যাদের পরে কলকাতা হাইকোর্ট এবং বাংলাদেশের আদালতের কড়া নির্দেশের পর ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল ভারত।
জম্মু ও কাশ্মীরের প্রশাসন দাবি করছে, এই ১৫০ জন অবৈধভাবে উপত্যকায় বাস করছিল এবং নির্মাণকাজ সহ বিভিন্ন দিনমজুরির সঙ্গে যুক্ত ছিল। উপত্যকা জুড়ে হওয়া এক বিশেষ তল্লাশি অভিযানে তাদের আটক করা হয়। মূলত গত মে মাসে সীমান্ত রাজ্যগুলোতে জনবিন্যাসের পরিবর্তন খতিয়ে দেখার জন্য ভারতের কেন্দ্র সরকার অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি প্রভাকর নাভলেকারের নেতৃত্বে একটি চার সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছিল। আগস্ট মাসে সেই কমিটি জম্মু সফর করার পরেই জম্মু অঞ্চলে বসবাসকারী রোহিঙ্গা এবং কথিত বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে এই ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়।
রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়ে তাদের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। কিন্তু এই কথিত বাংলাদেশিরা যে আসলে ভারতেরই বাংলাভাষী প্রান্তিক নাগরিক নন, তার কোনও অকাট্য প্রমাণ প্রশাসন বা কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি দিতে পারেনি। বিএসএফ-এর মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই যেভাবে এদের সরাসরি বাংলাদেশে পার করানোর চেষ্টা চলছে, তা স্পষ্টতই মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
এই ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে মাত্র এক বছর আগের একটি ন্যাক্কারজনক দৃষ্টান্ত, যেখানে খোদ ভারতের রাজধানী থেকে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বাসিন্দাদের ‘বাংলাদেশি’ বলে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুন মাসে দিল্লি পুলিশ এবং ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও) তল্লাশি চালিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বাসিন্দা সোনালী খাতুন, সুইটি বিবি, দানিশ শেখ-সহ একাধিক বাংলাভাষী শ্রমিককে আটক করে। সেসময় সোনালী খাতুন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। বাধ্যতামূলক ৩০ দিনের আইনি যাচাইকরণ ছাড়াই, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে পুশইন করে দেয় ভারতীয় পুলিশ ও রক্ষীরা। এরপর তারা বাংলাদেশের জেলে বন্দি ছিলেন।
কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি ঋতব্রত মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এক ঐতিহাসিক রায়ে দিল্লি পুলিশের এই পদক্ষেপকে বেআইনি ও বাতিলযোগ্য বলে ঘোষণা করে। আদালত জানায়, কোনো রকম প্রকৃত প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র সন্দেহের বশে এবং চরম তাড়াহুড়ো করে এই গরিব শ্রমিকদের পুশব্যাক করা হয়েছিল। হাইকোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দেয় যে, চার সপ্তাহের মধ্যে এই ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশ থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের নবাবগঞ্জ আদালতও গত বছর অক্টোবর মাসে পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে, ওই বন্দিদের কাছে ভারতের আধার কার্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের ঠিকানার অকাট্য প্রমাণ রয়েছে, অর্থাৎ তারা আদ্যোপান্ত ভারতীয় নাগরিক। পরে তারা ভারতে ফেরে৷
সেই কলঙ্কজনক অধ্যায় থেকে শিক্ষা না নিয়ে ভারত সরকার এবং তাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ আবারও একই রাস্তায় হাঁটছে বলে অভিযোগ উঠছে। বিনা বিচারে, আইনি সুযোগ না দিয়ে কাশ্মীর থেকে ধরে আনা এই ১৫০ জন প্রান্তিক শ্রমিককে শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার অপরাধে এবং রাজনৈতিক ফায়দা তোলার উদ্দেশ্যে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে জোর করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার এই চেষ্টা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
বাংলাদেশের প্রশাসন এ বিষয়ে কতটা নজর রাখছে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ভারতের নাগরিকদের যথাযথ যাচাই ছাড়া বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে পাঠানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে তার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও আইনি পর্যায়ে অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

