ফাঁসির আতঙ্কে আ.লীগের পলাতক নেতারা, হাসিনার সিদ্ধান্তে চরম ক্ষোভ ও হতাশা

ফাঁসির আতঙ্কে আ.লীগের পলাতক নেতারা, হাসিনার সিদ্ধান্তে চরম ক্ষোভ ও হতাশা
ছবি: উপরের বাঁ থেকে- আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক; নিচের বাঁ থেকে- মির্জা আজম ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে এখন তীব্র আতঙ্ক, হতাশা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থান করলেও তার সঙ্গে প্রবীণ ও পরীক্ষিত নেতাদের চরম দূরত্ব তৈরি হয়েছে। একদিকে মৃত্যুদণ্ডের ভয় এবং অন্যদিকে দলীয় প্রধানের দিক থেকে কোনো খোঁজখবর না পাওয়া ও তার একতরফা সিদ্ধান্তে পলাতক এসব নেতাদের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নেতাদের এই ভয় ও ক্ষোভের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। কলকাতার নিউটাউনের একটি ফ্ল্যাটে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও লুকোচুরি করে দিন কাটানো এই নেতা নিজের হতাশা আর চেপে রাখতে পারেননি। সম্প্রতি দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক একটি সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে দেশে ফিরে প্রতিশোধ নেওয়ার যে আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আসাদুজ্জামান কামাল। নানকের এমন ফাঁকা আস্ফালনে ক্ষুব্ধ হয়ে কামাল বলেন, নানক বললেই কি ইচ্ছেমতো দেশে ফেরা যায়? তার গলায় ইতিমধ্যেই ফাঁসির দড়ি ঝুলছে। যদি এই ধরনের কঠোর আইনি নির্দেশ বা ফাঁসির সাজা নানকের ওপর থাকত, তবে কি তিনি এভাবে বুক ফুলিয়ে কথা বলতে পারতেন?

চরম আতঙ্কে দিন কাটানো আসাদুজ্জামান কামাল জানান, তার ওপর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কড়া নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তিনি ভয়ে আছেন যে, তার মুখ থেকে সামান্য কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বের হলেই তাকে ধরে বাংলাদেশ সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, তার তো ফাঁসি হবে, আর নানক বেঁচে যাবেন; তাই তিনি কোনোভাবেই এভাবে দেশে ফিরতে চান না। একসময়ের দাপুটে এসব মন্ত্রীরা আজ অর্থকষ্ট, পুলিশি গ্রেপ্তারের ভয় এবং বন্দিদশার মতো মানবেতর জীবন পার করছেন। অথচ বিপদের এই চরম মুহূর্তে শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে থাকলেও তাদের কোনো খোঁজ নিচ্ছেন না। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও আজ পুরোপুরি কোণঠাসা ও নেত্রীর সুনজর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

নেতাদের এই হতাশার আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে শেখ হাসিনার একটি সাম্প্রতিক বার্তা। কলকাতার একটি সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ইঙ্গিত দেন যে, তার অনুপস্থিতিতে দলের জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও তার ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রকাশ্য বিদ্রোহ দেখা দেয়। কলকাতার নিউ টাউনে শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দিনের বাসায় গোপনে জড়ো হয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান।

ওই গোপন বৈঠকে আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মির্জা আজমসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা উপস্থিত ছিলেন। তারা সরাসরি অভিযোগ করেন যে, শেখ সেলিম দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত ছিলেন এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তার আচরণ অত্যন্ত খারাপ। গত পনেরো বছরে তদবির ছাড়া কোনো দলীয় কাজে তাকে পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে নেতারা বলেন, যিনি দলের সাথে সম্পর্ক রাখেননি তাকে সভাপতির দায়িত্ব দিলে কেউ তা মেনে নেবে না। দলের এই দুঃসময়ে শেখ সেলিমের বদলে অন্য নেতাদের মূল্যায়ন করার জন্য তারা শেখ হেলালের মাধ্যমে শেখ হাসিনার কাছে বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করেন।

সব মিলিয়ে ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত করুণ। একদিকে দেশে ফিরলে মৃত্যুদণ্ড বা গ্রেপ্তারের নিশ্চিত আতঙ্ক, অন্যদিকে দলের প্রধান শেখ হাসিনার অবিবেচক সিদ্ধান্ত ও তাদের প্রতি চরম অবহেলা পুরনো নেতাদের দিশেহারা করে তুলেছে। বিপদের দিনে নেত্রীর এমন স্বার্থপর আচরণ ও কিছু নেতার আত্মপ্রচারের রাজনীতিতে তারা নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন। দলের ভেতরে তৈরি হওয়া এই গভীর ফাটল ও অনাস্থা আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের অস্তিত্বকেই এখন চরম সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে।

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন