ভারতের সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি বেশ জ্বলজ্বলে অক্ষরে লেখা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ যে কতটা প্রহসনমূলক, তার জ্বলন্ত উদাহরণ আজকের বিজেপিশাসিত পশ্চিমবঙ্গ। সদ্য ক্ষমতায় আসা এই সরকারের আমলে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বেড়েই চলছে। সম্প্রতি তিনটি খ্রিষ্টান পরিবারের ওপর নেমে আসা অকথ্য পাশবিকতা যেন সেই ভয়ংকর বাস্তবেরই এক নিপুণ প্রতিচ্ছবি।
অভিযোগকারী পরিবারগুলোর দাবি, পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা এলাকায় গত ৩০ বছর ধরে বসবাস করছেন তারা। প্রায় ১৮ মাস আগে তারা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর গত ১৮ ও ১৯ অক্টোবর তাদের ওপর হামলা চালায় উগ্র হিন্দুত্ববাদী বাজরং দলের সদস্যরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ না করলে পরিবারের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের অপহরণ ও ধর্ষণের হুমকি দেয় তারা। এক নারীকে প্রায় বিবস্ত্র করারও অভিযোগ রয়েছে। পরিবারগুলোর দাবি, জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ভয় দেখিয়ে খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগে চাপ দেওয়া হয়।
গত ১৮ অক্টোবর বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে ৪০ বছর বয়সি লক্ষ্মী মণ্ডল পশ্চিম মেদিনীপুরের পাটলাপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ করছিলেন। এ সময় ১০ জনের বেশি লোক, যাদের মধ্যে অন্তত তিনজন নারী ছিলেন, তার বাড়িতে ঢুকে পড়েন।
লক্ষ্মী মণ্ডলের ভাষ্য, হামলাকারীরা পাশের গ্রামের বাসিন্দা এবং বাজরং দলের সঙ্গে যুক্ত। তারা তাকে টেনে বাড়ির বাইরে নিয়ে যায়। এ সময় তাকে চড় মারা হয় এবং মাথা ও কানের নিচে আঘাত করা হয়। এতে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
জ্ঞান ফেরার পর তিনি বুঝতে পারেন, হামলাকারীরা তাকে পোশাক ছিঁড়ে বিবস্ত্র করার চেষ্টা করছে। এ সময় তাকে জোর করে গোসল করিয়ে ‘হিন্দু শুদ্ধিকরণ’ আচার পালনে বাধ্য করা হয়।
ভুক্তভোগী ওই তিনটি পরিবারের ৯ জন সদস্য থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ তাদের নিরাপত্তা দিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিলেও, পরিবারগুলোর আতঙ্ক এখনো কাটেনি। তবে এ ঘটনায় কোনো মন্তব্য করেননি জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণ।
পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর এ ধরনের হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক মাস ধরেই খ্রিষ্টানদের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, বঙ্গীয় খ্রিষ্টীয় পরিষেবা (বিসিপি)-এর মতো খ্রিষ্টান অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলো রাজ্য প্রশাসনের ওপর পুরোপুরি ভরসা হারিয়ে সরাসরি আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ভুয়া অভিযোগে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে গির্জায় হামলা, উপাসনালয় ভাঙচুর এবং প্রার্থনা সভাতে ঢুকে মারধরের ঘটনা এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর রাজ্য সরকার এই ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করতে চরমভাবে ব্যর্থ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

