নিরাপত্তা বিধিনিষেধে কাশ্মীরে পর্যটন ব্যবসায় ধস

নিরাপত্তা বিধিনিষেধে কাশ্মীরে পর্যটন ব্যবসায় ধস

ভারত-শাসিত কাশ্মীরে পহেলগাঁও হামলার পর আরোপ করা নিরাপত্তা বিধিনিষেধের কারণে পর্যটননির্ভর মানুষের আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে খুললেও বহু জনপ্রিয় পাহাড়ি এলাকা ও ট্রেকিং রুট এখনো বন্ধ বা সীমিত ব্যবহারের আওতায় রয়েছে। এতে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় মানুষ দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

গন্দরবাল জেলার নারানাগ গ্রামের দোকানি ও ট্রেকিং গাইড গুলাম কাদির জাগিলের মতো অনেক মানুষ পর্যটকের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। পর্যটন মৌসুমে সাধারণত মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত এই এলাকায় বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসেন। কিন্তু বিধিনিষেধের কারণে এবার পর্যটকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। জাগিলের দাবি, গত এক বছরে তার প্রায় ৬ লাখ রুপি ক্ষতি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পহেলগাঁও হামলার আগে পর্যটন ছিল কাশ্মীরের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ২০২৫-২৬ সালের জম্মু ও কাশ্মীর অর্থনৈতিক জরিপ অনুযায়ী, পর্যটন খাত অঞ্চলটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৭ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫ লাখ মানুষের জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, হস্তশিল্প, ট্যুর পরিচালনা ও স্থানীয় ব্যবসা রয়েছে।

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ের বৈসারান এলাকায় হামলার পর নিরাপত্তা জোরদার করতে বিভিন্ন পর্যটন ও ট্রেকিং এলাকায় চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়। অনেক এলাকা দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখা হয়। পরে কিছু পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়া হলেও ট্রেকিংসহ বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকাই নয়, পর্যটকদের চলাচলের সময়ও সীমিত করা হয়েছে। ফলে যারা দোকান, ছোট হোটেল, খাবারের দোকান, ঘোড়ার সেবা, ট্যাক্সি কিংবা ট্রেকিংয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

কাশ্মীরে প্রায় ২০০টি অ্যাডভেঞ্চার ট্যুর অপারেটর রয়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রেকিং কোম্পানি ক্লিফহ্যাঙ্গার্স ইন্ডিয়ার সহ-মালিক মোহাম্মদ আদিল লাঙ্গুর দাবি, বিধিনিষেধের কারণে তাদের প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রায় ২ কোটি রুপির ব্যবসা কার্যত শূন্যে নেমে এসেছে। তার ভাষ্য, নারানাগ, সোনমার্গ ও পহেলগাঁও—কোথাও নিয়মিত ট্রেকিংয়ের সুযোগ নেই।

পহেলগাঁওয়ের পর্যটননির্ভর ঘোড়ার মালিক, গাড়িচালক ও ছোট ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গন্দরবালের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাটিন কিশোর জানিয়েছেন, কিছু এলাকা নিরাপত্তাজনিত কারণে ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করা হয়েছে এবং সেখানে কোনো কার্যক্রমের অনুমতি নেই।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে দীর্ঘদিন ধরে বিধিনিষেধ বহাল থাকায় সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পর্যটননির্ভর পরিবারগুলো কয়েক মাসের মৌসুমি আয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় একটি পুরো মৌসুম নষ্ট হওয়া তাদের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে।

ভারতীয় সরকারি তথ্যেও পহেলগাঁও হামলার পর পর্যটন খাতে ধাক্কার বিষয়টি উঠে এসেছে। সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে পর্যটকের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কমেছিল, যদিও পরবর্তী সময়ে পর্যটন খাতে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও পর্যটনকেন্দ্র ও ট্রেকিং রুটগুলো দ্রুত পুরোপুরি খুলে না দিলে কাশ্মীরের পর্যটননির্ভর অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে আরও দীর্ঘ সময় লাগবে।

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই ও ট্রিবিউন ইন্ডিয়া

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন