পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে । গতকাল সকাল থেকেই বুথে বুথে মানুষের যে ঢল নেমেছিল, দিন শেষে তা আক্ষরিক অর্থেই আশির দশকের সেই টানটান রাজনৈতিক উত্তেজনার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রাজ্যে প্রথম দফার ভোটের হার ৯১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছে, ভোটদানের ক্ষেত্রে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে এবারের নির্বাচন।
রাজ্যে প্রথম দফায় বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে শমসেরগঞ্জ আসনে। সেখানে ভোটদানের হার ৯৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ভগবানগোলায় ভোট পড়েছে ৯৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। নন্দীগ্রামে ভোট পড়েছে ৯০ দশমিক ০৩ শতাংশ। বহরমপুর আসনে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৮৯ দশমিক ৬০ শতাংশ। প্রথম দফায় বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোটদানের হার দক্ষিণ দিনাজপুরে ৯৩ দশমিক ১২ শতাংশ। সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে কালিম্পংয়ে ৮১ দশমিক ৯৮ শতাংশ। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে এবার।
রাজ্যে প্রথম দফার নির্বাচন অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে। তবে এর মধ্যেও বিক্ষিপ্ত কিছু গোলমালের ঘটনা ছিল। গাড়ি ভাঙচুর, প্রার্থীকে মারধর, এমনকি কেন্দ্রীয় বাহিনীর ওপরেও হামলার অভিযোগ ছিল।
মুর্শিদাবাদ থেকে বীরভূম, কোচবিহার থেকে পশ্চিম মেদিনীপুর—সকাল থেকেই খবর আসতে শুরু করেছিল উত্তেজনার। মুর্শিদাবাদের নওদায় আমজনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীরকে ঘিরে তৃণমূল সমর্থকদের বিক্ষোভ এবং হাতাহাতির ঘটনা রীতিমতো শোরগোল ফেলে দেয়। সেখানে দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি, শেষ পর্যন্ত তিনজনকে আটক করতে হয় পুলিশকে।
হিংসার ছোঁয়া লেগেছে উত্তরবঙ্গেও। কোচবিহারের সিতাইয়ে এক বিজেপি কর্মীকে ছুরিকাঘাতের অভিযোগ উঠেছে। বাদ যায়নি বীরভূমের সাঁইথিয়া বা খয়রাশোলও। খয়রাশোলে ইভিএম বিভ্রাট নিয়ে বিক্ষোভ চলাকালীন উত্তেজিত জনতার রোষের মুখে পড়তে হয় কেন্দ্রীয় বাহিনীকে। পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশকে পিস্তল উঁচিয়ে আসরে নামতে হয়। রক্তাক্ত হয়েছেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানও। আসানসোলে বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালের গাড়িতে পাথরবৃষ্টি, বহরমপুরে অধীর চৌধুরীর পোলিং এজেন্টের পরিবারের ওপর হামলা হয়। এ অভিযোগগুলো মনে করিয়ে দিয়েছে যে, বঙ্গের ভোট মানেই যেন এক অঘোষিত যুদ্ধক্ষেত্র।
তবে এই রণক্ষেত্রের মধ্যেই কোথাও কোথাও দেখা গিয়েছে অদ্ভুত এক বৈপরীত্য। রাজনীতির তিক্ততা ছাপিয়ে ফুটে উঠেছে সৌজন্যের ছবিও। খড়্গপুর সদরে বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ আর তৃণমূল প্রার্থী প্রদীপ সরকার যখন মুখোমুখি হলেন, তখন গালিগালাজ নয়, বরং দুই প্রতিপক্ষ হাসিমুখে হাত মেলালেন। এই সৌজন্যচিত্র একদিকে যেমন স্বস্তি দিয়েছে, তেমনি পিংলার ৯ নম্বর বুথের ঘটনা আবার অস্বস্তিতে ফেলেছে নির্বাচন কমিশনকে। সেখানে প্রিসাইডিং অফিসার থেকে শুরু করে ভোটকর্মীরা সবাই মিলে বুথ ছেড়ে মধ্যাহ্নভোজে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। দায়িত্বজ্ঞানহীনতার এই চরম নিদর্শন দেখে কমিশন তড়িঘড়ি তাদের সবাইকে নিলম্বিত করে রিজার্ভ দল দিয়ে ভোট প্রক্রিয়া চালায়।
ভোটের হার নিয়ে যখন কাটাছেঁড়া চলছে, তখন রাজনৈতিক শিবিরের প্রতিক্রিয়াও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিপুল ভোটদানকে জয়ের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআরের কারণে ভোটার তালিকা থেকে বহু নাম বাদ যাওয়ায় মানুষ এবার অনেক বেশি সতর্ক হয়ে ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হেলিকপ্টার থেকে সূর্যাস্তের ছবি পোস্ট করে দাবি করেছেন, বাংলায় ‘গুন্ডারাজ’এর সূর্য অস্ত যেতে শুরু করেছে। এ বিপুল জনতার ভোটদান কি পরিবর্তনের ইঙ্গিত নাকি বর্তমান সরকারের স্থায়িত্বের পক্ষে জনাদেশ, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।
সব মিলিয়ে এই প্রথম দফার ভোট পশ্চিমবঙ্গকে এক অন্য মাইলফলকে দাঁড় করিয়ে দিল। রক্তারক্তি, ইটবৃষ্টি, বুথ দখলের চেষ্টা আর রাজনৈতিক দাদাগিরির মাঝেও ৯০ শতাংশের এই ‘ম্যাজিক ফিগার’প্রমাণ করল, বাংলার মানুষ আজও ইভিএম বক্সকেই শেষ কথা হিসেবে মানে। এখন ৪ মে এর অপেক্ষা, সেদিনই পরিষ্কার হবে এই বিপুল জনজোয়ার নবান্নের চাবিকাঠি কার হাতে তুলে দেয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

