নাফিস ইকবালের বিশ্লেষণ

অস্ট্রেলিয়া সফর : আমাদের বিশ্বাসটা আরো শক্ত হলো

অস্ট্রেলিয়া সফর : আমাদের বিশ্বাসটা আরো শক্ত হলো

অস্ট্রেলিয়া সফর শেষ করে দেশে ফিরছি আমরা। দুই টেস্টের সিরিজ ১-১। স্কোরকার্ডে হয়তো এটিই সবচেয়ে বড় সত্য। কিন্তু এই সফরের গল্পটা শুধু ১-১-এ আটকে রাখলে আমাদের অর্জনের জায়গাটা পুরোপুরি বোঝা যাবে না।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে আমরা এমন কিছু ক্রিকেট খেলেছি, যা আমাদের নিজেদের কাছেও বিশেষ হয়ে থাকবে। বিশেষ করে ডারউইনে প্রথম টেস্টের জয়। বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে এমন জয় সহজে আসে না। সেই ম্যাচে ছেলেরা যে চরিত্র, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক দৃঢ়তা দেখিয়েছে, সেটি আমাদের জন্য বড় প্রাপ্তি।

বিজ্ঞাপন

আমি মনে করি, ডারউইনের সেই জয় শুধু একটি ম্যাচের জয় ছিল না। এটি আমাদের বিশ্বাসকে আরো শক্ত করেছে। বিশ্বাসটা হলো, আমরা চাইলে সর্বোচ্চ পর্যায়েও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারি। শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, ভালো ক্রিকেট খেলে বড় দলের বিপক্ষেও জিততে পারি।

তবে এটা ঠিক যে সিরিজটা আমরা যেভাবে শেষ করতে চেয়েছিলাম, সেভাবে শেষ করতে পারিনি। ম্যাকাই টেস্টের ফল আমাদের জন্য হতাশার। প্রথম টেস্টের পর যে জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেখান থেকে দ্বিতীয় টেস্টে আরো ভালো কিছু করার সুযোগ ছিল। বিশেষ করে সিরিজের শুরুটা যখন এতটা ভালো হয়েছিল, তখন শেষ টেস্টে আমাদের প্রত্যাশাও ছিল বেশি।

ম্যাকাইয়ের হার তাই আমাদের জন্য আক্ষেপের। তবে আমি এটিকে পুরো সফরের ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে চাই না। ক্রিকেটে প্রতিটি ম্যাচই নতুন শিক্ষা দেয়। আমরা কোথায় ভালো করেছি, কোথায় ভুল করেছি, কোথায় আরো উন্নতি দরকার, সেটি বোঝার জন্য এই সফর আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা ইতিবাচক দিকগুলো সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরছি। আমি সব সময়ই মনে করি, একটি দলের এগিয়ে যাওয়ার জন্য ইতিবাচক মানসিকতা খুব জরুরি। এই সফরেও আমরা সেটিই ধরে রাখতে চাই। আমাদের ভুলগুলো থেকে শিখতে হবে। নেতিবাচক বিষয়গুলো পেছনে ফেলে দিতে হবে। আর যে আত্মবিশ্বাস আমরা তৈরি করেছি, সেটিকে সামনে নিয়ে যেতে হবে।

ডারউইনের জয় আমাদের সেই আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে জয় আমাদের দেখিয়েছে, বড় মঞ্চে আমরা কী করতে পারি। ছেলেদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। তারা বুঝতে পেরেছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করার সুযোগ এলে সেটি কাজে লাগানো সম্ভব।

ম্যানেজার হিসেবে দলের ভেতর থেকে এই পরিবর্তনটা দেখা আমার জন্যও বিশেষ অভিজ্ঞতা। জয়-পরাজয়ের বাইরে গিয়ে আমি সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছি ছেলেদের মানসিকতায় যে পরিবর্তনটা দেখেছি, সেটিকে। কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখা, লড়াই করা এবং বড় প্রতিপক্ষের সামনে নিজেদের ক্রিকেটটা খেলার যে সাহস তারা দেখিয়েছে, সেটিই সামনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

এই সফরের আরেকটি সুন্দর দিক ছিল অস্ট্রেলিয়ায় থাকা বাংলাদেশি সমর্থকদের ভালোবাসা। ডারউইন থেকে ম্যাকাই, যেখানে গিয়েছি সেখানেই বাংলাদেশের মানুষ আমাদের পাশে ছিলেন। তাদের সমর্থন ছিল আন্তরিক, আবেগপূর্ণ। মাঠের বাইরে থেকেও তারা আমাদের যে শক্তি দিয়েছেন, সেটি দলের প্রত্যেকের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আমরা তাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি, তাদের ভালোবাসা অনুভব করেছি। তাদের উৎসাহ আমাদের অনেক আনন্দ দিয়েছে। একজন খেলোয়াড় বা দলের সঙ্গে থাকা মানুষ হিসেবে এই সমর্থনের মূল্য আমি খুব ভালোভাবেই বুঝি।

তাই অস্ট্রেলিয়ায় থাকা প্রতিটি বাংলাদেশি সমর্থককে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই। ডারউইন ও ম্যাকাইয়ে যারা আমাদের পাশে ছিলেন, আপনাদের সমর্থন আমরা ভুলব না।

শেষ পর্যন্ত আমরা একটি জয় পেয়েছি, একটি ম্যাচ হেরেছি। সিরিজ ড্র হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে এই সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো বিশ্বাস।

আমরা এখন জানি, বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষেও আমরা লড়তে পারি। জানি, নিজেদের সেরাটা দিতে পারলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেও জয় সম্ভব। আবার একই সঙ্গে জানি, কোথায় আমাদের আরো উন্নতি করতে হবে।

ম্যাকাইয়ের হার আমাদের সেই জায়গাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে। আর ডারউইনের জয় দেখিয়েছে, আমরা কতটা দূর যেতে পারি। এই দুই অভিজ্ঞতাই সঙ্গে থাকবে। আমরা ভুল থেকে শিখব। ভালো দিকগুলো ধরে রাখব। নেতিবাচক বিষয়গুলো পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাব। অস্ট্রেলিয়া সফর তাই আমাদের কাছে শুধু একটি ১-১ ড্র করা সিরিজ নয়। এটি আমাদের জন্য আত্মবিশ্বাসের একটি নতুন অধ্যায়। সেই বিশ্বাস নিয়েই আমরা পরের পথটায় হাঁটতে চাই।

অস্ট্রেলিয়া সিরিজ থেকে বিদায়। তবে গল্পটা এখানেই শেষ নয়।

লেখক: বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ম্যানেজার।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন