দক্ষিণ লোহিত সাগরে নিজের তেল রপ্তানির ওপর ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের দেওয়া অবরোধ ভাঙতে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। মধ্য ইয়েমেনে সমুদ্রপথে এবং সম্ভব হলে স্থলপথে এই অভিযান পরিচালিত হতে পারে বলে ইয়েমেনি সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চল থেকে ইতোমধ্যে সৌদি বাহিনীকে সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, স্থল অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবেই এই সেনা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। একই সময়ে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে বাণিজ্য জাহাজের নিরাপত্তা রক্ষায় একটি বহুজাতিক নৌ জোট গঠনের চেষ্টা জোরদার করেছে রিয়াদ।
গতকাল বৃহস্পতিবার সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের প্রস্তাবিত বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটের সমর্থনে বাংলাদেশ, তুরস্ক, পাকিস্তান, মিসর, সুদান ও জিবুতিসহ ১৪টি দেশ যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। এ ছাড়া লোহিত সাগরের কৌশলগত প্রতিরক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিকে এই জোটে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে রিয়াদ।
উল্লেখ্য, লোহিত সাগরে নৌচলাচল নিরাপদ রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ‘অ্যাসপিডিস’ নামে একটি নৌ-নিরাপত্তা মিশন আগে থেকেই কার্যকর রয়েছে।
ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ লোহিত সাগরের বিস্তীর্ণ উপকূল বর্তমানে ইরান-সমর্থিত হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত ২০ জুলাই হুতিরা সৌদি জাহাজের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয়। তবে সব ধরনের জাহাজের ওপর কর চাপানোর পরিকল্পনার বিষয়টি তারা অস্বীকার করেছে।
হুতিদের দাবি, সৌদি আরব ইয়েমেনের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিলেই কেবল তারা নিজেদের এই অবরোধ প্রত্যাহার করবে। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে জাতিসংঘ-স্বীকৃত সরকারের পক্ষে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল সৌদি আরব।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে আরব উপদ্বীপের অপর পাশে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে পড়ায় সৌদি তেলের জন্য লোহিত সাগর রুটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সৌদি অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। তবে বর্তমানে তাদের অর্ধেকেরও বেশি তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়াঙ্কু বন্দরে এনে বাজারজাত করা হচ্ছে।
সম্প্রতি হুতি বিদ্রোহীরা রিয়াদের বিরুদ্ধে আক্রমণ জোরদার করেছে। গত ২৫ জুলাই তারা সৌদি আরবের ভেতরের কৌশলগত তেল অবকাঠামোতে হামলার দাবি করে। এর আগে সৌদি বিমানবাহিনী ইয়েমেনের হুদাইদাহ বন্দরে হুতি অবস্থানগুলোতে হামলা চালায় এবং লোহিত সাগরে একটি সৌদি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়।
চলমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠক করেছেন। তবে সৌদি আরব স্পষ্ট জানিয়েছে, নিজেদের তেল শিল্প রক্ষায় তারা প্রস্তুত থাকলেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বাড়াতে চায় না। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বিরোধ এখনো কূটনৈতিক উপায়ে সমাধান সম্ভব বলে মনে করে রিয়াদ।
একই সঙ্গে ইরাকের তেল অবকাঠামোতে সৌদি তেল স্থাপনায় হামলার জবাবে গত বুধবার ইরাকে বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। এতে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই যৌথ মার্কিন-সৌদি হামলা ইরাক সরকারের সম্মতিতেই হয়েছে, যদিও বাগদাদ এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
ইয়েমেনি সূত্রগুলো জানিয়েছে, মধ্য-দক্ষিণাঞ্চলীয় আল-বায়দা প্রদেশ পুনরুদ্ধারে সৌদি বাহিনী জমায়েত হচ্ছে। ২০২০-২১ সালে অঞ্চলটি দখল করে নিয়েছিল হুতিরা। যদি ওমান ও ইরানের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার কোনো সমঝোতা হয়, তবে ইয়েমেনের এই উত্তেজনা কমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

