বিয়ের সাত বছর পরও সন্তান না হওয়ায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসক দেখিয়েছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফ সালেহীন। তাতেও স্ত্রী গর্ভধারণ না করায় শেষ পর্যন্ত সন্তান দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু দত্তক নেওয়ার প্রক্রিয়ায় গিয়ে নতুন জটিলতার মুখে পড়েন।
গোপনীয়তার স্বার্থে সাইফ সালেহীনের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।
সাইফ সালেহীন বলেন, আইনি জটিলতা এড়াতে ২০১৯ সালে স্ট্যাম্প কাগজে স্বাক্ষর করে একটি শিশুকে দত্তক নেন তিনি।
সাইফ বলেন, আমার মেয়ে তার আসল বাবা-মায়ের ষষ্ঠ সন্তান ছিল। ওর যখন ১৮ দিন তখন তাদের সঙ্গে স্ট্যাম্পে সই করিয়ে নিয়ে চুক্তি করি যে এই মেয়ের ওপর তাদের আর কোনো অধিকার থাকবে না। তারা কখনো শিশুটিকে নিজেদের কাছে ফিরিয়ে নিতে পারবেন না বলেও চুক্তিতে উল্লেখ ছিল। এর বিনিময়ে তাদের মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়েছিল।
তবে আইনজীবীরা বলছেন, এভাবে স্ট্যাম্প পেপারে চুক্তি করে সন্তান দত্তক নেওয়া আইনসিদ্ধ নয়। বাংলাদেশে শিশু দত্তক নেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইনও নেই। আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়া যায়।
তাহলে বাংলাদেশে নিঃসন্তান দম্পতিরা সন্তান দত্তক নিতে পারবেন, নাকি শুধু অভিভাবকত্ব নিতে পারবেন? এ ক্ষেত্রে কোন আইন অনুসরণ করা হয়? আর কী ধরনের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়?
দত্তক নয়, অভিভাবকত্ব
বাংলাদেশের একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা লুৎফা নাজনীনও বিয়ের ১১ বছর পর সন্তান না হওয়ায় প্রায় দুই বছর আগে একটি শিশু নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরিচিতজনদের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, আদালতের মাধ্যমে শিশুর আইনি অভিভাবকত্ব পাওয়া যায়।
পরে তিনি আজিমপুরের সরকারি শিশু সদনে যোগাযোগ করেন। সেখানে দেড় মাস বয়সি একটি মেয়েশিশুকে পছন্দ করেন তিনি। শিশুটিকে তিন দিন বয়সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফেলে যাওয়া হয়েছিল।
শিশুটির অভিভাবকত্ব পেতে পারিবারিক আদালতে আবেদন করেন লুৎফা নাজনীন। কয়েক মাস শুনানির পর কিছু শর্ত সাপেক্ষে আদালত তাকে শিশুটির অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
লুৎফা বলেন, শিশুটির কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আদালত পড়াশোনার খরচের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা এফডিআর করে রাখতে বলেন। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি সরকারি কার্যালয়ে রসিদও জমা দেন। আদালত যখন নিশ্চিত হয় যে তিনি শিশুটির দায়িত্ব নিতে পারবেন, তখন তাকে অভিভাবক করে রায় দেওয়া হয়।
তবে এই প্রক্রিয়ায় তাকে আদালতসহ বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে।
আইনজীবীরা বলছেন, মুসলিম আইনে সন্তান দত্তক নেওয়ার কোনো বিধান নেই। তাই বাংলাদেশে অনেক সময় যে ‘দত্তক’ নেওয়ার কথা বলা হয়, সেটি আসলে শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়া।
অভিভাবকত্বের মাধ্যমে শিশুকে নিজের জিম্মায় রেখে লালন-পালন করা যায়। কিন্তু এটি পূর্ণাঙ্গ মাতৃত্ব বা পিতৃত্ব নয়। এই প্রক্রিয়ায় যে কেউ শিশুর অভিভাবক হতে পারেন। ফলে অভিভাবকত্ব পাওয়া আর সন্তান দত্তক নেওয়া এক বিষয় নয়।
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন এবং ১৯৩৭ সালের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়াহ) অনুযায়ী এতিম বা অসহায় শিশুকে লালন-পালন করা যায়। তবে শিশুর বাবা-মায়ের নামের জায়গায় লালন-পালনকারী বাবা-মায়ের নাম ব্যবহার করা যায় না। ইসলামে এর বৈধতা নেই।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা বলেন, গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট-১৮৯০ অনুযায়ী যে কেউ কোনো শিশুর অভিভাবকত্ব পেতে পারেন। বাংলাদেশে মুসলিম আইনে দত্তকের ধারণাই নেই। তাই গার্ডিয়ানশিপ পাওয়া এবং দত্তক নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
মিতি সানজানা বলেন, কোনো শিশুকে নিয়ে বিরোধ না থাকলে কয়েকটি শুনানির মাধ্যমে আগ্রহীরা আইনি প্রক্রিয়ায় তার অভিভাবকত্ব পেতে পারেন। তবে বিরোধ বা জটিলতা থাকলে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হয়। রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকায় সময় আরো বাড়তে পারে।
তবে এ ধরনের আবেদনে আদালত শিশুর সর্বোচ্চ স্বার্থ ও সর্বোত্তম কল্যাণকে গুরুত্ব দেয় বলেও জানান তিনি।
হিন্দু ধর্মে দত্তক
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার আইন (সংশোধিত) অনুযায়ী সন্তান দত্তক নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই আইনে দত্তক সন্তান ও আসল সন্তানের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয় না।
তবে উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশের পর শুধু ছেলে শিশুকে দত্তক নেওয়া আইনসিদ্ধ হয়েছে। অর্থাৎ এই আইনে শুধু ছেলে শিশুকেই দত্তক নেওয়া যায়। এখানে অভিভাবকত্বের চেয়ে দত্তক নেওয়াকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
হিন্দু পুরুষ বিবাহিত, অবিবাহিত বা বিপত্নীক—যে অবস্থাতেই থাকুন, সন্তান দত্তক নিতে পারেন। তবে নারীদের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
অবিবাহিত হিন্দু নারী সন্তান দত্তক নিতে পারেন না। বিবাহিত নারী সন্তান দত্তক নিতে চাইলে স্বামীর অনুমতি প্রয়োজন। আর হিন্দু বিধবা নারীকে সন্তান দত্তক নিতে হলে স্বামীর মৃত্যুর আগে দেওয়া অনুমতিপত্র দেখাতে হয়।
খ্রিস্ট ধর্মে অভিভাবকত্ব
মুসলিম ধর্মের মতো খ্রিস্ট ধর্মেও সন্তান দত্তক নেওয়ার কোনো বিধান নেই। এই ধর্মের অনুসারীরা শিশুর অভিভাবকত্ব নিতে পারেন।
গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট অনুযায়ী খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরাও মুসলিমদের মতো শিশুর অভিভাবকত্ব পেতে পারেন।
কেন বাংলাদেশে শিশু দত্তক নেওয়া যায় না?
১৯৮৯ সালে শিশু অধিকার কনভেনশন গৃহীত হয়। বাংলাদেশ ওই কনভেনশনে স্বাক্ষর করলেও দত্তক গ্রহণবিষয়ক ২১ ধারায় অনুস্বাক্ষর করেনি।
এর মূল কারণ মুসলিম ধর্মীয় বিধানে সন্তান দত্তক নেওয়া স্বীকৃত নয়।
তবে যুদ্ধশিশুদের পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে একটি বিশেষ আইন করা হয়েছিল। ওই আইনের আওতায় এতিম ও পরিত্যক্ত শিশুদের দত্তক নেওয়া আইনসিদ্ধ করা হয়েছিল।
১৯৬৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ থেকে শিশু দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। নেদারল্যান্ডসে দত্তক নেওয়া কিছু শিশুর ক্ষেত্রেও সে সময় অনিয়মের ঘটনা পাওয়া যায়।
পরবর্তী সময়ে শিশু পাচার ও ধর্মান্তরিত করার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ১৯৮২ সালে ওই আইনে সংশোধন আনা হয়। এর পর বিদেশিদের কাছে শিশু দত্তক দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আইনটি বাতিল হওয়ার আগে এর আওতায় বহু যুদ্ধশিশু ও পরিত্যক্ত শিশুকে দত্তক দেওয়া হয়েছিল।
তবে বিদেশে বসবাসকারী কেউ বাংলাদেশি নাগরিক হলে অভিভাবকত্বের মাধ্যমে শিশুকে নিজের জিম্মায় নিতে পারেন। শিশুকে দেশের বাইরে নিতে হলে প্রয়োজনীয় নথিপত্র দিয়ে আবেদন করতে হয়। এরপর আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে শিশুকে বিদেশে নেওয়া যায় বলে জানান আইনজীবীরা।
পালক সন্তান কি সম্পত্তির উত্তরাধিকারী?
আইন অনুযায়ী, আসল সন্তান ছাড়া পালক সন্তান সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না। অভিভাবক হিসেবে কোনো শিশুকে লালন-পালন করলেও মুসলিম ও খ্রিস্টান আইনে ওই শিশু সম্পত্তির উত্তরাধিকার পায় না বলে জানান আইনজীবী মিতি সানজানা।
তবে মুসলিমদের ক্ষেত্রে পালক সন্তানকে হেবা বা উপহারের মাধ্যমে সম্পত্তি দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। মিতি সানজানার মতে, এটি বৈধ নয়।
তিনি বলেন, হেবা করতে হলেও দেখাতে হবে যে সম্পত্তি গ্রহণকারী ‘ফার্স্ট ব্লাড’-এর মধ্যে রয়েছেন। দাদা, দাদি, নানা ও নানির বাইরে হেবা করা যায় না। তবে দেশে অনেকে তা করেন।
তার মতে, এ ক্ষেত্রে তাঁদের জালিয়াতির আশ্রয় নিতে হয়।
তবে মুসলিমরা ওসিয়তের মাধ্যমে পালক শিশুকে সম্পত্তি দিতে পারেন। কিন্তু পুরো সম্পত্তি ওসিয়ত করা যায় না।
মিতি সানজানা বলেন, ওসিয়ত মৃত্যুর পর কার্যকর হয়। আইন অনুযায়ী মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ ওসিয়ত করা যায়। পুরো সম্পত্তি ওসিয়ত করার সুযোগ নেই।
তবে এই প্রক্রিয়াতেও আইনি জটিলতা রয়েছে। পালক বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর পালক সন্তানকে ওই সম্পত্তি ভোগ করতে হলে অন্য ওয়ারিশদের অনাপত্তি নিতে হয়।
এ জন্য পালক সন্তানকে আরেকটি আবেদনের মাধ্যমে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


