বর্ষার শুরুতে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে দেখা দিয়েছে ভাঙন। নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ভিটেমাটি, ঘরবাড়ি, কৃষিজমিসহ নানা স্থাপনা। ভাঙন রোধে নেওয়া হচ্ছে না জোরালো কোনো উদ্যোগ। এতে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা দিন দিনই বাড়ছে ।
বান্দরবান ও আলীকদম প্রতিনিধি জানান, বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার সদর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ছাবের মিয়াপাড়া এলাকায় মাতামুহুরী নদীর ভাঙন দেখা দিয়েছে। একইভাবে ২ নম্বর চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের মংচিং হেডম্যানপাড়া সংলগ্ন চৈক্ষ্যং খালেও পানি বাড়লেই শুরু হয় ভাঙন। এতে প্রতিবছরই নদী ও খালের তীরবর্তী পরিবারগুলো বসতভিটা ও ফসলি জমি হারাচ্ছে। ভাঙন ঠেকাতে একাধিকবার জিও ব্যাগ ফেলা হলেও স্থায়ীভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ফলে নদী ও খালপাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, আলীকদম সদর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ছাবের মিয়াপাড়া এলাকায় মাতামুহুরী নদীর প্রায় ৩০০ মিটার তীরজুড়ে ভাঙন ঠেকাতে সারি সারি বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। তবে পানির প্রবল স্রোতে এসব জিও ব্যাগের অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভাঙনের শিকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাধারণত বর্ষা মৌসুমের শুরু ও শেষের দিকে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। পানির প্রবল স্রোতে নদী ও খালের তীর ধসে পড়ছে। ভাঙন ঠেকাতে এর আগে কয়েক দফা জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফলে ছাবের মিয়াপাড়া ও মংচিং হেডম্যানপাড়া এলাকার মানুষ এখন বসতভিটা হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।
বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের দিকে ২ নম্বর চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের মংচিং হেডম্যানপাড়া এলাকায় চৈক্ষ্যং খালের ভাঙন প্রতিরোধে প্রায় ৮০ মিটার এলাকায় জিও ব্যাগ দিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা করা হয়। এরপর আলীকদম সদর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ছাবের মিয়াপাড়া এলাকায় মাতামুহুরী নদীর তীর রক্ষায় প্রায় ৩০০ মিটার এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
জিও ব্যাগ দিয়ে নদী ও খালের তীর রক্ষার দুটি কাজে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানা গেছে।
আলীকদম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন বর্তমানে সাময়িকভাবে বহিষ্কৃত রয়েছেন। তবে এর আগে তিনি বলেন, মাতামুহুরী নদীতে ব্যাপকভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হচ্ছে। সদর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল মুবিন বলেন, ছাবের মিয়াপাড়া এলাকা এখন ভাঙনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব বলেন, বন্যার কারণে আলীকদম সদর ইউনিয়নের ছাবের মিয়াপাড়া ও চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের মংচিং হেডম্যানপাড়া সংলগ্ন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের অংশে জিও ব্যাগ ফেলে তীর রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে। স্থায়ীভাবে ব্লক দিয়ে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের একটি প্রকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে কাজ শুরু করা হবে।
বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি জানান, বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ও চাঁদপাশা ইউনিয়নের সংযোগ সড়ক ও মীরগঞ্জ বাজারসংলগ্ন বেড়িবাঁধ নদীভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হওয়ার সম্মুখীন হয়েছে। বাঁধ ও সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আশপাশের পাঁচ শতাধিক কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দা চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। দ্রুত ভাঙনরোধে ব্যবস্থা না নিলে দুই ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় নদীভাঙন অব্যাহত থাকলেও তা প্রতিরোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমানে বেড়িবাঁধ ও সড়কের একটি অংশ নদীর দিকে ধসে পড়েছে। এতে যেকোনো সময় সড়কটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রহমতপুর ও চাঁদপাশা ইউনিয়নের মানুষের চলাচলের জন্য সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এলাকার কৃষকেরা এ পথ ব্যবহার করে উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহন করেন। সড়কটি ভেঙে গেলে কৃষিপণ্য পরিবহনের পাশাপাশি শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হবে।
তাদের দাবি, ভাঙন অব্যাহত থাকায় নদীর তীরবর্তী কৃষিজমি ও বসতভিটাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন করে ভাঙনরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, সময়মতো বাঁধ রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে শুধু সড়ক ও বেড়িবাঁধই নয়, আশপাশের কৃষিজমি ও জনবসতিও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এ বিষয়ে বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।
লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পশ্চিম গাঁওদিয়া এলাকায় পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীর পানি বৃদ্ধি, প্রবল স্রোত ও ঘূর্ণিপাকের কারণে নদীতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ এলাকায় জিও ব্যাগ সরে গেছে এবং ভাঙন অনেকটা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে ভিটেমাটি হারানোর ভয় ও আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী এলাকার প্রায় শতাধিক পরিবার।
ভাঙনের তীব্রতা ও আতঙ্কে নদীর পাড়সংলগ্ন পরিবারগুলো তড়িঘড়ি করে ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বেশ কয়েকটি বসতবাড়ি, সড়ক, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি।
গত মঙ্গলবার সকালে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন লৌহজং উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারজানা ববি মিতু। তিনি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা নদী ভাঙনরোধে সাধ্যমতো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। আপাতত জিও ব্যাগ ও ব্লক ফেলে ভাঙন প্রতিরোধ করা যায় কি না, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি ও প্রবল স্রোতের পাশাপাশি ঘূর্ণিপাকের কারণে নদীর তীর ধসে পড়ছে। ভাঙনের আতঙ্কে স্থানীয় বাসিন্দারা ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন। স্থানীয়রা জানান, সোমবার সকাল থেকে হঠাৎ করে নদীর তলদেশে ভাঙন শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই নদীতীরবর্তী বিপুল পরিমাণ জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নদীর পাড়সংলগ্ন প্রায় ২০০ ফুট এলাকা ভেঙে নদীতে চলে গেছে। এতে আশপাশের বসতবাড়ি, সড়ক ও ফসলি জমি চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
পশ্চিম গাঁওদিয়া এলাকার স্থানীয় লোকজন জানান, হঠাৎ করে পদ্মার পানির তীব্র স্রোতে পাড় ধসে পড়তে শুরু করেছে। চোখের সামনে জমিজমা নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আমাদের ভিটেমাটি হারিয়ে যাবে।
গাঁওদিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য তোবারক ঢালী বলেন, দুপুরে জোয়ারের পানির সঙ্গে প্রায় ২০০ ফুট এলাকা নদীতে ভেঙে গেছে। সকালেও যেখানে শুকনো ছিল, সেখানে এখন লগি ফেলে দেখেছি ৩০ হাতেরও বেশি গভীর হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীভাঙন প্রতিরোধে এর আগে ফেলা জিও ব্যাগের একটি অংশ প্রবল স্রোত ও ঘূর্ণিপাকে সরে যাওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
দীর্ঘ মেয়াদে পশ্চিম গাঁওদিয়া এলাকাকে পদ্মার ভাঙন থেকে রক্ষা করতে নদীতীরে স্থায়ীভাবে ব্লক স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। একই সঙ্গে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
লৌহজং পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, ভাঙনরোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। যাতে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হয়, সেদিকেও আমাদের সবসময় সজাগ দৃষ্টি রয়েছে।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, তিস্তায় হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কুড়িগ্রামের রাজারহাটের ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের বুড়িরহাট অংশের ক্রস বাঁধের রাস্তায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার ভোর থেকে ক্রস বাঁধের রাস্তার উত্তর ও দক্ষিণ পাশে হঠাৎ ভাঙন শুরু হয়। গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ ও সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, পানি বৃদ্ধির কারণে ভোরে হঠাৎ করেই বুড়িরহাট ক্রস বাঁধের রাস্তার একটি অংশে ভাঙন দেখা দেয়। পরে রাস্তার উত্তর ও দক্ষিণ পাশে ভাঙন বিস্তৃত হতে থাকে।
বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। গুরুত্বপূর্ণ এই জায়গায় ভাঙন দেখা দেওয়ায় আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধ করা না হলে ক্রস বাঁধের রাস্তার আরো অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এতে স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের বসতবাড়ি, কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় কৃষক সাজু মিয়া বলেন, ‘ভোর থেকেই ক্রস বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে এলাকার মানুষ অনেকটাই আতঙ্কিত। তিস্তায় ভাঙন দেখা দিলে খুব ভয় লাগে; মনে হয়, কখন যেন বাড়িটাও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।’
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, হঠাৎ তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বুড়িরহাট ক্রস বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। খবর পাওয়ার পর আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে দ্রুত ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

