সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে বিরোধী দলকে সভাপতি দেওয়া হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে বিরোধী দলকে সভাপতি দেওয়া হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ফাইল ছবি

বুধবার জাতীয় সংসদে ১০টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গঠন করা হয়। তবে, এর একটিতেও সভাপতি পদে বিরোধী দলের কাউকে দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়। বিরোধী দলকে সভাপতি পদ না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ মো. তাহের।

তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি দলের আচরণে তাদের সংসদে থাকার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে একই প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠন হলে ওয়াকআউট করবেন বলে হুমকি দেন। অবশ্য আজ ওয়াকআউটের ঘোষণা না দিলেও তাহেরের বক্তব্যের পরে বিরোধী দলের সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন। অবশ্য এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাইয়েদ উদ্দিন আহমেদ হানজালা সংসদ কক্ষে অবস্থান করেন।

বিজ্ঞাপন

বুধবার বৈঠকে দিনের শেষ কার্যসূচি হিসেবে সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির প্রস্তাবে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত একে একে ১০টি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গঠন শেষে সংসদের বৈঠকে সভাপতির দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বৈঠক মুলতবি ঘোষণা করতে গেলে পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর চান বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ মো. আব্দুল্লাহ মো. তাহের।

তাহের বলেন, সরকারি দলের সাথে কিন্তু আমরা বৈঠক করেছি। সেই বৈঠকে সংসদের প্রতিনিধিত্বে আনুপাতিক হারে ২৬ শতাংশ শেয়ার বিরোধী দল পাওয়ার কথা। সরকারি দল সেটা এগ্রি করেছে এবং সদস্যের ব্যাপারে সরকারি দল তা পালন করেছে। আমরা আশা করি এটা সভাপতির পদেও আমরা ২৬% পাবো, এটা আমাদের রাইটস। কারণ সভাপতি কোন দল থেকে কত হবে, কী অনুপাতে হবে—এ ব্যাপারে কার্যপ্রণালি বিধিতে কোনো উল্লেখ নেই। একটা সময় সরকারি দলের পক্ষ থেকে আমাদেরকে ১০টি সভাপতির পদ দেওয়া হবে বলে বলাও হয়েছিল। আমাদের কাছ থেকে তালিকাও নেওয়া হয়েছিল। আমরা তালিকা জমাও দিয়েছি।

বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, আমার মনে হচ্ছে সরকারি দল টু-থার্ড মেজরিটির কারণে কিছুটা বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে। তারা নিজেরাই যেভাবে ডিসাইড করছে সেটাই এখানে তারা প্রয়োগ করছে। সরকারি দলের আচরণে বিরোধী দলের ক্রমশ সংসদে থাকার আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

তার বক্তব্যের পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন এমন ইঙ্গিত দিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যখনই কোনো কথা বলা হয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা কেউ জবাব না দিলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাঁড়িয়ে যান। উনি একটা জবাব দেন।

তিনি বলেন, এটা খুবই ইনডিসেন্ট যে সরকারি দল যখন বলে যে আপনারা এই কমিটিতে আসেন তাইলে আপনাদেরকে এটা দিবো। আমরা তো বাচ্চা ছেলে না যে আমাদেরকে ললিপপ দেখাবেন এবং পরে আর একটা জায়গায় গিয়া আপনি আমাদেরকে অন্যভাবে ডিল করবেন।

বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, তারা সভাপতির পদ সরকারের কাছে চাইছেন। এটা তাদের অধিকার। সরকার এ অধিকার ইগনোর করছে।

আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ওনারা তো এটা ডিসাইড করতে পারেন না যে শতভাগ সভাপতি ওনারা নেবেন। এটা কোথায় লেখা আছে? এটা কি সংবিধানে আছে? তাইলে দি উইল অফ দি মেজরিটি পার্টি হ্যাজ বিকাম দি ল, দি ডিসিশন অফ দিস পার্লামেন্ট, এটাই তো স্বৈরাচার।

তাহের বলেন, স্বৈরাচার অর্থ আমি যা যা চাই, এটাই আইন, এটাই আমার আচরণ হবে। আমরা এই পার্লামেন্টকে এভাবে দেখতে চাই না। সুতরাং আমি মনে করি সরকারি দল দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে বৈষম্যবিরোধী যে আন্দোলন তাকে রেস্পেক্ট করে নিজেরা পার্লামেন্ট এবং পার্লামেন্টের বাইরে বৈষম্য সৃষ্টি করবেন না। কারণ আমরা আরেকটা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চাচ্ছি না। বিরোধী দলকে কোনো সভাপতি পদ না দেওয়ার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তিনি। ভবিষ্যতে এভাবে কমিটি গঠন হলে সেই প্রক্রিয়ায় বিরোধী দল নাও থাকতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, এর পরে কমিটি গঠনের ব্যাপারে যদি একই নীতিমালা অনুসরণ করা হয়, তাহলে ওই সময় ওনাদের কথা শোনার জন্য এই সংসদে আমরা নাও থাকতে পারি।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, উপনেতা বক্তব্য দিয়েছেন, তিনি এখন জবাবটা শুনতে চাচ্ছেন না। সম্ভবত ওয়াকআউট নয়, তবে ওয়াকআউট। যাই হোক ওই আরকি, তাল পড়িয়া ধপ করিল না পড়িয়া দপ করিল।

তিনি বলেন, বিরোধী দলের সদস্যদেরকে আসনের অনুপাতিক হারে সভাপতি দেওয়া যাবে না, এটা কোথাও নেই, আবার বাধ্যবাধকতাও নেই। অতীতের ইতিহাসেও নেই। তিনি বলেন, বিরোধী দলকে ১০টি সভাপতি দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আলোচনা হয়নি।

স্বৈরাচার বিষয়ে বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য থাকলেও বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলুপ্ত করেনি। বিএনপি যখন যখন দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি থাকে এবং সরকার গঠন করে, তখন গণতন্ত্রের পদ্ধতিকে সুদৃঢ় করে।

সালাহউদ্দিন বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেটা রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, তারাও করেছেন, আমরাও করেছি। সেখানে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছি—এই যে সংসদীয় চর্চায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিতে সংখ্যার অনুপাতে, আসনের সংখ্যার অনুপাতে বিরোধীদলীয় সদস্যরা সভাপতিত্ব পাবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা যে অঙ্গীকার করেছে তা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে, সংবিধান সংশোধিত হলে, তারপর কমিটিগুলো তখন পুনর্গঠন করা হবে। আনুপাতিক হারে বিরোধী দল সভাপতি পাবে। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য বিরোধী দল কোনো সহযোগিতায় আসছে না।

বিরোধী দলের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপনারা বাইরে রাজনীতি না করে সংসদে আসুন। এখানেই কথা বলি। যদি সংবিধান সংশোধনীর জায়গায় আপনারা যদি সংস্কার বলতে আপনাদের আরাম লাগে, তাহলে তাই বলবেন। কিন্তু সংশোধনী হিসেবে তো সংসদীয় ভাষায় এখানে এমেন্ডমেন্টটা গৃহীত হতে হবে।

দশটি কমিটি গঠন

কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিএনপির গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটির সভাপতি শিক্ষক নেতা সেলিম ভূঁইয়া, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সেলিমা রহমানকে, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে হুইপ রকিবুল ইসলাম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীকে, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠনের সভাপতি করা হয়েছে কলিম উদ্দিন আহমেদ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে আমানউল্লাহ আমান, পরিবেশ মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে হুইপ জি কে গউছকে, ভূমি মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে নাসের রহমানকে এবং ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে রফিকুল ইসলাম জামালকে।

জাতীয় সংসদের ৫০টি সংসদীয় কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত এবং ১১টি সংসদ সংক্রান্ত। এর মধ্যে ২৫টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত। এর মধ্যে সংসদ সম্পর্কিত একটি কমিটিতে বিরোধী দলের উপনেতাকে সভাপতি করা হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন