বই পড়ার অভ্যাসই তৈরি করতে পারে ধৈর্যশীল ও মানবিক জাতি: জুবাইদা রহমান

বই পড়ার অভ্যাসই তৈরি করতে পারে ধৈর্যশীল ও মানবিক জাতি: জুবাইদা রহমান
ছবি: সংগৃহীত

একটি বই শুধু জ্ঞানই দেয় না, মানুষের চিন্তা ও মননকে বদলে দেয়। বই পড়ার অভ্যাস শিশু-কিশোরদের মধ্যে সহনশীলতা, সহমর্মিতা ও অন্যকে সম্মান করার মানসিকতা তৈরি করে। একই সঙ্গে মূল্যবোধ, ন্যায়পরায়ণতা, সততা, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের মতো গুণাবলি গড়ে ওঠে। এভাবেই বই পড়ার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধৈর্যশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে মন্তব্য করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।

তিনি বলেছেন, শিশু-কিশোরদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে শুধু শহর নয়, দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত পাঠাগারের বিস্তার ঘটাতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম ও শহরে পাঠাগার ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেছেন, পাঠাগার ও বইয়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সম্পর্ক যত গভীর হবে, সমাজে তার ইতিবাচক প্রতিফলন তত বেশি দেখা যাবে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে নয় দিনব্যাপী ‘জিয়া স্মৃতি বইমেলা ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জিয়া স্মৃতি পাঠাগার এ বইমেলার আয়োজন করেছে।

ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ‘ইনশা আল্লাহ, বাংলাদেশের ৯০ হাজার ৪৯টি গ্রামে ছড়িয়ে পড়ুক এই পাঠাগার। শিশু-কিশোরদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে তাদের মাঝে মূল্যবোধ, ন্যায়পরায়ণতা, সততা, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় বদ্ধমূলভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি শহরে তার প্রতিফলন ঘটবে।’

বই পড়ার কারণে শিশু-কিশোরদের মধ্যে সহনশীলতা ও সহমর্মিতা বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্যকে সম্মান দেওয়ার প্রবণতাও তাদের মধ্যে তৈরি হবে। এর মধ্য দিয়ে তারা ধৈর্যশীল মানুষ হিসেবে সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।

সংগ্রাম ও দেশপ্রেমের পাঠ্যবইয়ে

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন ডা. জুবাইদা রহমান।

তিনি বলেন, এসব বইয়ে তাঁদের জীবনের সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, ধৈর্য, সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের কথা উঠে এসেছে। তাঁদের আদর্শ ও দিকনির্দেশনা চলার পথে পাথেয় হয়ে থাকবে।

তবে শুধু নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্যে পাঠচর্চাকে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্বের জ্ঞান ও ইতিহাস সম্পর্কে জানার ওপর জোর দিয়েছেন অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ।

বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে সারা বিশ্বের জ্ঞান আহরণ করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু বাংলাদেশের নাগরিক নই, আমরা সারা বিশ্বের নাগরিক। তাই আমাদের সারা বিশ্বের জ্ঞান আহরণ করতে হবে। আমরা আল্লাহর কাছে অর্থ ও সুস্বাস্থ্যের পাশাপাশি জ্ঞান অর্জনের জন্য দোয়া করি, জ্ঞান আহরণের জন্য দোয়া করি।’

মাহবুব উল্লাহর ভাষায়, ‘একটি সভ্য জাতির প্রতীক হচ্ছে—বই, বই এবং বই। আর সভ্য জাতির চর্চা হচ্ছে—পড়ো, পড়ো, পড়ো। আমরা কি পড়ি? আমরা কি জ্ঞানচর্চা করি?’

জ্ঞানচর্চায় বাংলাদেশ সামনের সারিতে থাকতে পারলে কোনো আধিপত্যবাদী শক্তি দেশের মানুষকে অপমান করার কিংবা দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কথা বলার সুযোগ পেত না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জিয়া পাঠাগারের কার্যক্রমের প্রসঙ্গ টেনে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াকে নিয়ে পড়াশোনা করার পাশাপাশি বিশ্বের তাবৎ নেতাদের নিয়েও পড়াশোনা করতে হবে। কীভাবে তারা নিজেদের দেশকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে নিয়ে গেছেন, তা জানতে হবে।

একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতি, কবি, বিজ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিদের নিয়েও পড়াশোনা ও চর্চার আহ্বান জানান তিনি।

প্রযুক্তি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিতে অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মাহবুব উল্লাহ বলেন, এসব ক্ষেত্রে অগ্রসর না হলে কোনো পরাশক্তি বা আধিপত্যবাদের সঙ্গে পেরে ওঠা সম্ভব নয়।

দেশের গ্রন্থাগারগুলোর অবহেলার বিষয়টিও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন মাহবুব উল্লাহ।

তিনি বলেন, এদেশে গ্রন্থাগার সবচেয়ে অবহেলিত। এটিই প্রমাণ করে, জাতি হিসেবে আমরা এখনো রুচিশীল ও মার্জিত হতে পারিনি।

নিজের ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, একসময় মানুষ গ্রন্থাগারে গিয়ে পড়াশোনা করতেন। পত্রিকা পড়ার পাশাপাশি বই পড়ার অভ্যাসও ছিল মানুষের মধ্যে।

গ্রন্থাগারগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি করা গেলে সমাজের নানা কুসংস্কার, অজ্ঞতা ও অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। তরুণদের নেশার জগৎ থেকেও ভালো পথে ফিরিয়ে আনতে বই ও পাঠাগার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আরও বেশি বই পড়ার আহ্বান জানান জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। নিজের সহকর্মীদের মধ্যে বই পড়ার চর্চা কমে যাওয়ায় একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি গ্লানি বোধ করেন বলেও জানান।

তিনি বলেন, তার সহকর্মীদের মধ্যে বই পড়ার চর্চা অনেক কমে গেছে। যে জাতি পড়াশোনা করে, তাদের কেউ আটকাতে পারে না।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালামসহ অনেকে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি করেন মুন্সি রেজাউল হোসেন টিটু।

নয় দিনব্যাপী ‘জিয়া স্মৃতি বইমেলা ২০২৬’-এ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস ও শিশুতোষ বই স্থান পেয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন