আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রায় পুরো প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত সব নির্বাচনের জন্যই দলীয়ভাবে একক প্রার্থী ঠিক করেছে দলটি। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী আগে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তাই এ নির্বাচন ঘিরেই জামায়াতের তৎপরতা বেশি চলছে।
ইতোমধ্যে সারা দেশের প্রায় সব ইউনিয়নে দলটির প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যশীল, সৎ, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ, স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় ও পরীক্ষিত দায়িত্বশীলদেরই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এসব প্রার্থী দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও গণসংযোগমূলক নানা তৎপরতা চালাচ্ছেন।
এদিকে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্য করে অংশ নিলেও স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে তা থাকছে না। এতে এককভাবেই অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত। জাতীয় নির্বাচনের আগে থেকেই স্থানীয় নির্বাচনের জন্য দলটির প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে তারা অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে বলে জানা গেছে। পুরুষের পাশাপাশি সবক্ষেত্রে মহিলা প্রার্থীও নিশ্চিত করছে তারা।
তাছাড়া বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের সময়ে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বিস্তারসহ নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে জামায়াত। সে অনুযায়ী কেন্দ্রভিত্তিক দলটির পোলিং এজেন্ট ও প্রয়োজনীয় জনশক্তি ঠিক করে তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশনে গিয়েও দলটির প্রতিনিধিরা নানা শঙ্কা ও দাবির কথা তুলে ধরছেন। তফসিলের পর প্রার্থীরা পুরোদমে ভোটারদের কাছে ছুটবেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম আমার দেশকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচনের জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে। আগে থেকেই প্রস্তুতি চলছিল; তবে জাতীয় নির্বাচনের পর তা আরো জোরদার হয়।
তিনি জানান, স্থানীয় নির্বাচনের জন্য ইতোমধ্যে প্রায় সব প্রার্থী ঠিক করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য স্থানীয় নেতাদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রার্থী চূড়ান্ত করেন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা। উপজেলা ও পৌরসভার জন্য আঞ্চলিক দায়িত্বশীল এবং সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য নির্বাচনের প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ চূড়ান্ত করে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সূত্রমতে, গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের অধীনে ২২৪টি আসনে দলীয় প্রার্থী দেয় জামায়াত। এতে ৬৮ আসনে বিজয়ী এবং অন্যগুলোতেও বেশ ভালো ফল করে দলটি। জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আগামী স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে আরো বেশি বিজয়ী হতে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। ইউনিয়ন ছাড়াও সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য নির্বাচন ঘিরেও জামায়াত প্রার্থীরা নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম এবং উত্তরে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির সেলিম উদ্দিন দলটির প্রার্থী হবেন। ডাকসুর মেয়াদ শেষ না হওয়ায় সাদিক কায়েম এখনো প্রার্থী হিসেবে প্রকাশ্য ঘোষণা না দিলেও দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন সেলিম উদ্দিন। ‘আমাদের শহর আমরাই গড়ব, ঢাকা উত্তর বদলে দেব’—এমন প্রত্যয় নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়ে গণসংযোগ চালাচ্ছেন তিনি।
সেলিম উদ্দিন বলেন, আমরা এ নগরীকে বদলাতে চাই। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, ঐক্যবদ্ধভাবে ঢাকা উত্তর সিটিকে একটি আধুনিক ও মডেল সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। শুধু মুখের কথায় নয়, কাজের মাধ্যমেই আমরা ঢাকা শহরকে বদলে দিতে চাই। আমাদের অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতে আমরা কাজ শুরু করেছি।
এদিকে স্থানীয় নির্বাচনের বিভিন্ন পদে প্রার্থী চূড়ান্তের আগে জামায়াত নেতাদের মধ্যেও বেশ অঘোষিত প্রতিযোগিতা ও তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। তবে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছ বাছাই পদ্ধতির কারণে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার সুযোগ দেয়নি দলটি। কেউ সিদ্ধান্ত না মানলে তার দলে থাকারও সুযোগ নেই। যে কারণে খুব সহজেই একক প্রার্থী চূড়ান্ত করছে দলটি। প্রার্থিতার বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষার কারণে সম্প্রতি খুলনার পাইকগাছার একটি ইউনিয়নের জামায়াত নেতার রুকনিয়াত বাতিল ও দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা জামায়াতের আমির হাবিবুর রহমান আমার দেশকে বলেন, তার উপজেলাসহ জেলার প্রায় সব ইউনিয়নে চেয়ারম্যান, মেম্বার ও মহিলা মেম্বার প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। তারা নিজ নিজ এলাকায় সভা-সমাবেশে গিয়ে পরিচিত হচ্ছেন, বাজারের দোকানে দোকানে যাচ্ছেন। তফসিলের পর প্রার্থীরা ভোটারদের ডোর টু ডোর যাবেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
একই ধরনের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে যশোরের মনিরামপুর উপজেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আহসান হাবিব লিটন আমার দেশকে জানান, তাদের উপজেলার ১৭ ইউনিয়নের মধ্যে ১৫টিতেই প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। হিন্দুপ্রধান দুটি ইউনিয়নে প্রার্থী ঠিক করা হলেও ঘোষণা বাকি আছে। সব ইউনিয়নেই নির্বাচনের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি চলছে এবং বিপুল ভোটে বিজয়ের আশা রয়েছে।
প্রার্থী বাছাইয়ের যোগ্যতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনপ্রিয়তা, সততা, সাংগঠনিক দক্ষতায় এগিয়ে থাকা দায়িত্বশীলরাই স্থান পেয়েছেন। ইতোমধ্যে প্রার্থীরা এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ, সমাজসেবা, উন্নয়নমূলক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। সরকারি দলসহ অন্য কেউ এখনো প্রার্থী ঘোষণা না করায় জামায়াতের অবস্থান এগিয়ে আছে বলে জানান তিনি।
তবে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়ে এই নেতা আরো বলেন, ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা ইতোমধ্যে নানা ধরনের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। তবে আমরা এসব আমলে না নিয়ে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক প্রস্তুতি জোরদার করছি। পোলিং এজেন্ট ছাড়াও প্রয়োজনীয় জনশক্তিকে প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
এদিকে স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে নানা শঙ্কা, অভিযোগ ও দাবির বিষয়গুলো নির্বাচন কমিশনের কাছে তুলে ধরছেন জামায়াত নেতারা। সবশেষ গত ১ সেপ্টেম্বর দলটি ইসিতে গিয়ে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানায়। এছাড়া নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পদধারী এবং বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত প্রশাসকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণার দাবি জানান তারা।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনারদের (ইসি) সঙ্গে বৈঠক শেষে ৯ দফা দাবি পেশ করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এর আগে ইসিতে সিনিয়র সচিব নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগের কথা জানায় দলটি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


