বাংলাদেশে গুম প্রতিরোধে নতুন আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল-২০২৬’ উত্থাপন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিলটি সংসদে পাস হলে গুমকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের পথ তৈরি হবে।
তবে প্রস্তাবিত আইনটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর মূল কারণ, গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব কোনো পৃথক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে না দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও ভিন্নমতের অনেককে গুম করার অভিযোগ উঠেছিল। এমনকি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও একসময় গুমের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকার পতনের পর পরিস্থিতি বদলের দাবি ওঠে। গুমের ঘটনা তদন্তে ২০২৫ সালে একটি কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। একই বছর গুম প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
তবে বিএনপি সরকার গঠনের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদিত না হওয়ায় সেই অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারায়। পরে বিষয়টি আরো যাচাই-বাছাই করে গুম ইস্যুতে নতুন আইন করার কথা জানায় সরকার।
এখন সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই সংসদে উঠেছে নতুন বিল। তবে বিলটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর থেকেই এর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে মিরাজ শেখ নামে একজন ব্যক্তিকে গুম করার অভিযোগও সামনে এসেছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত দুই বছরের মধ্যে এটিই গুমের প্রথম ঘটনা বলে ধারণা করছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ফলে দেশে গুমের ঘটনা বা এ ধরনের তৎপরতা আবার শুরু হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।
গুমের সংজ্ঞা, শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ
প্রস্তাবিত বিলে প্রথমবারের মতো গুমের একটি আইনি সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী, শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অথবা সরকারের অনুমোদনে কাউকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণ করার পর তার অবস্থান অস্বীকার করা বা গোপন রাখাকে গুম হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
গুমের অভিযোগ প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
ভুক্তভোগী মারা গেলে অথবা পাঁচ বছর পরও তাকে খুঁজে পাওয়া না গেলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
পরিকল্পিত গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের সুযোগও রাখা হয়েছে।
বিলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের কথা বলা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের তদন্তের অগ্রগতি জানার অধিকারও রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণ এবং সাক্ষী ও তথ্যদাতার নিরাপত্তার বিষয়েও বিধান রাখা হয়েছে।
স্বাধীন তদন্ত সংস্থা নেই কেন
প্রস্তাবিত আইনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তদন্তের দায়িত্ব নিয়ে।
অন্তর্বর্তী সরকার গুমের অভিযোগ তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে যে ক্ষমতা দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, নতুন বিলে সেখানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবে তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে রাখা হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, গুমের অভিযোগ যদি কোনো শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠে, তাহলে অন্য কোনো বাহিনীকে দিয়ে তদন্ত করালেও সেটি কতটা স্বাধীন হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ মনে করেন, তদন্তের দায়িত্ব পৃথক কোনো কমিশন বা বেসামরিক প্রশাসনের হাতে দেওয়া উচিত ছিল।
তিনি বলেন, আইনটি এমনভাবে করা দরকার ছিল, যাতে তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা অন্য কোনো বাহিনীর বদলে পৃথক কোনো কমিশন কিংবা বেসামরিক প্রশাসন করতে পারে।
তার মতে, একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্য বাহিনী তদন্ত করলে খুব একটা ভিন্ন ফলাফল নাও আসতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গুমের মতো স্পর্শকাতর অপরাধ তদন্তে একটি পৃথক, স্বাধীন ও বিশেষায়িত সংস্থা প্রয়োজন। ওই সংস্থার নিজস্ব জনবল ও বাজেট থাকতে হবে। গোপন আটকস্থল পরিদর্শনের ক্ষমতাও থাকতে হবে। তা না হলে তদন্তে পক্ষপাতের আশঙ্কা থেকে যাবে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমানও মনে করেন, গুমের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে থাকলে আইনটির কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় থাকবে।
তিনি বলেন, গুমের মতো ঘটনা তদন্তের ক্ষেত্রে বিশেষ কমিশন বা ইস্যুভিত্তিক বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন করা বাঞ্ছনীয়।
তবে তার মতে, নতুন আইনের একটি ইতিবাচক দিক হলো—এর মাধ্যমে গুমের বিষয়ে অভিযোগ করার আইনি ভিত্তি তৈরি হচ্ছে।
বিচার ও ভুক্তভোগীর অধিকার নিয়েও প্রশ্ন
তদন্তের বিষয়টির বাইরে প্রস্তাবিত আইনে আরো কিছু ত্রুটি দেখছেন অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক।
তার মতে, গুমের শিকার ব্যক্তির অধিকার ও প্রয়োজনের বিষয়গুলো আইনে যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবারের ক্ষতিপূরণের বিষয়েও স্পষ্ট কিছু উল্লেখ নেই।
অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুকের ভাষ্য, কোনো ঘটনায় আসামির সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা অস্বীকার বা আত্মপক্ষ সমর্থনের অনেক সুযোগ আইনের মধ্যেই রাখা হয়েছে। এতে অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ থেকে যেতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আদালতে সাধারণ ফৌজদারি মামলাই বছরের পর বছর চলে। গুমের মতো জটিল মামলায় সাক্ষী সুরক্ষা, প্রমাণ সংগ্রহ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয় রয়েছে। এসব মিলিয়ে ১২০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করা বাস্তবে কঠিন।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও স্পষ্ট নয় বলে মনে করেন তিনি।
সাক্ষী ও তথ্যদাতার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনে নিরাপত্তার কথা বলা হলেও বাস্তবে তাদের সুরক্ষা দেবে কে, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
কারণ, অতীতে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হুমকির মুখে পড়তে দেখা গেছে।
পরিবর্তন কতটা টেকসই হবে
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুমের ঘটনা তদন্তে কমিশন গঠন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি এবং অধ্যাদেশ ও আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপে গুমের বিষয়টি অস্বীকারের জায়গা থেকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা স্পষ্ট।
প্রস্তাবিত বিলে গুমকে সংজ্ঞায়িত করা, শাস্তির বিধান রাখা এবং ভুক্তভোগী ও পরিবারের জন্য আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের সুযোগ রাখার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
তবে এসব বিধান বাস্তবে কতটা কাজে আসবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে তদন্ত কতটা স্বাধীনভাবে করা যায় তার ওপর। গুমের অভিযোগের তদন্ত যদি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে না হয়, তাহলে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
তাই নতুন আইন শুধু গুমকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে কি না, সেটিই শেষ কথা নয়। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার কতটা আস্থা পায় এবং অপরাধের তদন্ত ও বিচার কতটা নিরপেক্ষভাবে হয়—সেটিই শেষ পর্যন্ত এই আইনের সাফল্য নির্ধারণ করবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


