২০২৪ সালের ১০ আগস্ট ভোরে গাজা শহরের আল-তাবিন স্কুলে ইসরাইলি হামলার পর ধোঁয়াটে ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে নিজের ছেলে সাদকে খুঁজছিলেন ইয়াসমিন মাহানি। স্বামীকে চিৎকার করতে দেখলেও ছেলের কোনো সন্ধান পাননি তিনি।
সোমবার সম্প্রচারিত আলজাজিরা আরবির এক অনুসন্ধানে মাহানি বলেন, “আমি মসজিদে ঢুকে দেখেছি, রক্ত আর মাংসের ওপর দিয়ে হাঁটছি। কয়েক দিন ধরে হাসপাতাল আর মর্গে খুঁজেছি। কিন্তু সাদের কোনো চিহ্ন পাইনি। এমনকি দাফনের জন্য একটি লাশও নয়—এটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন।”
গাজায় চলমান ইসরাইলি সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। এই সহিংসতার মধ্যে মাহানির মতো হাজারো ফিলিস্তিনি রয়েছেন, যাদের স্বজনরা নিখোঁজ হয়ে গেছেন—কোনো লাশ বা দেহাবশেষ ছাড়াই।
আলজাজিরা আরবির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দ্য রেস্ট অব দ্য স্টোরি অনুযায়ী, গাজার সিভিল ডিফেন্স দল ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ২,৮৪২ জন ফিলিস্তিনিকে “বাষ্পীভূত” হিসেবে নথিভুক্ত করেছে। এসব ঘটনায় রক্তের ছিটা বা দেহের ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া আর কোনো অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়নি।
গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল আল জাজিরাকে জানান, উদ্ধারকারী দলগুলো ঘটনাস্থলে নির্মূলের পদ্ধতি অনুসরণ করে হিসাব করে থাকে। তিনি বলেন, ‘যদি কোনো পরিবার জানায় ঘরে পাঁচজন ছিল এবং আমরা মাত্র তিনটি অক্ষত মৃতদেহ পাই, তবে বাকি দুজনকে ‘বাষ্পীভূত’ হিসেবে গণ্য করা হয়—যখন বিস্তৃত অনুসন্ধানেও জৈবিক চিহ্ন পাওয়া যায় না।’
বিশেষজ্ঞ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা এই ঘটনাগুলোর জন্য ইসরাইলকে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ তাপীয় ও থার্মোবারিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। এসব অস্ত্র, যেগুলো ভ্যাকুয়াম বা অ্যারোসল বোমা নামেও পরিচিত, ৩,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা সৃষ্টি করতে সক্ষম।
রাশিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞ ভ্যাসিলি ফাতিগারভ বলেন, “থার্মোবারিক অস্ত্র শুধু মানুষ হত্যা করে না, তারা পদার্থকেও ধ্বংস করে। বিস্ফোরণের সময় জ্বালানির মেঘ ছড়িয়ে বিশাল আগুনের গোলা ও ভ্যাকুয়াম প্রভাব তৈরি হয়।” তিনি জানান, অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও টাইটানিয়াম গুঁড়ো ব্যবহারের ফলে তাপমাত্রা ৩,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তদন্তে আরো বলা হয়, ট্রাইটোনাল নামের বিস্ফোরক—যা TNT ও অ্যালুমিনিয়াম পাউডারের মিশ্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি MK-84 বোমায় ব্যবহৃত—এই চরম তাপের উৎস হতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব নির্বিচার অস্ত্রের ব্যবহার শুধু ইসরাইল নয়, বরং এর পশ্চিমা সরবরাহকারীদেরও দায়বদ্ধ করে। কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন প্রভাষক ডায়ানা বাট্টু বলেন, ‘এটি শুধু ইসরাইলি গণহত্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক গণহত্যা।’
দোহায় আল জাজিরা ফোরামে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে এই অস্ত্রের অব্যাহত সরবরাহ দেখতে পাচ্ছি। তারা জানে এসব অস্ত্র যোদ্ধা ও শিশুর মধ্যে পার্থক্য করে না, তবুও সরবরাহ বন্ধ করছে না।’
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এমন অস্ত্রের ব্যবহার যুদ্ধাপরাধের শামিল উল্লেখ করে বাট্টু প্রশ্ন তোলেন, `বিশ্ব জানে ইসরাইল এসব নিষিদ্ধ অস্ত্রের মালিক এবং ব্যবহার করে। তাহলে কেন তাদের জবাবদিহিতার বাইরে রাখা হচ্ছে?'
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী মোতায়েনের ইঙ্গিত ট্রাম্পের
‘মুসলমান হয়ে আমরা কি কোনো অপরাধ করে ফেলেছি’— প্রশ্ন আসামের মিঞাঁ মুসলমানদের
গভীর সংকটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, পদত্যাগের জোরালো দাবি