সার সংকট নিয়ে সংসদে বিতর্ক

সরকার বলছে সারের সংকট নেই, কৃষক সার পাচ্ছে না কেন—বিরোধী দলের প্রশ্ন

সরকার বলছে সারের সংকট নেই, কৃষক সার পাচ্ছে না কেন—বিরোধী দলের প্রশ্ন

দেশের সার সংকট নিয়ে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যের তোলা নোটিশের ওপর দুই দলের সংসদ সদস্যরা বক্তব্য রাখেন। তবে, আলোচনায় দুই দলের শীর্ষ পর্যায়ের কেউই বক্তব্য দেননি। নোটিশ দেওয়া বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানসহ দলটির দুইজন সংসদ সদস্য ও সরকার দলের পক্ষে তিন প্রতিমন্ত্রী আলোচনায় অংশ নেন। দেশের সার ব্যবস্থাপনা দেখভালের দায়িত্বে থাকা শিল্প ও কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে আলোচনায় অংশ নিতে দেখা যায়নি।

বিজ্ঞাপন

আলোচনায় সরকার দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। অপরদিকে বিরোধী দল প্রশ্ন তুলেছে, সারের ঘাটতি না থাকলে কৃষক কেন সার পাচ্ছে না। বিরোধী দল সার সংকটের কারণ হিসেবে সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছে।

দেশজুড়ে তীব্র সার সংকটে কৃষি কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া; কৃষকদের মাঝে বিরাজমান আতঙ্ক এবং সম্ভাব্য খাদ্য সংকটের ঝুঁকি নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ বিষয়ে আলোচনার জন্য কার্য প্রণালি বিধির ৬৮ বিধিতে নোটিশটি দেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান।

আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, স্বৈরাচার সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া অনেক ডিলার এখনো বহাল আছে। আবার অনেকে পলাতক। এখনো প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯টি সারের ডিলার পয়েন্ট শূন্য। বিতরণে যাতে সমস্যা না হয় সেজন্য প্রত্যেক ইউনিয়নে একজন করে নতুন ডিলারের নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচার আমলে নিয়োগ পাওয়া ডিলাররা বিভিন্নভাবে সরকারকে হেয় করার চেষ্টা করছে। কৃত্রিম সংকট তৈরি করার চেষ্টা করছে। এটি আর করতে পারবে না।

ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি সারের মজুতের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলনে, গত বছর মজুত অনেক কম ছিল। তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং মিয়ানমারের সারের দাম অনেক বেশি। এই কারণে কিছু সার সেখানে পাচার হওয়ার প্রবণতার তথ্য প্রশাসনের কাছে রয়েছে। এরকম দুটি ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সার আছে বলেই কৃষকেরা আগামী মৌসুমের জন্য সার কিনতে পারছেন। এটা মাথায় রেখেই কৃষি বিভাগ ও সরকার প্রত্যেক জেলায় অতিরিক্ত সার মজুদ রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেছে।

সার সংকটের মধ্যে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত গোডাউন ভর্তি—এমন অভিযোগ করে এর সমালোচনা করেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আবার সেই ২০০১–২০০৬ সালের সিনড্রোম। যখন এক বস্তা সারের পরিবর্তে কৃষককে গুলির মুখে জীবন দিতে হয়েছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুল আলম বলেন, সার বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির প্রাণ। চলমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশে খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, “২০২৬ সালের বর্তমানে এই সংকটে সরকারের তথ্যমতে সার অতিরিক্ত মজুদ আছে। সার যদি অতিরিক্ত মজুদ থাকে তবে কৃষকরা সার পাচ্ছে না কেন এবং কেন তাদের কালোবাজারে যেতে হচ্ছে?”

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও রৌমারীতে কৃষকদের গোডাউন লুটের ঘটনা এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারের জন্য কৃষকদের অসন্তোষের কথাও সংসদে তুলে ধরেন তিনি।

এই সংসদ সদস্যের অভিযোগ, সারের মজুত থাকার পরও কৃষকদের মধ্যে যে হাহাকার তৈরি হয়েছে, তা সরকারের ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। কালোবাজারি রোধ, ডিলারদের সিন্ডিকেট ভাঙা এবং কৃষকের কাছে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ করেন তিনি।

জামায়াতের সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, তারা সরকারের কথা বিশ্বাস করতেই চান। কিন্তু এখানে একটা সমস্যা আছে। জ্বালানি সংকট যখন শুরু হলো, তখনও কিন্তু আমাদের বলা হয়েছিল দেশে কোথাও লোডশেডিং নেই। এখন কি আমরা ওনাদের বিশ্বাস করব, নাকি অবিশ্বাস করব? কয়দিন পরে যখন জ্বালানি মন্ত্রী বলছেন জ্বালানি সংকট নিয়ে আমাদের কিছুই করার নেই, দুইদিন পরে যে উনারাই বলবেন না জ্বালানি সরবরাহের কোনো গ্যারান্টি আছে কিনা?”

নাজিব বলেন, সরকারের সাফল্য এবং ব্যর্থতা তার ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। বলতে বাধ্য হচ্ছি, সরকার সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। সার কারখানাগুলোকে বন্ধ রেখে বেশি দামে জনগণের টাকায় আপনারা সার কিনছেন, বলছেন মজুদ আছে—ঠিকই আছে, কিন্তু এটা কৃষকের হাতে পৌঁছাতে পারছে না কেন? এটাই আপনাদের ব্যর্থতা। জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকটে যা লক্ষ্য করেছি, সারের সংকটের ক্ষেত্রেও আমরা একই বিপর্যয় লক্ষ্য করছি।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, সার ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে ইতিমধ্যেই অনেক কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যার অংশ হিসেবে ৬৪টি জেলায় ৬৪টি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। কোথাও কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের ডিলারদের পরিবর্তনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন শূন্য পদে ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, যার আবেদনের শেষ তারিখ আগামীকাল। কিন্তু আবেদনের সময় শেষ হওয়ার আগেই অহেতুক অনিয়মের অভিযোগ তোলা অবান্তর।

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রতি ইঙ্গিত করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যে সংসদ সদস্য সার নিয়ে কথা বলে সভা ত্যাগ করেছেন, উনার বক্তব্য শুনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উকিল আবদুস সাত্তারের কথা মনে পড়ে। উনার বেইমানির জন্য কপালে কী আছে তা আল্লাহই ভালো জানেন।

তিনি বলেন, পত্রপত্রিকায় আসা সার সংক্রান্ত ২০-২২টি বিশেষ এলাকার ছোটখাট সমস্যাগুলোকে ভিত্তি করে অসন্তোষ ছড়ানোর অপচেষ্টা চলছে। সাবোটাজ না করে জনগণের পক্ষে কীভাবে কাজ করা যায় সেদিকে নজর দেওয়া উচিত।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমানে দেশে সারের মোট পরিমাণ ৫১ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন, যা চাহিদা মেটানোর পরও ১৫ দশমিক ৮৪ লক্ষ মেট্রিক টন উদ্বৃত্ত (সারপ্লাস) থাকবে। কৃষকদের সম্মানিত করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী টাঙ্গাইল জেলায় প্রথম কৃষক কার্ড উদ্বোধন করেন। এই কার্ডের মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া অনেক সহজ হবে, উৎপাদন বাড়বে এবং সারের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে। বিরোধী দলকে আহ্বান জানানো হচ্ছে যে আস্থা রাখুন, কারণ বিএনপি যা বলে তা-ই পালন করে এবং কখনো জনগণের বিরুদ্ধে যায় না।

বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শরিফুল আলম শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য তুলে ধরে বলেন, দেশে পর্যাপ্ত সার উৎপাদন, আমদানি ও মজুদ রয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন বা বিসিআইসি উৎপাদিত ও আমদানি করা সার কারখানা ও বাফার গুদামে রাখে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী তা ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে বিসিআইসির সাতটি সার কারখানার মধ্যে ঘোড়াশাল-পলাশ এবং শাহজালাল সার কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড গ্যাস পাওয়ার পর উৎপাদন শুরুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

শরিফুল আলম বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমি মনে করি সারের কোনো সংকট নাই। সারে পর্যাপ্ত উৎপাদন, আমদানি, মজুদ রয়েছে। সংকট তীব্র নয়, সার আছে। ব্যবস্থাপনা ত্রুটি কিছু থাকতে পারে।’

এমএমআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন