বগুড়া ও জামালপুর জেলার মধ্যবর্তী সারিয়াকান্দির যমুনার চরে ১১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার প্যানেল প্রকল্পের কাজ অর্থসংকটে নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হয়নি। তবুও কাজ চলছে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৬০ শতাংশ কাজ হয়েছে। আগামী ২৭ সালে এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। যদিও উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ছিল গত বছরের ডিসেম্বরে।
সারিয়াকান্দি উপজেলার বোহাইল ইউনিয়নের উত্তর শংকরপুর গ্রামের সীমানার সঙ্গে জামালপুরের মাদারগঞ্জ কাইজার চরে নির্মিত এ প্রকল্পের নামকরণ করা হয়েছে ‘মাদারগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট’, যা পরবর্তী সময়ে ১১০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘মাদারগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট’ প্রকল্পটির কাজ গত ২০২৩ সালে শুরু হয় বগুড়া সারিয়াকান্দি উপজেলার সীমানা ঘেঁষে জামালপুরের মাদারগঞ্জের কাইজার চর নামক গ্রামে। ইতোমধ্যে প্রকল্পটির ৩২৫ দশমিক ৬৫৩৬ একর জমিতে মাটি ভরাটের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, পুরো প্রকল্পকে নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে এর চারপাশে আরসিসি ব্লক বাঁধাইসহ আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন। এখন চলছে বিশালাকার এলাকাজুড়ে সৌর প্যানেল বসানোর জন্য খুঁটি স্থাপনের কাজ।
জাতীয় গ্রিডের আঙ্গিকে বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে এবং কোথাও প্যানেলের ফ্রেম তৈরি করা হচ্ছে। পাশের স্টোররুমে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিশালাকৃতির বড় বড় সোলার প্যানেল। প্রকল্পটির প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ সমাপ্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের ম্যানেজার দিদারুল ইসলাম দিদার। এখন শুধু বাকি ফ্রেমে প্যানেল বসিয়ে উৎপাদনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
জানা গেছে, গত ২০২৩ সালের ১৩ জুন জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের ইন্টারন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানি সিআরইসি এবং বাংলাদেশ সরকারের বিআর পাওয়ারজেন লিমিটেডের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে এই যৌথ প্রকল্পের চুক্তি সই হয়। সিআইআরই, চায়না এবং বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেডের মধ্যে জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানির শেয়ার সিআইআরইয়ের ৭০ শতাংশ ও বি-আর পাওয়ারজেনের ৩০ শতাংশ। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩১.৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রম হচ্ছেÑ১০০ মেগাওয়াট (পরে ১১০ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে) সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট এবং কনস্ট্রাকশন (ইপিসি) কাজ সম্পাদন, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ৩২৫ দশমিক ৬৫৩৬ একর ভূমি উন্নয়ন, ১৩২ কেভি ৪৭ কিমি. পাওয়ার ইভাক্যুয়েশন লাইন এবং ইভাক্যুয়েশন অবকাঠামো নির্মাণ, সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অফিস বিল্ডিং, ওয়ার্কশপ, ওয়্যারহাউজ এবং আনসার ব্যারাক নির্মাণ, ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং ৩২৫ দশমিক ৬৫৩৬ একর ভূমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত গ্রহণ।
এদিকে প্রকল্পের সীমানার ভেতর প্রায় ১০০টি পরিবার বসবাস করত, যাদের প্রজেক্ট শুরুর সময়ই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে কর্তৃপক্ষ। সেখানে তারা পাকা বাড়িতে অনেক মানসম্মত পরিবেশে বসবাস করছেন। তাদের আবাসিক ব্যবস্থাপনার ভেতরে বাজার, মসজিদ, ফার্মেসি সবকিছুর ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং অন্যান্য আবাসন উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে। বগুড়া এবং জামালপুরের একাধিক বাসিন্দা জোড় দাবি জানিয়ে বলেছেন, বেশ কিছুদিন থেকেই তারা লোডশেডিংয়ের কারণে নানা ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন। তাই অতি দ্রুত এই সোলার প্ল্যান্টের উৎপাদন চান তারা।
ইতোমধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে, যার মোট উৎপাদনক্ষমতা ২০০ মেগাওয়াট। জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট হবে ১১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন। তাই এটি দেশের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ সৌরশক্তিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে চলেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বহুমুখীকরণের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমবে বলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পের ম্যানেজার দিদারুল ইসলাম দিদার বলেন, কোম্পানি অর্থাভাবের কারণে জটিলতায় রয়েছে। বিশাল অঙ্কের বিল বাকি রয়েছে। তাই ইচ্ছা থাকলেও অর্থনৈতিক সংকটে দ্রুত উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
কাজলা ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, বগুড়া এবং জামালপুরবাসীর পক্ষে আমরা অতি দ্রুত সোলার প্যানেল প্রকল্প চালু এবং এর উৎপাদন শুরু হোক এটা চাই। এর উৎপাদন শুরু হলে আমাদের দুই জেলার অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ হবে বলে আমরা আশাবাদী।
প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক হুমায়ুন আকতার বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। তবে এলাকাবাসী সহযোগিতা করলে দ্রুত সময়ের মধ্যে এ প্রকল্পের উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। ২০১৭ সাল থেকে দেশে এ পর্যন্ত সাতটি সোলার পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৬০ মেগাওয়াট।
এদিকে বগুড়া-জামালপুরের মানুষের মধ্যে দুই কারণে এক ধরনের সুখানুভূতি কাজ করছে। প্রথমটি হলো, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দ্বিতীয় যমুনা সেতু সারিয়াকান্দিতেই করার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি সারিয়াকান্দি নৌবন্দর প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এসব প্রকল্পের ঘোষণা যমুনা বিধৌত নদী ভাঙনের শিকার সারিয়াকান্দির মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ এমন অভিব্যক্তিই প্রকাশ করেছেন।
এসআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

