যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ পরিকল্পনা নিয়ে ইংল্যান্ডে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো ওয়েস্টমিনস্টারের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকা ক্ষমতা ও অর্থের একটি বড় অংশ আঞ্চলিক সরকার এবং নির্বাচিত মেয়রদের হাতে তুলে দেওয়া। তবে এ উদ্যোগে বড় শহরগুলো বেশি সুবিধা পেলে ইংল্যান্ডের গ্রামীণ ও অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর সঙ্গে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বার্নহামের পরিকল্পনায় ইংল্যান্ডের আঞ্চলিক ও মেট্রোপলিটন মেয়রদের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব মেয়রকে এখন ‘স্ট্র্যাটেজিক অথরিটি’র নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আবাসন, পরিবহন ও জনসেবায় আরও বেশি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। ২০২৭ সাল থেকে আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষগুলো স্থানীয়ভাবে আদায় করা ব্যবসায়িক করের একটি অংশ ধরে রাখতে পারবে এবং ২০২৮ সাল থেকে স্থানীয় আয়করের অংশও তাদের হাতে যাওয়ার কথা। এর ফলে ওয়েস্টমিনস্টারের অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় সরকারগুলো নিজেদের এলাকার প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করতে পারবে বলে সরকারের ধারণা।
এই পরিবর্তনের ফলে ম্যানচেস্টার, লন্ডন, বার্মিংহামসহ বড় শহর ও মেট্রোপলিটন অঞ্চলগুলো দ্রুত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পেতে পারে। আবাসন নির্মাণ, গণপরিবহন, অবকাঠামো এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাচিত মেয়ররা বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের তুলনায় বেশি স্বাধীনতা পাবেন। বার্নহাম নিজেও গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র থাকাকালে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা প্রয়োগের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, এই ব্যবস্থা ইংল্যান্ডের সব অঞ্চলের জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে কি না। বড় শহরগুলোতে শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নির্বাচিত মেয়র থাকলেও সোমারসেট, উইল্টশায়ার, কর্নওয়ালসহ অনেক গ্রামীণ এলাকায় একই ধরনের কাঠামো এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ফলে বিকেন্দ্রীকরণের সুফল শহরকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে, ‘ডিভল্যুশন’ যদি কেবল বড় শহরগুলোর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রকল্পে পরিণত হয়, তাহলে ইংল্যান্ডের আঞ্চলিক বৈষম্য কমার বদলে বাড়তে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোর ঘাটতি থাকলে শুধু স্থানীয় প্রশাসনকে ক্ষমতা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; পর্যাপ্ত অর্থ ও প্রশাসনিক সক্ষমতাও প্রয়োজন।
সরকার অবশ্য ২০২৮ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের সব অঞ্চলে কোনো না কোনো ধরনের ‘স্ট্র্যাটেজিক অথরিটি’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো স্থানীয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজন অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন করা।
তবে দ্রুত এই ব্যবস্থা চালু করা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে কত অর্থ থাকবে, তাদের সিদ্ধান্তের ওপর কী ধরনের নজরদারি থাকবে এবং স্থানীয় জনগণের কাছে মেয়র ও আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ কতটা জবাবদিহি করবে—এসব বিষয় এখনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। যথাযথ জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নতুন ধরনের স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ তৈরি করতে পারে।
ইংল্যান্ডে ক্ষমতা ওয়েস্টমিনস্টার থেকে অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন হলেও শুধু বড় শহরকে শক্তিশালী করলেই হবে না। লন্ডন ও ম্যানচেস্টারের মতো শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল অঞ্চলগুলোকেও সমানভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অর্থায়ন ও উন্নয়নের সুযোগ দিতে হবে। তা না হলে বার্নহামের ‘ডিভল্যুশন বিপ্লব’ ইংল্যান্ডের আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর পরিবর্তে নতুন বৈষম্য তৈরি করতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

