ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে মরণব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসকের সহায়তায় জীবন শেষ করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন ব্রিটিশ এমপিরা।
শুক্রবার হাউস অব কমন্সে ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটির পক্ষে ২৭০ এবং বিপক্ষে ২৮৬ ভোট পড়ে।
এর ফলে যুক্তরাজ্যে সহায়তায় মৃত্যু বৈধ করার উদ্যোগ আবারও বড় ধাক্কা খেল। সমর্থকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক বছর এ বিষয়ে নতুন করে আইন করার উদ্যোগ আর না-ও আসতে পারে।
লেবার পার্টির এমপি লরেন এডওয়ার্ডস বিলটি এনেছিলেন। এতে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে মরণব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের সহায়তায় জীবন শেষ করার সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল। শুক্রবার বিলটির দ্বিতীয় পাঠে ভোট হয়। কোনো বিল নিয়ে এমপিদের প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগকে দ্বিতীয় পাঠ বলা হয়।
ভোটের পর হাউস অব কমন্সে কয়েকজন এমপি উল্লাস করেন এবং একে অপরকে আলিঙ্গন করেন। পার্লামেন্ট স্কয়ারে সহায়তায় মৃত্যুর বিরোধীরাও উদ্যাপন করেন।
তবে বিলটির সমর্থকেরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাদের বক্তব্য, জনমত জরিপে যুক্তরাজ্যের বেশির ভাগ মানুষ সাধারণভাবে সহায়তায় মৃত্যুর পক্ষে। তাই আইনপ্রণেতারা কেন বিষয়টি আইনে পরিণত করতে পারছেন না, তা সাধারণ মানুষ বুঝবেন না।
আগের বিলও আটকে গিয়েছিল
এর আগে লেবার এমপি কিম লিডবিটার সহায়তায় মৃত্যু বৈধ করার জন্য একটি বিল এনেছিলেন। গত সংসদ অধিবেশনে সেটি এমপিদের অনুমোদন পায়।
দ্বিতীয় পাঠে বিলটির পক্ষে ৩৩০ এবং বিপক্ষে ২৭৫ ভোট পড়েছিল। তৃতীয় পাঠে পক্ষে ৩১৩ এবং বিপক্ষে ২৯১ ভোট পড়ে।
কিন্তু গত এপ্রিলে হাউস অব লর্ডসে বিলটি নিয়ে আলোচনার সময় শেষ হয়ে যায়। কয়েকজন পিয়ার শত শত সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ায় বিলটি আর এগোয়নি।
শুক্রবারের ভোটের পর লরেন এডওয়ার্ডস বলেন, ভোটাররা পরিবর্তন চান। কিন্তু হাউস অব লর্ডসের একটি অংশ বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত পদক্ষেপ নিয়ে বিলটি আটকে দেয়। পরে এমপিরাও সেটি এগিয়ে নিতে পারেননি। ভোটাররা বিষয়টি বুঝবেন না।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে একদিন সহায়তায় মৃত্যু বৈধ হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেমন হচ্ছে, এখানেও তা হবে। তবে সেটি যত দ্রুত হওয়া দরকার, তত দ্রুত হবে না।
এডওয়ার্ডসের মতে, শুক্রবার পার্লামেন্ট এই বিষয়ে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান আইন ‘অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও অন্যায্য’। তাই এটি বহাল থাকা উচিত নয়।
কিম লিডবিটার বলেন, তিনি খুবই দুঃখিত ও হতাশ। তবে নিজের জন্য নয়। দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে প্রচার চালানো মানুষ এবং মৃত্যুপথযাত্রীদের জন্য তিনি হতাশ। এসব মানুষ জীবনের শেষ সময়ে পছন্দ, সহমর্মিতা ও মর্যাদা চান।
বিষয়টি আবার পার্লামেন্টে তোলার চেষ্টা হবে বলেও জানান তিনি। তবে কখন তা করা হবে, তা তিনি জানেন না।
‘বিলটি নিরাপদ নয়’
বিলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া তিন লেবার এমপি অ্যাশলি ডালটন, মেগ হিলিয়ার ও জেস আসাতো বলেন, তাদের সিদ্ধান্তের কারণ ছিল বাস্তব বিষয়।
তারা বলেন, এটি শুধু নীতিগত বিতর্ক ছিল না। ভোটটি এমন একটি বিল নিয়ে হয়েছে, যেটিকে তারা নিরাপদ নয় এবং বাস্তবে কার্যকর করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন।
তবে এই ফল উদ্যাপনের বিষয় নয় বলেও তারা জানান। তাদের বক্তব্য, দেশের অনেক মানুষ আইন পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রচার চালাচ্ছেন। তাদের উদ্বেগ তারা বোঝেন।
তবে তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কোনো রয়্যাল মেডিকেল কলেজ, পেশাজীবী সংগঠন বা বিশেষজ্ঞ এই বিল নিরাপদ এবং বাস্তবে কার্যকর করা সম্ভব বলে নিশ্চয়তা দেননি।
ক্যাথলিক আর্চবিশপ অব লিভারপুল জন শেরিংটন ভোটের জন্য এমপিদের ধন্যবাদ জানান।
অন্যদিকে হিউম্যানিস্টস ইউকের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু কপসন বলেন, এই ভোটে উপশমমূলক চিকিৎসা বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তার জন্য বাড়তি কোনো অর্থ দেওয়া হয়নি। বরং এসব খাতে সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা আরো কমতে পারে।
তিনি বলেন, মৃত্যুপথযায়ী মানুষ কষ্ট ভোগ করবেন, সুইজারল্যান্ডে যাবেন এবং নিজের জীবন শেষ করবেন। একই সঙ্গে বিদ্যমান বৈষম্যও চলতে থাকবে।
বিতর্কে আবেগঘন বক্তব্য
শুক্রবার ভোটের আগে হাউস অব কমন্সে আবেগঘন বক্তব্য দেন কয়েকজন এমপি।
বিলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া অ্যাশলি ডালটন মেটাস্ট্যাটিক স্তন ক্যানসারের জন্য আজীবন চিকিৎসা নেন। তিনি বলেন, একই সঙ্গে নিরাময়যোগ্য বিষণ্নতা ও মরণব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষদের যথেষ্ট সুরক্ষা এই বিলে নেই।
বিলটির পক্ষে ভোট দেওয়া লেবার এমপি ক্লেয়ার হ্যাজেলগ্রোভ তার মায়ের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তার মা ৬১ বছর বয়সে শেষ পর্যায়ের মরণব্যাধিতে ভুগে নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
হ্যাজেলগ্রোভ বলেন, তার মা ভালো উপশমমূলক চিকিৎসা পেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতা ছিল—সব ধরনের ব্যথা এই চিকিৎসায় কমানো যায় না। কয়েক সপ্তাহ ধরে মাকে তীব্র ব্যথায় কাতরাতে ও চিৎকার করতে দেখার কথা তিনি কখনো ভুলবেন না।
এবার সমর্থন কমল
আগের বিলের তুলনায় এবার সহায়তায় মৃত্যুর পক্ষে সমর্থন কমেছে। কিম লিডবিটারের বিল দ্বিতীয় পাঠে ৩৩০-২৭৫ এবং তৃতীয় পাঠে ৩১৩-২৯১ ভোটে এগিয়েছিল।
শুক্রবারের ভোটে দুই পক্ষের ভোটই আগের তুলনায় কমেছে। তবে বিলের সমর্থকদের ভোট কমেছে বেশি।
কয়েকজন এমপি বলেছেন, এবার সহায়তায় মৃত্যুর পক্ষে প্রচারকারীদের কাছ থেকে তারা আগের তুলনায় কম তদবির পেয়েছেন।
এবার সরকারের অবস্থানও আগের তুলনায় বেশি সংশয়পূর্ণ ছিল।
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ও তার মন্ত্রীরা এ বিষয়ে কোনো পক্ষ নেননি। তারা এটিকে এমপিদের ব্যক্তিগত বিবেচনার বিষয় হিসেবে দেখেছেন।
প্রধানমন্ত্রীও ভোট দেননি। তার পূর্বসূরি অবশ্য আগের বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক সেবাব্যবস্থা উন্নত না হওয়া পর্যন্ত সহায়তায় মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক স্থগিত রাখা উচিত।
আরেকটি বিষয় নিয়েও কিছু এমপির উদ্বেগ ছিল। হাউস অব লর্ডস আবার বিলটি আটকে দিলে পার্লামেন্ট অ্যাক্ট ব্যবহার করে সেটি পাস করানোর সম্ভাবনা ছিল। এই আইনের আওতায় হাউস অব লর্ডস এমপিদের সমর্থিত কোনো বিল অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখতে পারে না।
আইন হলে কার্যকর করবে সরকার
শুক্রবারের বিতর্কের শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অ্যালিসন ম্যাকগভর্ন বলেন, বিলটি আইনে পরিণত হলে সরকার সেটি কার্যকর করবে।
তবে তিনি সামাজিক সেবাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগের কথাও জানান।
ম্যাকগভর্ন বলেন, সামাজিক সেবাব্যবস্থাকে অনেক দিন ধরে উপেক্ষা করা হয়েছে। এই খাতে কাজ করা প্রায় ১৫ লাখ মানুষ, যাদের বেশির ভাগই নারী, এবং যেসব পরিবার এই সেবার ওপর নির্ভর করে—শুক্রবার পার্লামেন্টে তাদের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

