বিএনপি সরকারের ৬ মাস

খুনোখুনিতে জড়িয়েছে দলের একাংশ, নিহত ৩৯ নেতাকর্মী

খুনোখুনিতে জড়িয়েছে দলের একাংশ, নিহত ৩৯ নেতাকর্মী
বিএনপি লোগো

সরকার গঠনের ছয় মাসেই খুনোখুনিতে মেতেছে বিএনপি। গত ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে দলটির অন্তত ৩৯ জন নেতাকর্মী অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই বেশি সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। কমিটিতে পদ-পদবি দখল নিয়েও চলছে বিরোধ। এছাড়া হাট-বাজার ও বাস টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সংঘর্ষে জড়াচ্ছেন নেতাকর্মীরা।

এদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আসন্ন নির্বাচন ঘিরে প্রার্থিতা নিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন দ্বন্দ্ব। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, টেন্ডার ভাগাভাগি, ব্যক্তিগত বিরোধ ও উপদলীয় গ্রুপিং। কোথাও কোথাও এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত রাজনৈতিক সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। এমনকি প্রতিপক্ষকে হত্যায় অন্য জেলা থেকে মোটা অঙ্কের টাকায় ভাড়াটে সন্ত্রাসী এনেও খুনের ঘটনাও ঘটানো হচ্ছে। এতে করে দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে। প্রাণ হারাচ্ছেন নানা পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যেও উঠে এসেছে একই চিত্র।

বিজ্ঞাপন

ডিবি জানিয়েছে, গত ২৪ জুলাই কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশে ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে পেশাদার কিলার ভাড়া করেছিলেন কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজ। তারা বাবুকে হত্যা করতে না পারলেও গুলিতে যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী নিহত হন। হাফিজ দুই শুটারকে নড়াইল থেকে ভাড়া করেছিলেন বলে জানায় ডিবি।

জানা গেছে, ঢাকাসহ দেশের নানা স্থানে একপক্ষ আরেক পক্ষকে ঘায়েল করা করা এবং গ্রুপ ভাড়ার জন্য টাকার ছড়াছড়ি হচ্ছে। পুলিশ বলছে, তারা অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসছেন। এখানে কোন দল বা কে কোন সংগঠনের কর্মী তা দেখা হচ্ছে না।

অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সরকারি দলে খুনোখুনি হওয়ায় রাষ্ট্র ও সমাজে বিরূপ পরিস্থিতি বা ধারণা তৈরি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ রাজনীতিবিমুখ হচ্ছে।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি (জনসংযোগ ও মালটিমিডিয়া) শাহাদাত হোসাইন আমার দেশকে জানান, রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম জানান, কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটলে কে কোন দলের এটি দেখা হয় না। আইন অনুযায়ী, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরো জানান, সমাজে যে-ই বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করবে, তিনি আইনের চোখে অপরাধী। কাজেই অপরাধীকে একবিন্দু ছাড় দেওয়া হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক জানান, সরকারি দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক পদ-পদবি, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, দখলবাণিজ্য, মামলাবাণিজ্যসহ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করার সূত্র ধরে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এ সহিংসতা অনেক ক্ষেত্রে হত্যা পর্যন্ত গড়াচ্ছে। ফলে রাজনীতি সম্পর্কে সমাজে বিরূপ পরিস্থিতি বা ধারণা তৈরি হচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিএনপি এবং বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের ৩৯ নেতাকর্মী খুন হন। এসব ঘটনার অধিকাংশ ঘটেছে, ঢাকা, ঝিনাইদহ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য জেলায়। দুই গ্রুপের সংঘর্ষে প্রায় ২৫০ জন নেতাকর্মী নিহত হন।

নিহতদের মধ্যে রয়েছে- বিএনপির ২১ জন, যুবদলের আট জন, কৃষক দলের দুজন, শ্রমিক দলের দুজন, স্বেচ্ছাসেবক দলের তিনজন, ছাত্রদলের দুজন এবং তাঁতীদলের একজন।

খুনোখুনির ঘটনায় দলটির একাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এসব ঘটনায় পাল্টাপাল্টি হামলায় আহত হন প্রায় তিন শতাধিক।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মোট ছয় মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক দলীয় কোন্দল ও নির্বাচনি সহিংসতায় ৫৬ জন নিহত হন বলে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানিয়েছে। এ সময় ৮৩০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে নানা রাজনৈতিক দলের ৫৬ জন নিহত হন।

নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৩৭ জন, জামায়াতের ছয়জন ও অন্যান্য দলের ১১ জন রয়েছেন। ৮৩০টি সহিংসতার ঘটনার ৬৭৩টি, অর্থাৎ (৮১%) ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দল ও বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে।

এইচআরএসএস জানায়, জুলাইয়ে সারা দেশে ৪৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ছয়জন নিহত এবং ১৬৪ জনের বেশি নানা দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হন। গত জুনে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ৩৪৬ জন আহত হয়েছিল।

জুলাই মাসের ৪৫টি সহিংসতার ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৪টি ঘটনায় অন্তত ৪৮ জন আহত ও দুজন নিহত হন। বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষের ছয়টি ঘটনায় ৪৪ জন এবং বিএনপি-আওয়ামী লীগের তিনটি সংঘর্ষে ১৩ জন আহত হন। বিএনপি-এনসিপির পাঁচটি সংঘর্ষে ৩৮ জন এবং অন্যান্য দলের সঙ্গে বিএনপির ১৪টি সংঘর্ষে ১৬ জন আহত হন। এছাড়া নানা দলের মধ্যে তিনটি ঘটনায় তিনজন নিহত ও পাঁচজন আহত হন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১০ মার্চ সীতাকুণ্ডে যুবদলের কর্মী সজিব চৌধুরীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। জানা গেছে, ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়াকে কেন্দ্র করে কোন্দলে সজিবকে হত্যা করা হয়েছে। গত ২৪ জুলাই রাতে রাজধানীর কাফরুলে যুবদলের কর্মী ইউসুফ আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় বিএনপির স্থানীয় নেতারাই জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গত ৮ জুন রাতে ফুটপাতে চাঁদার টাকার ভাগকে কেন্দ্র করে রাজধানীর মৌচাকের আনারকলি মার্কেটের সামনে রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ২ জুন ময়মনসিংহে খুন হন বিএনপিকর্মী রানা মিয়া। ৯ জুন বাগেরহাটের ফকিরহাটে বারুইপাড়া ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি বাদল মোড়লকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

চট্টগ্রামের রাউজানে ১৩ জুন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে খুনোখুনি হয়েছে। ১২ জুন খুলনার লবণচরার মাথাভাঙ্গায় বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলামকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২৭ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের শম্ভুপুরা ইউনিয়নের চরহোগলার বালুরঘাট এলাকায় বিএনপিকর্মী রাজু আহম্মেদকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

১ জুলাই রাজধানীর আদাবরের নবোদয় কাঁচাবাজারে পূর্ববিরোধের জেরে একটি সালিশ বৈঠক বসে। ওই সালিশ চলাকালেই হামলার ঘটনা ঘটে। কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয় ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল বাসার বাদশা এবং থানা বিএনপির সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আবুল বাসার বাদশা। গুরুতর আহত সাদ্দাম হোসেন চিকিৎসাধীন। সালিশের ঘটনা সামনে থাকলেও এর পেছনে স্থানীয়ভাবে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সর্বশেষ গত ১৫ আগস্ট পুরান ঢাকার সদরঘাটে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক দলের আহ্বায়কের অনুসারীদের দু'গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে মিতুল (২০) নামে এক তরুণ নিহত হয়। মিতুল কোতোয়ালি থানার ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী বলে জানা গেছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকার আসার পর তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কঠোর হয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিভিন্ন জেলার এসপিদের বার্তা দেওয়া হয়েছে, খুনোখুনিতে জড়ালে কাউকে ছাড় না দেওয়ার জন্য। এক্ষেত্রে দলীয় কোনো পদ না দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়। কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটলে তারা জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছেন। এতে কে কোন দলের এবং কোন গ্রুপের তারা তা দেখছেন না। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তাদের মৌখিকভাবে সে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, ভিকটিমের অভিযোগ অনুযায়ী, মামলার তদন্তে যার নাম উঠে আসবে তাকেই যেন আসামি করা হয়। সেক্ষেত্রে অধিকতর যাচাই-বাছাই করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি মামলার আসামি না হয়। পাশাপাশি যেখানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটবে, সেখানে মাঠপর্যায়ের লোকজনের কাছ থেকে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করে মামলার তদন্ত শেষ করা এবং চার্জশিটের আদেশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অবৈধ অস্ত্রে সহিংসতার ঝুঁকি

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের নানা থানা ও ব্যারাক থেকে অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। ওই লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, পুলিশের এখনো ১,৩২০টি অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। খোয়া যাওয়া অস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে- এসএমজি, চায়না রাইফেল ও পিস্তলসহ অন্যান্য অস্ত্র। সেগুলো সস্ত্রাসীদের হাতে চলে গেলে রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। পুলিশ বলছে, এসব অস্ত্র উদ্ধারে তারা নানা স্থানে অভিযান চালাচ্ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন