বর্জ্যের অব্যবস্থাপনায় দুর্বিষহ নগরজীবন

Mahmuda Doly
মাহমুদা ডলি

বর্জ্যের অব্যবস্থাপনায় দুর্বিষহ নগরজীবন

বর্জ্যের অব্যবস্থাপনায় দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের জীবন। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে বাতাসে ধুলোবালুর সঙ্গে উড়তে থাকে পলিথিনসহ ময়লা-আবর্জনা। যত্রতত্র বর্জ্যের স্তূপে চাপা পড়ে যাচ্ছে রাস্তার অর্ধেক পথ। ফুটপাতের অধিকাংশই প্রস্রাবের কারণে হাঁটার অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে, সঙ্গে দুর্গন্ধ তো রয়েছেই। এসব কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি বিরূপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপরও।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী, এ দুই সিটিতে রয়েছে ১২৯টি ওয়ার্ড। এসব ওয়ার্ড থেকে প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার ৮০০ থেকে ৭ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। তবে এর ৫৫ শতাংশই সঠিকভাবে সংগ্রহ হয় না।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, গত সাত বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করেছে প্রায় তিন হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। তবু শহরজুড়ে রয়ে গেছে ২৫০টিরও বেশি অনিয়ন্ত্রিত ভাগাড়। ফলে বিপুল বর্জ্য খাল, নদী ও উন্মুক্ত স্থানে জমে থেকে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায়, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চারটি ধাপ রয়েছে। সেগুলো হলো—বাড়ি থেকে প্রাথমিক সংগ্রহ, এসটিএসে জমা, ট্রাকে করে ল্যান্ডফিলে পরিবহন এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তি।

কিন্তু এর প্রতিটি ধাপেই দুর্বলতা রয়েছে বলে জানা গেছে। শেষ ধাপ অর্থাৎ, পুনর্ব্যবহার ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যত নেই। ময়লা নিয়ে আগে পুড়িয়ে ফেলা হতো, এখন আর সেই কাজটাও হচ্ছে না। শহরের বর্জ্য পরিশোধন প্ল্যান্টও অপর্যাপ্ত, ফলে অধিকাংশ বর্জ্য শেষ পর্যন্ত খোলা জায়গায় ফেলা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যারা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ করে, তাদের সুরক্ষা সরঞ্জাম থাকে না। স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে তারা গ্লাভস ও মাস্ক ছাড়াই প্রতিদিন খালি হাতে কাজ করেন। এতে তারা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির তথ্যমতে, এই সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এখানে খোলা স্থানে প্রতিদিনই বাড়ছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। সড়কে খোলা ডাস্টবিন না থাকায় যে যার মতো সড়ক বা বাসাবাড়ির সামনে ময়লা ফেলে রাখছেন। এসব আবর্জনা সড়কে যানজট তৈরির পাশাপাশি এলাকাবাসীর গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে।

দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কয়েক মাস ধরে দক্ষিণ সিটির প্রধান প্রধান সড়কে ধুলোবালির সঙ্গে উড়ছে আবর্জনা, পলিথিন। মুক্তাঙ্গন এলাকা থেকে শুরু করে পল্টন মোড়, বাংলার বাণী মোড়ের ফুটপাত জুড়ে পলিথিন, ময়লা-আবর্জনা রয়েছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। ময়লা-আবর্জনার কারণে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে যাত্রাবাড়ীর দুই পাশের রাস্তা ও ফুটপাত। নয়াবাজার-বাবুবাজারে ফুটপাত বলে কিছু নেই। মেরাদিয়া থেকে রামপুরা সেতু পর্যন্ত তিনটি এসটিএস রয়েছে। বনশ্রীর ‘জি’ ব্লকে এবং রামপুরা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দুটি পূর্ণাঙ্গ এসটিএস থাকলেও বনশ্রীর ‘বি’ ব্লকে রয়েছে খালি দুটি কনটেইনার। এগুলো এসটিএস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসটিএসগুলোর সামনেই ভ্যান থেকে শুকনা ও ভেজা ময়লা আলাদা করা হচ্ছে। এতে বেশির ভাগ ময়লা রাস্তায় পড়ে স্তূপ হয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে রাজধানীর মিরপুর, উত্তরা, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, ধানমন্ডি, মতিঝিল, বনানী এলাকা ঘুরে কোনো ডাস্টবিন দেখা যায়নি। এসব এলাকার বিভিন্ন বাসা ও রেস্টুরেন্টের সামনে কাগজ, প্যাকেটসহ নানা ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়।

আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ছয় হাজার ৪৬৫ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে প্রায় চার হাজার ৭০০ টন বর্জ্য সরাসরি আমিনবাজার ও মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে ফেলা হয়। এই দুই স্থানই ইতোমধ্যেই প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে, ফলে নতুন বর্জ্যের জন্য জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর প্রতিজন নাগরিক প্রতিদিন গড়ে শূন্য দশমিক ৬১ কেজি বর্জ্য তৈরি করে। এসব বর্জ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশই খাদ্য ও সবজির জৈব বর্জ্য, যা কম্পোস্টিংয়ের মাধ্যমে পুনঃব্যবহারযোগ্য।

গবেষণার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই বিপুল জৈব বর্জ্য যদি কম্পোস্টিং প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করা যায়, তবে তা শুধু জমি সাশ্রয়ই করবে না, বরং কৃষিতে পরিবেশবান্ধব জৈব সার উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও গবেষণায় বিবেচনা করা হয়েছে।

গবেষণায় বর্তমান ল্যান্ডফিল পদ্ধতিকে ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রধান সংকট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ল্যান্ডফিলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বর্জ্য ফেলার ফলে জমি দ্রুত নষ্ট হচ্ছে, মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশছে বিষাক্ত পদার্থ, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। এছাড়া এসব বর্জ্য থেকে নির্গত মিথেন ও অন্যান্য গ্যাস জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বাড়িয়ে তুলছে।

ফুটপাতের ওপর প্রস্রাবখানা

ঢাকার অধিকাংশ ফুটপাত হয়ে উঠেছে উন্মুক্ত প্রস্রাবখানা। প্রস্রাবের তীব্র দুর্গন্ধে এসব ফুটপাত হয়ে হাঁটা যায় না। আবার রাস্তা হয়ে হাঁটতে গেলেও রয়েছে দুর্ঘটনায় পড়ার শঙ্কা। এতে তীব্র ভোগান্তিতে রয়েছেন নগরবাসী।

সরেজমিনে দেখা যায়, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, মতিঝিল, শাহবাগ, কারওয়ানবাজার, মোহাম্মদপুর, বাংলামোটর, মগবাজারের ফুটপাতের বিভিন্ন জায়গা উন্মুক্ত প্রস্রাবখানা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন ফুটওভার ব্রিজের আশপাশেও একই অবস্থা।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান আমার দেশকে বলেন, একজন মানুষ কোথায় ময়লা ফেলবে এই ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত সিটি করপোরেশন করতে পারেনি। একবার কিছু ডাস্টবিন শহরে বসালেও সেগুলো সঠিক তদারকি ও মানুষকে কীভাবে সংযুক্ত করা যায় সেটি ব্যবস্থা না করায় সেগুলোর সুফল মেলেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তো শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পুরো টালমাটাল অবস্থা। সিটি করপোরেশনের উচিত এলাকাভিত্তিক ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করা। দোকান, বাসাবাড়ির সামনে এগুলো স্থাপন করে সেখানকার বাসিন্দাদের দায়িত্ব দেওয়া। এতে মানুষ সচেতন হবে ও যত্রতত্র ময়লা ফেলার প্রবণতা কমবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ আমার দেশকে বলেন, আমরা শহরের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে শহর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চাই। অননুমোদিতভাবে ফুটপাত দখল করে বাজার বসানোর কারণে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমরা সারা রাত শহরের আবর্জনা পরিষ্কার করি, কিন্তু দেখা যায় নাগরিক অসচেতনতার জন্য দুপুরের আগেই আবার শহর নোংরা হয়ে যায়। নাগরিক সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া শহর পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মাহাবুবুর রহমান তালুকদার আমার দেশকে বলেন, টেকসই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা কঠিন। নতুন জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত পর্যাপ্ত জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতি না আসে, ততক্ষণ আদর্শ স্মার্ট ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট চালু করা বাস্তবে কঠিন।

স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি যাতে জনগণের স্বাস্থ্যের কোনো হুমকি তৈরি না হয়। কোথাও অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। লক্ষ্য হলো—ময়লা রাস্তায় বা খোলা জায়গায় ২৪ ঘণ্টার বেশি যেন না থাকে। এছাড়া দক্ষিণের ৭৫টি ওয়ার্ডের জন্য রয়েছে মাত্র ৬৪টি এসটিএস। বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে ঘাটতি রয়েছে, যেসব ওয়ার্ডে ঘাটতি রয়েছে, ওই ওয়ার্ডগুলোয় হয়তো একটু সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফুটপাতগুলোয় সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ শেষে হলেই রাস্তায় প্রস্রাবের যে সমস্যা এখন রয়েছে তা কমে আসবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন