আধার কার্ডধারী ভারতীয়দেরও পুশইন করছে বিএসএফ

আধার কার্ডধারী ভারতীয়দেরও পুশইন করছে বিএসএফ

‘হাতজোড় করে বলছি, আমাদের ঘরবাড়ি আসামে। এই দেখুন আমার আধার কার্ড। আমাদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি সব ওখানে। রাতে ঘুম থেকে তুলে এনে বিএসএফ বন্দুকের বাঁট দিয়ে গুঁতো মেরে বলছে, বাংলাদেশে ঢুকে যা! আমরা কোথায় যাব? আমাদের অপরাধ, আমরা বাংলায় কথা বলি?’

আসামের মরিগাঁও জেলার চড়াইহাজি গ্রামের ৮৩ বছর বয়সি হাফিজ উদ্দিনের এই আকুতি সীমান্তে তৈরি হওয়া নতুন মানবিক সংকটকে সামনে এনেছে। ভারতীয় নাগরিকত্বের পরিচয়পত্র হিসেবে আধার কার্ড থাকার পরও তাকে বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখায় ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বিরুদ্ধে।

বিজ্ঞাপন

শুধু হাফিজ উদ্দিন নন, গত কয়েক মাসে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধসহ বহু মানুষকে একইভাবে সীমান্তে এনে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা হয়েছে । বিজিবি ও স্থানীয়দের প্রতিরোধে অনেক ক্ষেত্রে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ ঠেকানো গেলেও তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে ভারতীয় বাহিনী।

সর্বশেষ গত ১১ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার কালিন্দী নদী সীমান্ত দিয়ে ১০ থেকে ১২ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। নীলডুমুর ব্যাটালিয়নের (১৭ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ খুরমী বিওপির দক্ষিণে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে ছোট বাঁশঝাড়িয়া মিনি ফরেস্ট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রবল বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার সুযোগে এ অপচেষ্টা করে ভারতীয়রা।

বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের ৭৭ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের চর সাহেবখালী ক্যাম্পের সদস্যরা দুটি বোটে করে ১০ থেকে ১২ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেন। টহলরত বিজিবি সদস্যরা বিষয়টি খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যেয়ে প্রবেশ ঠেকান। পরে বেলা ১১টার দিকে বিএসএফ সদস্যরা ওই ব্যক্তিদের নিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরে যায়।

নীলডুমুর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার আবু সহল আব্দুল্লাহ বলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, প্রচলিত আইন ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থী যেকোনো পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করা হচ্ছে। এর আগে গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে দিনাজপুরের বিরামপুর সীমান্তে ২০ থেকে ২৫ জনকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

১২০ ভারতীয় নাগরিকের তালিকা হস্তান্তর-

সীমান্তে পুশইনের ঘটনায় আধার কার্ড থাকা ১২০ ভারতীয় নাগরিকের তালিকা বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করেছে বিজিবি। তালিকায় তাদের নাম, বয়স, ঠিকানা এবং আধার কার্ডের তথ্য রয়েছে। ওই তালিকায় মরিগাঁও, নওগাঁও, গোলাঘাট, দারাং, ধুবড়ি, কামরূপসহ আসামের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের নাম রয়েছে। রয়েছেন ৮৩ বছর বয়সি হাফিজ উদ্দিন, ৭৪ বছর বয়সি আহসান আলী ও ৭৫ বছর বয়সি উফা আলীর মতো বয়োবৃদ্ধরাও। এছাড়া আছে জয়নাল আবেদিন (৫৫), খাইরুল ইসলাম (৫২), আব্দুল লতিফ (৫৫) ও নূর ইসলামের (৪৩) নাম। তালিকায় নারী ও শিশুদের নাম থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। আমার দেশ-এর কাছে থাকা নথিতে আধার নম্বর উল্লেখ থাকলেও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণে সেসব পূর্ণ নম্বর এখানে উল্লেখ করা হলো না।

মানবিক সংকটে নারী-শিশুরা

সীমান্তে পুশইনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, নারী ও শিশুরাও মানিবক সংকটে রয়েছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন ঘটনায় পুরুষের পাশাপাশি নারী ও শিশুদেরও সীমান্তের দিকে নিয়ে আসা হচ্ছে।

তালিকায় জাহানারা বেগম, আকলিমা বেগম, জরিনা বিবি, সাহেরা খাতুন ও আছিয়া খাতুনের মতো নারীর নাম রয়েছে। এছাড়া আসামের দারাং জেলার আট মাস বয়সি মরিয়ম বেগম এবং পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার চার বছর বয়সি ইয়ানুর আলী মণ্ডলের নামও পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতেও নারী ও শিশুদের সীমান্তের কাদা-পানি ও খোলা জায়গায় অবস্থান করতে দেখা গেছে। কয়েকজনকে হাতে আধার কার্ড নিয়ে নিজেদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতেও দেখা যায়। তাদের অভিযোগ, পরিচয়পত্র দেখানোর পরও তাদের বক্তব্য শোনার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

যেসব এলাকা থেকে আনা হচ্ছে

সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পুশইনের শিকার ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ আসামের মরিগাঁও, গোলাঘাট, নওগাঁও, দারাং, ধুবড়ি, কামরূপ, বিশ্বনাথ চারিআলি, শিবসাগর ও নলবাড়ী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা ও বর্ধমান জেলার বাসিন্দা।

তাদের মধ্যে দিনমজুর, কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষ রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের ধরে বা জড়ো করে গভীর রাতে সীমান্তের অরক্ষিত এলাকা কিংবা নদী ও চরাঞ্চলের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে শূন্যরেখা অতিক্রম করে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

কিছু ঘটনায় তাদের ভয়ভীতি দেখানো, মারধর ও অস্ত্রের মুখে সীমান্ত পার হওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। আবার কয়েকটি ঘটনায় বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধার কারণে তারা দুই দেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ আটকা পড়েছে। এতে সীমান্তে উত্তেজনা ও মানবিক সংকট—দুটিই তৈরি হচ্ছে।

একের পর এক পুশইন

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে পুশইন শুরু করে বিএসএফ। পরবর্তীতে চলতি বছরের মে মাসের শেষ থেকে আবারো এই প্রচেষ্টা শুরু করে ভারতীয় বাহিনী। সম্ভাব্য পুশইন ঠেকাতে সে সময় বিজিবি সীমান্তজুড়ে নজরদারি ও টহল বাড়ায়। সাতক্ষীরার বিপরীতে ভারতের হাকিমপুর এলাকাসহ বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে সে সময় মানুষ জড়ো করার খবরও আসে।

চলতি বছরের ৪ জুন বিজিবি জানায়, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১০টি পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এর মধ্যে ঝিনাইদহের মহেশপুরসহ দুই এলাকায় বিজিবি ও স্থানীয়রা দুইটি দলকে বাংলাদেশে প্রবেশ ঠেকায়। পরদিন নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও লালমনিরহাটের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে আরো কয়েকটি ঘটনার কথা জানায় বিজিবি।

এসব ঘটনায় নারী ও শিশুসহ মোট ৭৮ জনকে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা প্রতিহত করা হয়। পরে ৬ জুন পাঁচ জেলার বিভিন্ন সীমান্তে প্রায় ৮৬ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ; যা প্রতিহত করে বিজিবি। একই দিন পঞ্চগড় সীমান্তে ১০ জন এবং ঠাকুরগাঁওয়ে ১১ জনকে পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় দুই পক্ষের পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তেও ১১ জনকে নিয়ে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিজিবির প্রতিরোধে বিএসএফ পরে তাদের সীমান্ত এলাকা থেকে সরিয়ে নেয়। ২০ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্তে ২০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা প্রতিহত করা হয়। ২ জুলাই মৌলভীবাজারের জুড়ী সীমান্তে ১০ জনকে বাংলাদেশে ঢোকানোর অভিযোগ ওঠে। বিজিবি তাদের আটক করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত পাঠায়। ৪ জুলাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ১২ জনকে নিয়ে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয়।

বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, বিএসএফ সীমান্তের আলো বন্ধ করে তাদের বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি নেয়। বিজিবি ও স্থানীয় লোকজন সতর্ক অবস্থান নিলে বিএসএফ পরে তাদের ভারতের একটি হোল্ডিং সেন্টারে ফিরিয়ে নেয়। ৯ জুলাই সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ সীমান্তে সাতজনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা বিজিবি ঠেকিয়ে দেয়। পরে বিএসএফ তাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেয় এবং দুই বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২৪ জুলাই কুষ্টিয়া সীমান্তে আটজনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা প্রতিহত করা হয়। বিজিবির বাধায় তারা আবার ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরে যান। একই দিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে আরো সাতজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা প্রতিহত করা হয়। পরদিন ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তেও ছয়জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা ঠেকানোর কথা জানায় বিজিবি।

দিল্লির বৈঠকেও মেলেনি সমাধান

পুশইন ইস্যু গত ৮ থেকে ১১ জুন নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও বাংলাদেশ বিষয়টি উত্থাপন করে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, কোনো ব্যক্তিকে তার জাতীয়তা যাচাই ছাড়া একতরফাভাবে সীমান্ত পার করে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে কেউ বাংলাদেশি হলে প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে; কিন্তু পরিচয় যাচাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হলে তা সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি করে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ভারতের কাছে একাধিক কূটনৈতিক চিঠিও পাঠিয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জুনে জানানো হয়, পুশইনের অভিযোগ পাওয়া গেলেই ভারতকে নিয়মিতভাবে বিষয়টি জানানো হচ্ছে এবং বিদ্যমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণের দাবি জানানো হয়েছে। তবে দিল্লির বৈঠকের পরও এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হয়নি।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় ভারতের সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের ২৬টি জেলায় অতিরিক্ত নজরদারি ও বিজিবি টহল এখনো অব্যাহত রয়েছে। গত ২০ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিজিবি সদর দপ্তর পরিদর্শন করে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় সাধারণ জনগণও এখন লাঠিসোঁটা নিয়ে সীমান্তে পাহারা দিচ্ছে।

এদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই পুশইনের পেছনে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর গভীর পরিকল্পনা থাকতে পারে। তাদের উদ্দেশ্য—সীমান্তে ক্রমাগত অস্থিরতা ও চাপ তৈরি করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যস্ত রাখা এবং দেশের অভ্যন্তরে মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক লে. কর্নেল (অব.) দিদারুল আলম বলেন, নিজ দেশের আধার কার্ডধারী ও বৈধ নাগরিকদের এভাবে অন্য সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও সীমান্ত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। দিল্লি যেভাবে আন্তর্জাতিক নীতি অমান্য করছে, তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবিলম্বে কঠোর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...