একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক সাফল্যের উদাহরণ ছিল বাংলাদেশ। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর হামে কোনো মৃত্যুর রেকর্ডও ছিল না। অথচ সেই দেশেই মাত্র ছয় মাসে হামে মৃত্যু হয়েছে এক হাজারের বেশি শিশুর। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে শিশু। সন্তানকে বাঁচাতে কেউ ধার-দেনা করছেন, কেউ শেষ সম্বলটুকু খরচ করছেন। আবার সন্তান হারিয়ে শোকের সঙ্গে ঋণের বোঝাও বইতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার আওতার বাইরে ছিল। নিশ্চিত আক্রান্তদের ৮০ শতাংশ এবং মৃত শিশুদের ৯১.৪ শতাংশ কোনো এমআর টিকা নেয়নি। অর্থাৎ মৃত ১০ শিশুর প্রায় ৯ জনই ছিল টিকাহীন।
বয়সভিত্তিক তথ্যেও পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। ছয় মাসের কম বয়সি শিশুরা মোট আক্রান্তের ১০ শতাংশ হলেও মৃত্যুর হার ২০ শতাংশ। আর এক থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত—মোট আক্রান্তের ২৮ শতাংশ। এ বয়সে মৃত্যুর হার ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরাই হামের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—দুই ডোজ টিকাদান কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও হাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেল কেন?
সরকার হামের বর্তমান সংকটের জন্য আগের দুই সরকারের সময়কার ব্যর্থতাকে দায়ী করছে। গত এপ্রিল থেকে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হলেও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রত্যাশা ছিল, টিকাদানের পরপরই শিশুদের মধ্যে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হবে এবং সংক্রমণ কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। বিশেষজ্ঞরা টিকাদান কর্মসূচির ব্যবস্থাপনা, নজরদারি, জনবল ও প্রস্তুতির ঘাটতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের সমন্বয়হীনতাকেও দায়ী করছেন।
চিকিৎসকদের মতে, অপুষ্টি ও টিকার ঘাটতির সঙ্গে হামের জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া, অ্যাডেনো ভাইরাস, ব্রঙ্কোনিউমোনিয়া, সেপসিস, মেনিনজাইটিস ও এনসেফালাইটিস দেখা দিচ্ছে। এসব জটিলতায় আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি আরো বেড়ে যাচ্ছে।
হাজার ছাড়াল মৃত্যু
দেশে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রথম হামের রোগী শনাক্ত হয়। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১৫ মার্চ থেকে সরকারি তথ্য প্রকাশ শুরু করে। ১০ এপ্রিল থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করে অধিদপ্তরের এমআইএস শাখা।
এপ্রিল পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত ছিল ৪০ হাজার ৭০৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ২৭৬ জনের। ২২ জুলাই মৃত্যুর সংখ্যা ৮০০ ছাড়ায়। আগস্টে নতুন করে আক্রান্ত হয় ৩২ হাজার ৯৩৪ জন এবং মারা যায় ১৩৬ শিশু। ১৫ আগস্ট পাঁচ মাসের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়ে যায়।
সর্বশেষ চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম নয় দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ৯,১১৯ জন এবং মারা গেছে ২৮ শিশু। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ১,০০২ জন শিশু। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০০ জনের। বাকি ৯০২ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে।
এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪ শিশু। এর মধ্যে হামের উপসর্গ রয়েছে এক লাখ ৬৭ হাজার ৫৮০ জনের এবং নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৯০৪ শিশুর।
বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ও আক্রান্ত ঢাকায়। এ বিভাগে মারা গেছে ৪৬৭ শিশু, যার মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৪০৪ জনের। আক্রান্ত হয়েছে ৮৪ হাজার ২৩৩ জন; নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১২ হাজার ১৯৫ শিশুর।
টিকায় ঘাটতি
পরিস্থিতির অবনতি হলে সমালোচনার মুখে জরুরিভিত্তিতে উচ্চ ঝুঁকির ৩০ উপজেলায় ৫ এপ্রিল থেকে বয়স কমিয়ে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া শুরু করে সরকার। পরে ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে এবং ২০ এপ্রিল সারা দেশে জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয়। কর্মসূচিটি শেষ হয় ২০ মে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এক কোটি ৯৩ লাখ ৬৩ হাজার ৯১২ শিশু টিকা পেয়েছে। ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন।
তবে গত জুনে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচিতে ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের সংখ্যা পাওয়া যায় প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ। সে হিসাবে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের বাইরে থেকে গেছে প্রায় ৪৬ লাখ ৩৬ হাজার শিশু।
কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না হাম
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের বিরুদ্ধে কার্যকর ‘হার্ড ইমিউনিটি’ গড়ে তুলতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়। বর্তমান টিকাদানের হার সেই লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকায় সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এর সঙ্গে অপুষ্টি, চিকিৎসা ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা এবং নিউমোনিয়া ও অ্যাডেনো ভাইরাসের মতো সহ-সংক্রমণ মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ইপিআই উপপরিচালক ডা. সাব্বির হায়দার এ ব্যাপারে আমার দেশকে বলেন, ছয় মাসের কম বয়সি শিশুরা সাধারণত মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির মাধ্যমে সাময়িক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পায়। কিন্তু বর্তমানে টিকা দেওয়ার নির্ধারিত বয়সের আগেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে ধারণা করা যায়, অনেক শিশুর ক্ষেত্রে মাতৃ-অ্যান্টিবডি পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে পারছে না।
তিনি বলেন, করোনা মহামারির সময় তৈরি হওয়া ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’-এর প্রভাবও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। লকডাউনের সময় টিকাদান থেকে বাদ পড়া অনেক কিশোরী ও তরুণী এখন মা হচ্ছেন। তাদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত মাতৃ-অ্যান্টিবডি না পাওয়ায় নবজাতকেরাও হামের ঝুঁকিতে পড়ছে। সাধারণত মাতৃ-অ্যান্টিবডির সুরক্ষা তিন থেকে পাঁচ মাস থাকে। আট মাস বয়সে মাত্র ৭.১৪ শতাংশ শিশুর শরীরে এই অ্যান্টিবডি অবশিষ্ট থাকে। অথচ এতদিন প্রথম হাম টিকা দেওয়ার বয়স ছিল নয় মাস। ফলে শিশুর জীবনের একটি পর্যায়ে সুরক্ষার ঘাটতি তৈরি হচ্ছিল।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে। ঢাকার বাইরে থেকে আসা শিশুদের অনেকের ক্ষেত্রেই জটিলতা বেশি। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকেও সাড়া মিলছে না। ফলে অবস্থা আরো খারাপ হয়ে মারা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেক শিশু দুই ডোজ টিকা পায়নি এবং অপুষ্টিতে ভুগছে। তাদের গবেষণায় হামে আক্রান্ত ৬৫ শতাংশ শিশু মাঝারি থেকে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে বলে পাওয়া গেছে। সুতরাং বলা যায় নানা কারণেই এখনো শিশুরা মারা যাচ্ছে।
আক্রান্ত শিশুদের শরীরে অ্যাডেনো ভাইরাসের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ এবং ওষুধে সাড়া না দেওয়া কিছু শিশুর ক্ষেত্রে এ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তবে পরীক্ষা ব্যয়বহুল হওয়ায় বর্তমানে অ্যাডেনো ভাইরাসের পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।
আগাম প্রস্তুতির ঘাটতি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ আমার দেশকে বলেন, আগাম সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ ব্যবস্থাপনা না নেওয়া এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করাসহ সরকারের কিছু ভুলের কারণেই মৃত্যুর সংখ্যা এত বেশি হয়েছে। সময়মতো প্রস্তুতি নেওয়া গেলে প্রাণহানি অনেক কমানো সম্ভব ছিল।
তিনি বলেন, ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি ও অপুষ্টির কারণে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমেছে। তাই শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। এ জন্য নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে টিকাদান ও চিকিৎসা কার্যক্রম চালাতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


