মাঠপর্যায়ে কৃষকের প্রকৃত সারের চাহিদা আমলে নিচ্ছে না কৃষি মন্ত্রণালয়। ফলে পুরোনো ছকেই চলছে সারসংক্রান্ত সরকারের সব কার্যক্রম। আগে অঞ্চলভিত্তিক সারের যে বরাদ্দ ছিল, তাতে কোনো পরিবর্তন না এনে একই ধাঁচে চলছে এর বিলি-বণ্টন। ফলে চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে সংকটে পড়ছেন কৃষক। এতে বাধ্য হয়ে সার লুট করছেন তারা। ফসলের আবাদ ও চাহিদা অনুযায়ী জরিপ করে বরাদ্দ না বাড়ালে এ সংকট কাটবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে সারের চাহিদা অনেক বেড়েছে। কারণ, এখন একই জমিতে কয়েকবার ফসল হচ্ছে। তাছাড়া দেশে মাছ চাষও বেড়েছে। এজন্য প্রচুর সারের প্রয়োজন। তবে সরকারের দাবি, আবাদি জমি না বাড়ায় সারের চাহিদা আগের মতোই রয়েছে। এ নিয়ে কোনো কার্যকর গবেষণা না হওয়ায় প্রকৃত বাস্তবতা উঠে আসছে না। ফলে সার নিয়ে এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কৃষি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে ‘সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চক্রান্ত’ হিসেবে দেখছে। একই কথা বলেছেন জামালপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ফরিদুল কবীর তালুকদারও। অন্যদিকে এ সুযোগে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফায়দা লুটছে এক শ্রেণির সুবিধাবাদী চক্র।
কৃষি আবাদের ক্ষেত্র বাড়লেও সারের বরাদ্দ বাড়েনি—এ অভিযোগ শুধু কৃষকের একার নয়; এর সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট ডিলার, খুচরা বিক্রেতা ও সারসংক্রান্ত সংগঠনগুলোর বক্তব্যেও একই তথ্য উঠে এসেছে। তবে এ দাবি মানতে রাজি নয় সরকার ও কৃষি মন্ত্রণালয়। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) যুক্তি, এখন পর্যন্ত দেশের মানচিত্রে নতুন কোনো ভূখণ্ড বা দ্বীপাঞ্চল যুক্ত হয়নি। তাই জমি ও আবাদের পরিমাণ আগের মতোই রয়েছে।
কৃষি ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে আউশ, আমন ও বোরো মৌসুমে গড়ে আনুমানিক ১১০ থেকে ১১৫ লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়। এর মধ্যে আমন চাষ হয় প্রায় ৫৭ থেকে ৫৮ লাখ হেক্টর জমিতে, বোরো প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর এবং আউশ ধান হয় ১০ থেকে ১৩ লাখ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ বোরো ও আমন প্রধান দুটি ধান হলেও আউশের আবাদ তুলনামূলক কম জমিতে হয়। এর বাইরে শবজিসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ বাড়ায় সারের চাহিদা বেড়েছে, যা গণনায় আনছে না কৃষি মন্ত্রণালয়। সার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানিয়েছেন, বর্তমান কৃষি সচিব বিষয়টি অনুভব করলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহের কারণে তিনিও খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলাভিত্তিক বিভিন্ন রাসায়নিক সারের বরাদ্দ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সার সংকটের মধ্যেও কিছু জেলায় সামান্য বাড়লেও বেশিরভাগ জেলায় বরাদ্দ আগের মতোই রাখা হয়েছে। আবার কোনো কোনো জেলায় গত বছরের তুলনায় বরাদ্দ কমানোও হয়েছে। যেমন রাজশাহী জেলায় গত বছর ইউরিয়ার বরাদ্দ ছিল ৭১ হাজার টন, এবারও একই রাখা হয়েছে। টিএসপি ও এমওপির বরাদ্দও অপরিবর্তিত। একই চিত্র সাতক্ষীরা, কিশোরগঞ্জ, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে। অন্যদিকে গাজীপুর জেলায় ইউরিয়ার বরাদ্দ কমানো হয়েছে। আগে যেখানে বরাদ্দ ছিল ২১ হাজার টন, চলতি অর্থবছরে তা প্রায় ২,০০০ টন কমিয়ে ১৮ হাজার ২০৩ টন করা হয়েছে। কৃষকের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে বরাদ্দের সমন্বয় না হওয়ায় মাঠপর্যায়ে হাহাকার চলছে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) সভাপতি মোশাররফ হোসেন আমার দেশকে বলেন, মাঠপর্যায়ে সারের চাহিদা যে বেড়েছে, তা নীতিনির্ধারকরা মানতেই চান না। দেশে শুধু ধান নয়, অন্যান্য ফসল ও শাকসবজির আবাদও বেড়েছে। সেটাও তারা বিবেচনায় নিচ্ছেন না। মান্ধাতার আমলের বরাদ্দ দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ফসলের আবাদ ও চাহিদা অনুযায়ী জরিপ করে বরাদ্দ না বাড়ালে এ সংকট কাটবে না।
বিভিন্ন জেলার বিএফএ সভাপতিদের বক্তব্যেও একই সুর পাওয়া গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএফএ সভাপতি জানান, তার জেলায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে। এখানে ‘কাটিমন’ জাতের আম চাষ হওয়ায় বছরে তিনবার সার দিতে হয়। ফলে অতিরিক্ত সারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বরাদ্দ আগের মতোই রয়েছে। জয়পুরহাট জেলা বিএফএ সভাপতি জানান, আলু উৎপাদনের পাশাপাশি হ্যাচারি, পোলট্রি ও ফিশারিতে সারের ব্যবহার বৃদ্ধিতে অতিরিক্ত বরাদ্দ জরুরি হয়ে পড়েছে।
এদিকে, সার বিক্রি স্বাভাবিক রাখতে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিলার পয়েন্টগুলোয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সরকারি মূল্যে সার বিক্রি করা হচ্ছে। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সুঘাট, শাহবন্দেগী, গাড়ীদহ ও বিশালপুর ইউনিয়নের গুদামগুলোয় পর্যাপ্ত সার রয়েছে বলে মাঠ অফিসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোয় ইউরিয়া ২,৮৩০ টন, টিএসপি ৯৫৮ টন, এমওপি ১,৯৮১ টন ও ডিএপি ১,৮১০ টন মজুত ছিল।
এছাড়া বিভিন্ন স্থানে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযানেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মূল্যতালিকা না টাঙানো ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির দায়ে ১৩ ডিলার/খুচরা বিক্রেতাকে ৯৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তা সত্ত্বেও সার সংকট ও ক্ষোভ থামানো যাচ্ছে না।
গত ৭ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় বাজারে মধ্যরাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পেয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকরা ডিলারের গুদামের টিনের বেড়া ভেঙে ১০০ থেকে ১৫০ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যান। এর আগে ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নে ডিলারের গুদাম ভেঙে ২০২ বস্তা সার নেওয়ার ঘটনা ঘটে। সারের দাবিতে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী, লালমনিরহাট ও রাজশাহীতে মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রশাসন সরাসরি ‘লুটপাট’ অস্বীকার করে দাবি করেছে, অতিরিক্ত ভিড় ও গুজবের কারণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় কিছু সার খোয়া গেছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া চার লাখ এক টন, টিএসপি তিন লাখ ৩৯৬ টন, ডিএপি তিন লাখ ৯৭ টন এবং এমওপি এক লাখ ৮৫৭ টন মজুত রয়েছে। তবে গত বছরের একই সময়ে এমওপির মজুত ছিল দুই লাখ ৮২৬ টন, যা এবার প্রায় অর্ধেক।
এছাড়া আগামী অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশে ইউরিয়া ১৪.৯৬ লাখ টন, টিএসপি ৪.৬৮ লাখ টন, ডিএপি ১০.২৩ লাখ টন এবং এমওপি ছয় লাখ টনসহ মোট ৩৫.৮৭ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে এই সময়ে ৩৬.৭৬ লাখ টন সার আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম খান আমার দেশকে বলেন, দেশে সারের সংকট নেই। পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তৈরি করে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। এর বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে শাস্তি ও জরিমানা আদায় করা হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



