প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে আমার দেশ-এ প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জবাবে প্রতিবেদন দাখিল করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। তবে সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স প্রদানে রাজনৈতিক নির্দেশনা ও আওয়ামী সিন্ডিকেটের মালিকানার মূল অভিযোগ এড়িয়ে গেছে সংস্থাটি।
পাঁচ সপ্তাহ পর পাঠানো ওই প্রতিবেদনে লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ার বৈধতা ও কনসোর্টিয়াম গঠনের পক্ষে দীর্ঘ সাফাই গাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বলা হয়েছে, নির্ধারিত চার বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সেবা চালু করতে না পারায় নতুন করে সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চেয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর আমার দেশ-এর প্রথম পৃষ্ঠায় ‘সামিটের নেতৃত্বে সাবমেরিন ক্যাবলের অবৈধ কনসোর্টিয়াম’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাতে পৃথক পৃথক লাইসেন্স নিয়ে অবৈধভাবে যৌথ কনসোর্টিয়াম গঠনসহ বিভিন্ন বিষয় উত্থাপন করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতাদের মালিকানাধীন কোম্পানি সামিট, সিডিনেট ও মেটাকোর এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এসব প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ ছিল।
বিটিআরসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের লাইসেন্সিং গাইডলাইন এবং পরবর্তী সময়ে ২০২১ ও ২০২২ সালে বিভিন্ন সংশোধনী ও উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল। সর্বাধিকসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ ও সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে আবেদনের সময়সীমা দুই দফা বাড়িয়ে ১০ মে ২০২২ পর্যন্ত করা হয়।
মূল্যায়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ছয়টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে ২০২২ সালের ২৪ জুলাই মূল্যায়ন প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। মূল্যায়নে শীর্ষস্থান অর্জনকারী তিন প্রতিষ্ঠান হলো, সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড (৯২.৪৬ নম্বর), সিডিনেট কমিউনিকেশনস লিমিটেড (৮৭.৬৪ নম্বর), মেটাকোর সাবকম লিমিটেড (৮৬.৪৮ নম্বর)।
পরবর্তী সময়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের পূর্বানুমোদনক্রমে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই তিন প্রতিষ্ঠানকে পৃথক তিনটি লাইসেন্স দেওয়া হয়। বিটিআরসি দাবি করেছে, সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় এবং কারিগরি, আর্থিক ও আইনগত যোগ্যতা বিবেচনা করেই লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল।
কনসোর্টিয়াম গঠন ও আইনি ব্যাখ্যার বিতর্ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে এক সভায় তিন লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুর থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত ট্রাঙ্ক ক্যাবলের জন্য ‘ক্যাম্পানা গ্রুপ’ এবং ব্রাঞ্চ ক্যাবলের জন্য যৌথ কনসোর্টিয়াম গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, একক কনসোর্টিয়াম ব্যবস্থার পরিবর্তে তিনটি স্বতন্ত্র ক্যাবল স্থাপন করতে গেলে তিন গুণের বেশি ব্যয় হতো। এই উচ্চ ব্যয় এড়াতে তারা যৌথভাবে প্রায় ১,১০০ কিলোমিটার আন্ডারওয়াটার ক্যাবল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়।
গাইডলাইনের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ট্রাঙ্ক বা সংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে কমিশনে তথ্য দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকলেও পূর্বানুমোদন নেওয়ার কোনো আইনি বাধা বা বাধ্যবাধকতা নেই বলে প্রতিবেদনে যুক্তি দেখানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে গাইডলাইনের নির্ধারিত ক্যাপাসিটির তুলনায় বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় প্রতিটি ফাইবার পেয়ারে উচ্চতর ক্যাপাসিটি (১৫.২ টিবিপিএস) অর্জিত হবে বলে দাবি করা হয়েছে। বর্তমান চাহিদা সিঙ্গাপুরমুখী হওয়ায় কেবল পূর্বমুখী রুটে ক্যাবল বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্ধারিত সময়ে সেবা চালুতে ব্যর্থতা
গাইডলাইনের ২.৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, লাইসেন্স পাওয়ার পর ৪৮ মাসের মধ্যে ক্যাবল সিস্টেম ও সেবা চালু করার বাধ্যবাধকতা ছিল। সেই হিসাবে সিডিনেট ও সামিটের সময়সীমা ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর এবং মেটাকোর সাবকমের সময়সীমা ১৪ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে।
অথচ বিটিআরসির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো কোনো অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তরের (এনএসআই) ছাড়পত্র না পাওয়া এবং সমুদ্রে ক্যাবল স্থাপনের অনুকূল মৌসুম না থাকায় নির্ধারিত রোল-আউট সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত কমিশনের ৩১০তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য গত ২৭ সেপ্টেম্বর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি
প্রতিবেদনে প্রক্রিয়াগত বৈধতা ও নিয়মনীতির দীর্ঘ বর্ণনা থাকলেও আমার দেশ-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উত্থাপিত মূল প্রশ্নগুলো অমীমাংসিতই থেকে গেছে।
২০২০ সালের অক্টোবরে তৎকালীন মন্ত্রীর সভাপতিত্বে এবং রাজনৈতিক উপদেষ্টার উপস্থিতিতে বেসরকারি খাতে সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে সরাসরি রাজনৈতিক নির্দেশনার অভিযোগের কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব বিটিআরসির প্রতিবেদনে নেই। লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পেছনের আওয়ামী সিন্ডিকেটের রাজনৈতিক প্রভাব ও যোগসাজশ সম্পর্কিত অভিযোগগুলো প্রতিবেদনে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে উঠে আসে পলাতক সাবেক তথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত এবং চৌধুরী নাফিজ শরাফতের মালিকানাধীন অভিজ্ঞতাহীন কোম্পানি সিডিনেট প্রতিষ্ঠাই করা হয় লাইসেন্সের জন্য বিজ্ঞপ্তি আহ্বানের পর অথচ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে লাইসেন্স পায় কিন্তু বাদ পড়ে ফাইবার এট হোমের মতো অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে কোনো জবাব দেয়নি বিটিআরসি।
এছাড়া কনসোর্টিয়াম গঠন নিয়ে প্রদান করা হয়েছে ভুল ব্যাখ্যা। লাইসেন্সিং গাইডলাইনে কনসোর্টিয়ামকে সুস্পষ্টভাবে আবেদনের একটি ধরন হিসেবে উল্লেখ করা আছে এবং আবেদনকালেই কনসোর্টিয়াম হিসেবে আবেদন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
লাইসেন্সিং গাইডলাইনে প্রতিটি লাইসেন্সধারীর ন্যূনতম দুই ফাইবার পেয়ার থাকার যে বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে, কোনোভাবেই ক্যাপাসিটির সঙ্গে সমতুল্য নয়, এ ধরনের তুলনা করতে প্রয়োজন হবে লাইসেন্সিং গাইডলাইনের সংশোধন। তাছাড়া, পূর্ব ও পশ্চিম উভয় দিকে সংযোগ অত্যাবশ্যকীয় শর্ত হিসেবে গাইডলাইনে উল্লেখ করা থাকলেও ভবিষ্যতে তা বিস্তার করা হবে বলে বর্তমান অনিয়মের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
তাছাড়া, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত না করেই রোল-আউটের সময়সীমা বৃদ্ধির জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি চাওয়াকে খাত সংশ্লিষ্টরা বিটিআরসির দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবেই দেখছেন। এখন দেখার বিষয়, আওয়ামী সিন্ডিকেটের প্রভাব, বিতর্কিত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক নির্দেশনায় লাইসেন্স প্রদান এবং লাইসেন্সিং গাইডলাইনের অত্যাবশ্যকীয় শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি ছাড়াই সরকার প্রকল্পের সময়সীমা বাড়িয়ে দেবে?
রাজনৈতিক নির্দেশনার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন প্রতিবেদনে কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি, আর নির্দেশনার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যৌথ আবেদনের বদলে পরবর্তী সময়ে একক কনসোর্টিয়াম গঠনের আইনগত ভিত্তি কী—এ বিষয়ে জানতে বিটিআরসির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এমদাদ উল বারীকে ফোন ও বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


