নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ স্থাপনের ক্ষমতা গত সংসদ নির্বাচনে কেড়ে নেওয়া হয়। পুরনো সেই ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। এতেই স্বস্তি ফিরেছে সাংবিধানিক সংস্থায়। এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই, - এটা চূড়ান্ত করতে চায় কমিশন। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান ব্যবস্থায় সংশোধনী আনার জন্য বর্তমানে নীতিমালা পর্যালোচনা চলছে। খবর ইসির নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
সূত্র বলছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পদত্যাগ করা কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধিন কমিশন ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ স্থাপনে ইসির একক ক্ষমতা সংকোচিত করেন। ভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ কাজে যুক্ত করেছিল প্রশাসন, পুলিশ ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের।
এক্ষেত্রে অনিয়মের সাক্ষী গোপাল হিসেবে সদস্য সচিব ছিলেন ইসির কর্মকর্তারা। যাতে তাদের অনিয়মগুলোর বৈধতা পায়; এমন অভিযোগ কর্মকর্তা-কর্মচারিদের। এ নিয়ে সে সময়ের নেতিবাচক সমালোচনা গায়ে মাখেনি দোর্দন্ড প্রতাপশালী কমিশন। ফ্যাসিষ্ট হাসিনা সরকারকে অনিয়মের মাধ্যমে ফের ক্ষমতায় বসাতে কেন্দ্র ও কক্ষকে দাবার নতুন ঘূটি ও এটাকে কূট-কৌশলের অংশ হিসেবে বেছে নেয়া হয়।
এসব অনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য এই কমিশনের সাবেক সচিব কারান্তরীন মো জাহাংগীর আলম ছিলেন সিদ্ধহস্ত। কমিশন ছিলো সহযোগী। এর আগে এগারোটি সংসদ নির্বাচন হলেও কোনো কমিশনই একাজে ইসির কর্মকর্তাদের বিকল্প ভাবেনি। এসব করে ২০২৪ সালের ড্যামী নির্বাচন উপহার দেয় হাবিবুল কমিশন। কমিশন সচিব জাহাংগীর আলম ছিলেন অনিয়মের বরপুত্র।
এর আগে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদে দিনের ভোট রাতে সম্পন্ন করে ইসির মূখে কলঙ্ক লেপনের ব্যবস্থা করেছিল কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধিন কমিশন। । এ কমিশনের সচিব হেলালুদ্দীন নির্বাচনে অনিয়মের বীজ রোপন করেছিলেন।
আর ২০১৪ সালে কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন একতরফা নির্বাচনে ১৫১জনকে বিনাভোটে বিজয়ী করে অনন্য নজির তৈরি করে। ওই কমিশনের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক সব অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেন। হাসিনাকে খুশি করার মাধ্যমে একের পর এক পদ বাগিয়ে এমপি হয়ে থামেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কেন্দ্র ও কক্ষ স্থাপন থেকে কমিশনের কর্মকর্তাদেও কাঁটছাঁট নিয়ে জুতসই যুক্তি-ও সাঁড়া করিয়েছিল বিগত কমিশন। বলা হয়েছিল, যেসব স্থাপনা ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল, এর অনেকগুলো পুরোনো বা নষ্ট হয়ে গেছে। আশপাশে নতুন স্থাপনা হয়েছে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিল। প্রণয়ন করেছিল নুতন নীতিমালাও। ভোটকেন্দ্র নির্ধারণে গঠিত কমিটিতে প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষমতা রাখা হয় জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), পুলিশ সুপার, শিক্ষা কর্মকর্তা, থানার অফিসার ইনচার্জ ও মহানগরের ক্ষেত্রে পুলিশ কমিশনারের প্রতিনিধি। এই কমিটির খসড়া ভোটকেন্দ্রের তালিকা চূড়ান্ত করার দায়িত্ব বর্তানো হয়েছিল রিটার্নিং অফিসারের উপের। এসব কমিটির সদস্যসচিব করা হয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের।
শিক্ষা কর্মকর্তা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের যুক্ত করার বিষয়ে নতুন নীতিমালায় বলা হয়, শিক্ষা কর্মকর্তারা আওতাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত অবস্থা, কক্ষের সংখ্যা, যাতায়াতব্যবস্থা সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত থাকেন। অন্যদিকে পুলিশ কর্মকর্তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য স্থাপনার যাতায়াতব্যবস্থা ও সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত থাকেন।
সূত্র আরও জানায়, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে গত বছরের অক্টোবরে দেশের সব জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) সঙ্গে মতবিনিময় করেছিল কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশন। ওই সভায় পুলিশের পক্ষ থেকে ভোটকেন্দ্রের স্থান নির্ধারণের কাজে তাদের যুক্ত করার প্রস্তাব আসে। ভোটকেন্দ্র কমানোর বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের ওই বৈঠকে বলেছিল, ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা কমালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা তুলনামূলক সহজ হবে। ভোটকেন্দ্রে আগের চেয়ে বেশিসংখ্যক জনবল মোতায়েন করা যাবে। এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো আলমগীর বলেছিলেন, পুলিশ কোথায় সহজে যেতে পারবে সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। অন্য দিকে শিক্ষা কর্মকর্তারা জানেন কোন প্রতিষ্ঠান কী অবস্থায় আছে, তাই তাদেরও রাখা হয়েছে।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র ছিলো ৪০ হাজার ১৮৩টি ও ভোটকক্ষ ২ লাখ ৭ হাজার ৩১২টি, ২০২৪ সালে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ৪২,১৮০টি ও কক্ষ ছিল ২, ৬৩, ২৩৯ হাজার এবং আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র ৪৮ হাজার এবং ভোটকক্ষ ২ লাখ ৯৫ হাজারটি।
কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, তফসিল ঘোষনার পর মূলত ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ স্থাপন চূড়ান্ত করা হয়। এর আগে ইসির আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র ও কক্ষের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। সবাইর আগে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। ভোটারদের ভোটদান প্রক্রিয়া সহজীকরণের উদ্দেশ্যে ভোটার সংখ্যানুপাতে আসনওয়ারী কেন্দ্র ও কক্ষ স্থাপন করা হয়।
আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ স্থাপনে বিতর্কিত নীতিমালা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে ইসির কর্মকর্তাদের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা নীতিমালা বাতিল হলে ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ স্থাপনে স্বচ্ছতা ফিরে আসবে এমনটাই জানিয়েছেন ইসির কর্মকর্তারা। বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ আমরা করে এসেছি। গত কমিশন একটি রাজনৈতিক দলের লোকজনের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এই কাজ করেছিল। তৎকালিন সরকার যেভাবেই চাইছেন আজ্ঞাবহ কমিশন তাই করতেন। অথচ অতীতে তারা কমিশনের সুনাম ও ভোটার স্বার্থ সুমন্নত রাখার জন্য নিরপেক্ষ ও ভোটগ্রহণের উপযোগী স্থাপনায় ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ তারা স্থাপন করতেন। বর্তমান কমিশনের উচিত আগের চাপিয়ে দেয়া কালো নীতিমালা বাতিল করা।
জানতে চাইলে ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ আমার দেশকে বলেন, ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ স্থাপনের কাজ ইসির। অথচ গত নির্বাচনের আগে ইসির কর্মকর্তাদেও সাক্ষী গোপাল রেখে পুলিশ, প্রশাসন ও শিক্ষা কর্মকর্তাদেও যুক্ত করা হয়। এটা পুরনো নীতিমালার লঙ্ঘন। আমরা নীতিমালা পর্যালোচন করছি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

