মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীদের বিমান টিকিটে মানা হচ্ছে না বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা। টিকিটে থাকছে না ট্রাভেল এজেন্সির নাম, লাইসেন্স নম্বর কিংবা প্রকৃত মূল্য। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক টিকিট মনিটরিং ব্যবস্থাও প্রায় বন্ধ রয়েছে। এ সুযোগে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে টিকিট সিন্ডিকেট।
২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রে যাত্রীর নাম ও পাসপোর্ট নম্বর ছাড়া বুকিং না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্য রুটে গ্রুপ বুকিংয়ের ক্ষেত্রেও ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রীর নামসহ বুকিং নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়। তবে বর্তমানে এসব নির্দেশনার কোনোটিই মানা হচ্ছে না। নামবিহীন গ্রুপ বুকিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় আসন আটকে রাখার প্রবণতাও রয়েছে।
টিকিটে ট্রাভেল এজেন্সির নাম ও মূল মূল্য উল্লেখ করাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্টরা পরে হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নেন। এরপর বিষয়টি তদারকিতে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
এদিকে গ্রাহকসেবা, ন্যায্যমূল্য, আকাশপথে সুশাসন এবং সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসী কর্মীদের হয়রানি বন্ধে ‘ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার টিকিট সিন্ডিকেট বন্ধে ৪,০০০ ট্রাভেল এজেন্সির মধ্যে অনিয়মে জড়িত ৩০টি সংস্থাকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিস দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে এই মনিটরিং ব্যবস্থা একেবারেই সক্রিয় নেই।
নিষ্ক্রিয় টাস্কফোর্স
আকাশপথে যাত্রীস্বার্থ রক্ষায় মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। টিকিটের কারসাজি ঠেকাতে ওই টাস্কফোর্স বেশ কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বর্তমানে এই টাস্কফোর্সের কোনো কার্যকর কার্যক্রম দৃশ্যমান নেই এবং পূর্বে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন বা মনিটরিং পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে ছিল—জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) ও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের কার্যালয়ে সার্ভেইলেন্স কমিটির পরিদর্শন; কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে ছোট উড়োজাহাজ পরিচালনা করা হচ্ছে কি না, তা তদন্ত; নাম ও পাসপোর্ট ছাড়া ৭২ ঘণ্টার বেশি টিকিট ধরে রাখার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা; বিমানবন্দরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পেলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া; বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, পররাষ্ট্র, ধর্ম, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ডিজিএফআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে যুক্ত করা টাস্কফোর্সকে শক্তিশালী করা; জিএসএগুলোর তদারকি জোরদার করা; প্রতারক এজেন্সির বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কর্তৃক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি। কিন্তু বর্তমানে এই সিদ্ধান্তগুলোর একটিও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
জানা গেছে, প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি চাকরি ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিক ও কর্মী হিসেবে গমন করে। এ ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বিদেশগামী কর্মীদের কাছে প্যাকেজ বিক্রি করে, যেখানে রিক্রুটিং এজেন্সি কমিশন ও বিমানভাড়া আলাদাভাবে উল্লেখ করা থাকে না বিধায় ইচ্ছামতো মূল্য নির্ধারণ করা হয়, যা ন্যায্যমূল্য থেকে অনেক বেশি। ফলে বিমানভাড়া কমলেও এর সুফল যাত্রীরা পায় না।
নামবিহীন টিকিটে কৃত্রিম সংকট
মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির পর্যালোচনায় অতিরিক্ত চাহিদার রুটে গ্রুপ বুকিংয়ের নামে অগ্রিম অর্থ দিয়ে টিকিট অনির্দিষ্টকালের জন্য ব্লক করে রাখার তথ্য জানা গেছে। পরে এসব টিকিট হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বিজ্ঞাপন দিয়ে অননুমোদিত এজেন্টদের মাধ্যমে চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সি ও জিএসএর সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠে এসেছিল। অভিযোগের ভিত্তিতে আত-তাইয়্যারা ট্রাভেলস ইন্টারন্যাশনাল, এনএমএসএস ইন্টারন্যাশনাল, আরবিসি ইন্টারন্যাশনাল, কিং এয়ার, সিটিকম, কাজী এয়ার ও আল গাজী এয়ারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বর্তমানে তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং বিভিন্নভাবে টিকিট ব্লক করার কাজে লিপ্ত রয়েছে।
হাতবদলে বাড়ে ভাড়া
সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, গত আট মাসে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ কাজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গেছেন। এদের বড় অংশই রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যান। অভিযোগ রয়েছে, টিকিট ছোট এজেন্সি থেকে মাঝারি এবং পরে বড় এজেন্সির কাছে হাতবদল হয়। প্রতিটি ধাপেই যুক্ত হয় অতিরিক্ত মূল্য।
রিক্রুটিং এজেন্সির প্যাকেজের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সেখানে বিমানভাড়া ও এজেন্সির কমিশন আলাদাভাবে উল্লেখ না থাকায় মোট প্যাকেজের মূল্য ইচ্ছামতো নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়। বিমানভাড়া কমলেও তার সুফল শ্রমিকরা সব সময় পান না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, নামবিহীন গ্রুপ টিকিট ব্লক বন্ধ করা গেলে আসন সংকট কমবে। একই সঙ্গে টিকিটের দামও নিয়ন্ত্রণে আসবে।
চাহিদা-জোগানেও ভাড়া ওঠানামা
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিমান টিকিটের মূল্য শুধু সিন্ডিকেটের কারণে নির্ধারিত হয় না। চাহিদা, মৌসুম, আসন প্রাপ্যতা ও সময়ের ওপরও ভাড়া নির্ভর করে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ওমরাহর টিকিটের দাম ছিল প্রায় ৫৫০ থেকে ৭৩৫ ডলার। শ্রমিকদের টিকিট ছিল ৩৭০ থেকে ৫৪০ ডলার। ২০২৫ সালে ওমরাহর টিকিটের গড় মূল্য ছিল প্রায় ৪৭০ ডলার। রমজানে তা বেড়ে ৬০০ থেকে ৯০০ ডলারে ওঠে। শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ভাড়া ছিল ৪০০ থেকে ৬০০ ডলার। ২০২৬ সালে ওমরাহর টিকিটের দাম ৫১০ থেকে ৮০০ ডলারের মধ্যে ছিল। বর্তমানে সৌদি আরবে চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ায় শ্রমিক যাতায়াতও কিছুটা কমেছে। ফলে শ্রমিকদের টিকিটের ভাড়া ২৫০ থেকে ৫৩০ ডলারের মধ্যে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কিছুটা কম হলেও সুযোগ পেলেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আটাব ও প্রতিযোগিতা কমিশনের পর্যবেক্ষণ
২০২৫ সালে তৎকালীন আটাব সভাপতি আব্দুস সালাম আরেফ জানিয়েছিলেন, নামবিহীন গ্রুপ টিকিট বুকিং টিকিটের কৃত্রিম সংকট তৈরির অন্যতম কারণ। তার অভিযোগ ছিল, মধ্যপ্রাচ্যগামী কোনো কোনো এয়ারলাইন্স পাসপোর্ট, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট বা যাত্রী তালিকা ছাড়াই নির্দিষ্ট এজেন্সির নামে আগাম গ্রুপ সিট ব্লক করে রাখে। পরে এসব টিকিট উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হয়। এতে কখনো কখনো টিকিটের দাম ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণ বা তিনগুণ হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। গ্রুপ টিকিট বুকিং বন্ধ করা হলে টিকিট সংকট যেমন দূর হবে, তেমনি কমবে টিকিটের দাম।
২০২৫ সালের ৪ মে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের এক সভাতেও বলা হয়, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বিমান ভাড়া ও কমিশন আলাদা করে না দেখিয়ে এককালীন প্যাকেজ বিক্রির কারণে বিদেশগামী কর্মীরা বিমানভাড়া কমার সুফল পাচ্ছেন না, সম্পূর্ণ মুনাফা এজেন্সির পকেটে যায়।
সরকারি তদন্তে ১১টি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স, তাদের জিএসএ এবং ৩০টি ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে নাম ছাড়া টিকিট ব্লক করে শতকোটি টাকা অবৈধভাবে আয়ের প্রমাণ মিলেছিল। ফলে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা থেকে জেদ্দা, রিয়াদ, মদিনা ও দাম্মাম রুটে টিকিটের দাম সর্বোচ্চ ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
সরকারের আশ্বাস ও বাস্তব চিত্র
বর্তমান সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ‘জিরো টলারেন্স’নীতি এবং নানা আইনি পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিলেও মাঠপর্যায়ে মনিটরিং না থাকা এবং গঠিত টাস্কফোর্সের চরম নিষ্ক্রিয়তার কারণে বাস্তবে যাত্রী ও প্রবাসীরা এখনো সিন্ডিকেটের জিম্মি হয়েই দিন কাটাচ্ছেন।
টিকিট সিন্ডিকেট বন্ধে সরকারের পদক্ষেপের বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রীতা আমার দেশকে জানান, অভ্যন্তরীণ রুটসহ বিমান টিকিটের মূল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা ডাইনামিক প্রাইসিং পদ্ধতির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। এ ব্যবস্থায় চাহিদা, সময়, মৌসুম, আসন প্রাপ্যতা ও বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ভাড়া ওঠানামা করে। যাত্রীস্বার্থ রক্ষা এবং টিকিটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল আইন, ২০১৭ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। তা ছাড়া ১০ দফা সংবলিত পরিপত্র জারি করা হয়েছে। পরিপত্রের নির্দেশনা অনুসারে টিকিটের গায়ে মূল্য, এজেন্সির নাম ও লাইসেন্স নম্বর উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার যেকোনো ধরনের টিকিট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করেছে। কোনো এজেন্সি অস্বাভাবিক মূল্য আদায় বা সিন্ডিকেটে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে নিবন্ধন বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টিকিটের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে মন্ত্রণালয় ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) নিয়মিতভাবে ট্রাভেল এজেন্সি ও এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করছে বলেও জানান তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


