দ্বীপজেলা ভোলার মাটির নিচে পড়ে আছে প্রায় সোয়া লাখ কোটি ঘনফুট গ্যাস । অথচ গ্যাসের অভাবে সারা দেশে চুলা জ্বলছে না, শিল্পের চাকা ঘুরছে না, ধুঁকে ধুঁকে চলছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। জেলার ৯টি গ্যাসকূপ থেকে দিনে ১৮.৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলনের সক্ষমতা থাকলেও তোলা হচ্ছে সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ কোটি ঘনফুট। কারণ, বাড়তি গ্যাস ব্যবহার করার মতো চাহিদা সেখানে নেই। আর জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার মতো সঞ্চালন লাইনও নেই। ফলে ভোলার গ্যাস সহসা ট্রান্সমিশন লাইনে আনা যাচ্ছে না বলেই জানা গেছে।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে সঞ্চালন লাইন স্থাপনের উদ্যোগ না নিয়ে লুটপাটের উদ্দেশ্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতকে আমদানিনির্ভর করায় দেশ বর্তমানে চরম সংকটকাল অতিক্রম করছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক ও যৌথ সমীক্ষায় ভোলায় গ্যাসের সম্ভাব্য রিজার্ভ ৫ লাখ কোটি ঘনফুটের বেশি দাবি করা হয়। তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের তথ্যানুযায়ী, জেলাটিতে প্রমাণিত গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত ২ লাখ কোটি ঘনফুটের মতো। মোট মজুতের মধ্য থেকে কারিগরি ও বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য প্রকৃত গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ২০০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে গত কয়েক বছরে ১৭ হাজার কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে এবং বর্তমানে ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি ঘনফুট গ্যাস মাটির নিচে উত্তোলনের অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে যোগ করার মতো সঞ্চালন লাইন না থাকায় এ গ্যাস উত্তোলন করা যাচ্ছে না।
পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে উত্তোলনের জন্য উপযুক্ত হওয়া ভোলা নর্থ গ্যাসকূপে রয়েছে ৪৩ হাজার ৫০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এখান থেকে প্রতিদিন ৪ থেকে ৪.৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো গ্যাস এখান থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে না। একই অবস্থা ভোলা-ইলিশা গ্যাসকূপেরও। ২০২৩ সালে উত্তোলনের জন্য প্রস্তুত হওয়া এ কূপে মজুত রয়েছে ২০ হাজার কোটি ঘনফুট গ্যাস। প্রতিদিন ২ থেকে ২.২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস এই কূপ থেকে উত্তোলন সম্ভব হলেও এক ঘনফুটও তোলা হচ্ছে না। অন্যদিকে, ৬৪-৬৫ হাজার কোটি ঘনফুট উত্তোলনযোগ্য গ্যাস এখনো অবশিষ্ট আছে শাহবাজপুর কূপে। এই কূপ থেকে প্রতিদিন অন্তত ১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হলেও উত্তোলন করা হচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৭.৫ কোটি ঘনফুট। সঞ্চালন লাইনের অভাবে তোলা যাচ্ছে না বাকি গ্যাস। নিজের মাটির নিচে গ্যাস রেখে আমদানির জন্য ঘুরতে হচ্ছে দেশ থেকে দেশান্তরে।
ভোলার গ্যাস আমাদের অনেক বড় প্রাকৃতিক সম্পদ মন্তব্য করে প্রখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সুপার নিউমারারি অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম আমার দেশকে বলেন, ভোলায় মাটির নিচে আরো প্রচুর পরিমাণে গ্যাস আছে। আমাদের উচিত, দ্রুত সঞ্চালন লাইন স্থাপনের পাশাপাশি ভোলায় নতুন নতুন অনুসন্ধান চালানো।
ভোলায় শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে সেখানকার গ্যাস কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, আগের সরকার কিছু করেনি বলেই বর্তমান সরকারকে অনেক বেশি করতে হবে। বিশেষ করে ভোলার এমপি-মন্ত্রীদের এ ব্যাপারে জোর উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, ভোলার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আমরা আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, উৎপাদন বাড়াতে পারি এবং মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ এলএনজি আমদানিকারক লবি এবং ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর সুবিধা নিশ্চিত করতে পাইপলাইন প্রকল্পগুলো ঝুলিয়ে রাখা হয়। বারবার রুট পরিবর্তন করে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ করা হয়। হাসিনা সরকারের নীতিনির্ধারকদের যুক্তি ছিল, নদীর তলদেশ দিয়ে অত্যন্ত ব্যয়বহুল পাইপলাইন নির্মাণের জন্য যে পরিমাণ বিশাল মজুত প্রয়োজন, তা ভোলার কূপগুলোতে নেই। এ কারণে ২০১৮ সালে ৬০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তহীনতা ও সমীক্ষার নামে সময়ক্ষেপণ প্রকল্পটিকে আলোর মুখ দেখতে দেয়নি।
জুলাই বিপ্লবে হাসিনার পলায়নের পর অন্তর্বর্তী সরকার ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করার উদ্যোগ নেয়। বর্তমান সরকারও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ চলমান রেখেছে। প্রথম ধাপে শাহবাজপুর ও ভোলা নর্থ গ্যাসক্ষেত্র থেকে নদীর তলদেশ দিয়ে বরিশালের লাহারহাট পর্যন্ত প্রায় ৬৫ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তীব্র জ্বালানি সংকট দূর করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে। বরিশাল থেকে পাইপলাইনটি গোপালগঞ্জ হয়ে খুলনার রূপসা ও ক্রিসেন্ট জুট মিল সংলগ্ন শিল্পাঞ্চল এবং প্রস্তাবিত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪,৫০০ থেকে ৭,০০০ কোটি টাকা। সরকার আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে তহবিল পাওয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমান রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে এই সম্পূর্ণ পাইপলাইন নেটওয়ার্কের কাজ শেষ করে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে ভোলার গ্যাসকে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাইপলাইন নির্মাণে দেরি হওয়ায় অন্তর্বর্তী সময়ে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার পাশাপাশি বরিশাল ও খুলনার কিছু কারখানায় কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) আকারে সিলিন্ডার ট্রাকে করে ভোলা থেকে গ্যাস সরবরাহ করা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্যানুযায়ী, ভোলায় বর্তমানে ৪৫০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে বোরহানউদ্দিনের দক্ষিণ কুতুবা এলাকায় বিপিডিবির মালিকানাধীন ভোলা-১ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা ২২৫ মেগাওয়াট। নূসতান নামে ২২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ডুয়েল-ফুয়েল কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট রয়েছে একই উপজেলায়। শহরের খেয়াঘাট এলাকায় রয়েছে ৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় কেন্দ্রটি বর্তমানে বন্ধ। এটি পুনরায় চালু করা হলে জেলায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮৫ মেগাওয়াটে। জেলার সাত উপজেলার মধ্যে ছয়টিতে বিদ্যুৎ বিতরণ করছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। দুই সংস্থার গ্রাহক ৫ লাখের মতো। ওজোপাডিকোর দৈনিক বিদ্যুৎ চাহিদা ২২-৩০ মেগাওয়াট এবং পল্লী বিদ্যুতের ৭০-৯০ মেগাওয়াট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দূরবর্তী এলাকায় গ্যাস পরিবহনের পরিবর্তে ভোলাতেই যদি গ্যাসভিত্তিক শিল্প-কারখানা, সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানা স্থাপন করা যেত, তাতে অর্থনৈতিকভাবে দেশ আরো লাভজনক হতে পারত। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো এবং ভোলার সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসত। কিন্তু দীর্ঘ প্রচেষ্টায়ও এ উদ্যোগ তেমন ফলদায়ক হয়নি। বিভিন্ন সময়ে সার কারখানা, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড), লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) স্টেশন ও জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সংযুক্ত করার কথা বলা হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। যদিও এ গ্যাসের একটি অংশ ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন প্রোগ্রামেবল লজিক কন্ট্রোলারের (পিএলসি) মাধ্যমে সংকুচিত (সিএনজি) করে বিশেষ ক্যাসকেড সিলিন্ডারবাহী ট্রাকে কার্গো ফেরির মাধ্যমে ঢাকা ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


