ডিআইজি মীজানের জমিতে ভেজাল সারের কারখানা

ডিআইজি মীজানের জমিতে ভেজাল সারের কারখানা

ঢাকার কেরানীগঞ্জে সাবেক ডিআইজি (বাধ্যতামূলক অবসর) মীজানুর রহমানের মালিকানাধীন জমিতে ভেজাল সার ও নকল কীটনাশক তৈরির কারখানার সন্ধান পেয়েছে প্রশাসন। উপজেলার হযরতপুর ইউনিয়নের বাটারাকান্দি ব্লকের কাজিরকান্দি গ্রামের ওই কারখানায় রাতের আঁধারে বিদেশি ব্র্যান্ডের নন-ইউরিয়া (টিএসপি) সার এবং এসিআই, সিনজেনটাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নকল বালাইনাশক ও কীটনাশক উৎপাদন করা হতো বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি অভিযানে কারখানাটি থেকে বিএডিসির নকল প্যাকেট, প্যাকেটজাত নকল টিএসপি সারসহ বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক উদ্ধার করা হয়। প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, নিম্নমানের উপাদান, মাটি ও সিমেন্টজাতীয় পদার্থ মিশিয়ে এসব পণ্য তৈরি করে নামি প্রতিষ্ঠানের নকল মোড়কে বাজারজাত করা হতো।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্রের দাবি, কারখানায় প্রতিদিন রাতে ৭০-৮০ জন শ্রমিক কাজ করতেন এবং উৎপাদিত পণ্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো। এসব ক্ষতিকর ও নিম্নমানের কৃষি উপকরণ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাজারজাত করার ফলে একদিকে যেমন কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে উর্বর কৃষিজমি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে কারখানাটিতে কৃষি ও কৃষকের জন্য ক্ষতিকর ভেজাল সার ও কীটনাশক তৈরি হয়ে আসছিল। সাধারণত শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম দিনের বেলায় চলে। কিন্তু এই কারখানার চিত্র ছিল ভিন্ন। দিনের বেলা কারখানাটি প্রায়ই বন্ধ থাকলেও সন্ধ্যার পর শুরু হতো উৎপাদন। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ত কার্যক্রম। ভোর হওয়ার আগেই আবার কারখানায় নেমে আসত নীরবতা। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম চলছিল, বাইরে থেকে তা বোঝার সুযোগ ছিল না।

কারখানার এক নিরাপত্তারক্ষীর ভাষ্য, প্রতিদিন রাতে সেখানে প্রায় ৭০-৮০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। উৎপাদিত পণ্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো। কারখানায় পদ্মা অয়েল কোম্পানি, সিনজেনটা, এসিআইসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্যাকেট ও মোড়ক ব্যবহার করা হতো বলেও তিনি জানান। তার দাবি, দীর্ঘদিনের অবৈধ এই কারবারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

নামি প্রতিষ্ঠানের মোড়কে নকল পণ্য

কৃষিজমির উর্বরতা বাড়ানো, জমি প্রস্তুত করা এবং ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সার, বালাইনাশক ও কীটনাশক গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উপকরণ। এসব উপকরণের বড় একটি অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অথচ কেরানীগঞ্জের ওই কারখানায় নামি ব্র্যান্ডের আদলে বিভিন্ন কৃষি উপকরণ তৈরি ও বাজারজাত করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। কারখানাটিতে নন-ইউরিয়া (টিএসপি) সারের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে কীটনাশক ও বালাইনাশক তৈরি করা হতো।

সূত্রের দাবি, কারখানায় তৈরি নিম্নমানের সার দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাজারজাত করা হতো। নিম্নমানের সার ও ভেজাল কীটনাশক ব্যবহারের কারণে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৃষকের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে এর কারণ শনাক্ত করা কঠিন। বিশেষ করে সিনজেনটা, এসিআইসহ পরিচিত প্রতিষ্ঠানের আদলে তৈরি প্যাকেট ও মোড়ক ব্যবহার করা হলে সাধারণ কৃষকের পক্ষে আসল ও নকল পণ্য আলাদা করা আরো কঠিন হয়ে পড়ে।

মিলেছে বিএডিসির নকল প্যাকেট

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, কারখানাটিতে বিভিন্ন ধরনের নিম্নমানের নকল নন-ইউরিয়া (টিএসপি) সার উৎপাদন করা হতো। অভিযানে বিএডিসির নকল প্যাকেট এবং প্যাকেটজাত নকল টিএসপি সারের প্রায় এক হাজার বস্তা পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, কারখানায় ‘চমক’ নামে মিশ্র সার এবং কার্বোফুরান, ফুরাডান, বাসুডিন, ভিরতাকো ও শিকলসহ বিভিন্ন নকল কীটনাশকও পাওয়া যায়।

ওই কর্মকর্তার দাবি, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা নামি প্রতিষ্ঠানের প্যাকেট ও মোড়কে নিজেদের তৈরি নিম্নমানের উপাদান ভরে এসব পণ্য বাজারজাত করা হতো। এসব উপাদানের সঙ্গে মাটি ও সিমেন্টজাতীয় পদার্থও মেশানো হতো বলে তিনি জানান। পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব পণ্য পাঠানো হতো।

সার সংকটে বেড়েছিল শ্রমিকের চাহিদা

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে সার নিয়ে সংকট ও চাহিদা বাড়ার সময় কারখানাটিতেও শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে যায়। দিনের বেলা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আশপাশের অনেক বাসিন্দার কাছেই কারখানাটির প্রকৃত কার্যক্রম অজানা ছিল। স্থানীয়দের মধ্যে জমিটি সাবেক ডিআইজি মীজানুর রহমানের—এমন ধারণা থাকায় জায়গাটি নিয়ে তারা খুব বেশি প্রশ্ন তুলতেন না বলেও জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মীজানুর রহমানের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। এ পরিচিতি ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের সময় কারখানাটি বিস্তৃত করা হয়েছিল।

অভিযানে বাধার অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এর আগে কারখানাটিতে অভিযান চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাবেক ডিআইজি মীজানুর রহমানের প্রভাবের কারণে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাকে চাপ ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছিল। ফলে কার্যকরভাবে কারখানার কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে মীজানুর রহমানের বক্তব্য জানতে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ফোনে রিং হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মহুয়া শারমিন মুনমুন আমার দেশকে বলেন, মীজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। কারখানার নিরাপত্তারক্ষীকে প্রকৃত মালিকদের কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে স্থানীয় পাঁচ-ছয়জনের এই অবৈধ কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে জিয়াউর রহমান বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জমির মালিক সাবেক ডিআইজি মীজানুর রহমান হলেও কারখানাটি স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারখানাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অবস্থানও পরিবর্তন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি অভিযান পরিচালনার সময় স্থানীয় চেয়ারম্যানকে ডাকা হলেও তিনি প্রশাসনের আহ্বানে সাড়া দেননি বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, সাভারের মুশুরীখোলা এলাকার সাইদুল নামে এক ব্যক্তিসহ কয়েকজন বর্তমানে কারখানাটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। সাইদুল সাভারের বর্তমান এমপির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি—এমন জনশ্রুতিও রয়েছে।

ডিপ্লোমা অ্যাগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডি-অ্যাব) সভাপতি জিয়াউল হায়দার হাসেমী পলাশ আমার দেশকে বলেন, অতীতে বিভিন্ন সরকার পরিবর্তনের সময় এই চক্রগুলো রাজনৈতিক মদত পেলেও বর্তমান সরকারের এই অভিযান অত্যন্ত ইতিবাচক। কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে হলে এর নেপথ্যের কুশীলবদের কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে।

ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম আমার দেশকে বলেন, অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, নকল সার তৈরি ও বাজারজাতের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে প্রশাসনের নীতি জিরো টলারেন্স। স্থানীয় প্রশাসন ব্যর্থ হলে জেলা প্রশাসন বা টাস্কফোর্সের মাধ্যমে এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম নির্মূল করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন