৩৭১ বার অরাজকতার চেষ্টা নিষিদ্ধ আ.লীগের

৩৭১ বার অরাজকতার চেষ্টা নিষিদ্ধ আ.লীগের

বিএনপি সরকারের ২১০ দিনে কমপক্ষে ৩৭১ বার দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা করেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ঝটিকা মিছিল, ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো হয়েছে। এসব মিছিল ও সহিংসতায় অর্থায়ন করছেন দেশ-বিদেশে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

বিজ্ঞাপন

নিজেদের সংগঠিত করতে তারা ব্যবহার করছেন বিশেষ অ্যাপ। ফলে অনেক সময় গোয়েন্দাদের নজরদারি ফাঁকি দিতে সক্ষম হচ্ছেন তারা। পুলিশ সদর দপ্তর ও গোয়েন্দা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

দেশ অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে আইনগত ব্যবস্থা নিতে মাঠপর্যায়ে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকেও একই ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মহানগরীর যে এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করবেন, সংশ্লিষ্ট থানার ওসিসহ দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার কড়া বার্তা দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল প্রতিহত করতে ব্যর্থ হওযায় ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার ও গুলশান থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী মাঠে থাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের অরাজকতা ও দেশ অশান্ত করার নীলনকশা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। আগামীতেও যেকোনো ধরনের নাশকতার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্ক আছে পুলিশ ও গোয়েন্দারা।

পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদন ও ডিএমপি থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কমপক্ষে ৩৭১ বার মিছিল, ঝটিকা মিছিল করে অস্থিরতা তৈরি ও সহিংসতা ছড়ানোর অপচেষ্টা করেছেন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। মিছিল থেকে হাতবোমা বিস্ফোরণ এবং গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩৮০ জনকে গ্রেপ্তার এবং ১১৬টি মামলা হয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পলাতক আওয়ামী লীগের নেতারা এসব মিছিলে অর্থায়ন করছেন। বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনার দেশে ফেরাসহ বিভিন্নভাবে গুজব ছড়িয়ে ফ্যাসিবাদী দলটির নেতাকর্মীদের ‘উজ্জীবিত’ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ কার্যকর ও সময়োচিত ব্যবস্থা নিয়েছে। ফলে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর জুলাই বিপ্লবে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার অপচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের কঠোর অবস্থানের কারণে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দেওয়ার নীলনকশা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের বিশেষ শাখার ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরে হাসিনা ফিরবে’Ñএমন গুজব ছড়িয়ে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের উসকে দেওয়া হচ্ছে। তবে বিষয়টি নিয়ে পুলিশ উদ্বিগ্ন নয়। পুলিশ মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নজদারিতে রাখা হয়েছে। যেসব পেজ বা লিংক থেকে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিটিআরসি) মাধ্যমে সেগুলো মুছে ফেলা (রিমুভ) হচ্ছে। বিটিআরসির মাধ্যমে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ৮৮৫টি লিংক অপসারণ করা হয়েছে।

দফায় দফায় নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল ও সহিংসতা ঘটানোর চেষ্টা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আমার দেশকে বলেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাঝে মাঝে অপতৎপরতা চালাচ্ছেন। বিশেষ করে ফজরের নামাজের পর তারা মিছিল বের করেন এবং সেটার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তাদের বিষয়ে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে গুলশানে ঝটিকা মিছিল করে। আমাদের কাছে ওই বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য ছিল। ওই দিন শুক্রবার থাকায় মিছিলকারীরা জুমার নামাজ আদায়কারী মুসল্লির ছদ্মবেশে ছিল। ওই ঘটনায় মিছিলকারী ও আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী আরো বলেন, কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে দুষ্কৃতকারীরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। তাদের বিষয়ে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ঝটিকা মিছিলের অর্থ কারা দিচ্ছেÑএ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সেখানে কয়েকজন অর্থদাতার নাম পাওয়া গেছে। তদন্তের পর্যায়ে থাকায় কারো নাম প্রকাশ করতে চাচ্ছি না। অর্থদাতাদের কেউ কেউ দেশের বাইরে আত্মগোপনে আছেন। তারা মোবাইল ব্যাংকিং ও হুন্ডির মাধ্যমে মিছিলকারীদের অর্থ সরবরাহ করছেন।

তিনি আরো বলেন, যারা মিছিলে এসেছেন, তারা পলাতক নেতাদের সঙ্গে বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন এবং নিজেদের সংগঠিত করেছেন। মিছিলের জন্য গাড়িভাড়া ও নগদ অর্থ দিয়ে ঢাকার বাইরে থেকে লোক আনা হয়েছে।

শফিকুল আরো বলেন, আওয়ামী লীগ বড় সংগঠন। তাদের নেতাকর্মীরাও সুসংগঠিত। বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা কাজ করছি। অর্থদাতা ও অর্থ সরবরাহের মাধ্যমগুলো নিয়েও কাজ করছি।

ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঝটিকা মিছিলে অংশ নিতে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পালিয়ে যাওয়া নেতাদের ফ্ল্যাট ও আবাসিক হোটেলে থাকছেন। এজন্য রাজধানীর আবাসিক হোটেলগুলোয় নজরদারি ও তল্লাশি বাড়ানো হয়েছে। হোটেলগুলোর গেস্ট নিবন্ধন তালিকা প্রতিনিয়ত যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

গত ১১ সেপ্টেম্বর গুলশানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বড় ধরনের মিছিল ও শোডাউন করেন। মিছিল থেকে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল ছোড়েন। ওই ঘটনার পরের তিন দিনে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ১৩ সেপ্টেম্বর সাভারে ভাড়া করা বাসে এসে ছাত্রলীগকর্মীরা মিছিল বের করেন এবং বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান। পরে পুলিশ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আটজনকে আটক করে।

ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক সাইদুল ইসলাম জানান, বাস রিজার্ভ করে এসে ছাত্রলীগের ব্যানার ধরে ক্যাপ মাথায় দিয়ে ৩০-৩৫ জন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিপিএটিসি এলাকায় ঝটিকা মিছিল করেন এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা পালিয়ে যান।

পুলিশ জানায়, আগস্টে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগের ব্যানারে ১৪৩টি ঝটিকা মিছিল বের করা হয়। ওই সব ঘটনায় ৪৩ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ২০৫ জন। চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনে ছাত্রলীগ ৩১টি ঝটিকা মিছিল করেছে আর আওয়ামী লীগের ব্যানারে ২২টি মিছিল ও ৩৬ গোপন বৈঠক হয়েছে। এসব ঘটনায় সাত মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫০ জন।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রযুক্তিগত তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্যে আমরা জানতে পেরেছি, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ঢাকায় জড়ো হয়ে ঝটিকা মিছিল ও নাশকতার অপচেষ্টা করছেন। এজন্য আবাসিক হোটেলগুলোর অতিথিদের তালিকা নিয়মিতভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রয়োজনের সময় যেন এসব তথ্য দ্রুত পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, বহিরাগত অপরাধীরা যাতে ঢাকায় এসে অপরাধ সংঘটিত করতে না পারে, সেজন্য রাজধানীর প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্লক চেকপোস্ট কার্যকর করাসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনানুগভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের আগেই তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে আনতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেকোনো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। এছাড়া যে এলাকায় মিছিল-সমাবেশ হবে, ওই এলাকার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে জবাবদিহি করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে সেটা কার্যকর করা শুরু হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন