সাতচল্লিশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম নিয়ে উপমহাদেশে বহু আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। এই বিতর্কের মূলে রয়েছেন একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিলেতফেরত ব্যারিস্টার—মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি মুসলমানদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকল্প নিয়ে চিন্তা করলেও তার রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা এবং স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে নানা ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে। তার রাষ্ট্রচিন্তা ও দ্বিজাতি তত্ত্ব শুধু পাকিস্তান সৃষ্টির ইতিহাসকেই প্রভাবিত করেনি, বরং পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তার ওপরও গভীর ছাপ ফেলেছে।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতের হিন্দু ও মুসলমান—এ দুটি সম্প্রদায়কে তৎকালীন সময়ের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন কারণ এবং ঘটনার প্রেক্ষাপটে দুটি পৃথক জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভাবধারা বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি, জাতিতত্ত্বের যেকোনো সংজ্ঞা বিচারে ভারতের হিন্দু ও মুসলমান দুটি প্রধান ভিন্ন জাতি। ভারতের ১০ কোটি মুসলমান জনগণ, যাদের রয়েছে নিজস্ব স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও সভ্যতা, ভাষা ও সাহিত্য, শিল্পকলা ও স্থাপত্য, রীতিনীতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং এক ও অভিন্ন জীবনপদ্ধতি।’
লাহোর অধিবেশনে জিন্নাহ মুসলমানদের ধর্মীয় সম্প্রদায় না বলে আলাদা জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, ভুলবশত প্রায়ই বলা হয়, মুসলমানরা একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়; আসলে তা নয়। যেকোনো সূত্রে তারা একটি জাতি। ভারতবর্ষ একটি জাতি বা দেশ নয়, বরং বহু জাতির সমন্বয়ে এই উপমহাদেশ গঠিত। তার মধ্যে হিন্দু ও মুসলিম দুটি প্রধান জাতি। দ্বিজাতি তত্ত্বটি এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয় যে, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা দিক থেকে হিন্দুদের থেকে আলাদা ও স্বতন্ত্র এবং তাদের অবশ্যই একটি আলাদা স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে তারা স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারবে।
জিন্নাহর কাছে পাকিস্তান ছিল মূলত মুসলমানদের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি প্রকল্প, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আধুনিক সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম দিকে কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের মূর্তপ্রতীক হয়ে ওঠেন, যার কারণে তৎকালীন কংগ্রেস নেত্রী সরোজিনী নাইডু জিন্নাহকে ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত’ (Ambassador of Hindu-Muslim Unity) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনের পর কংগ্রেসের একক সরকার গঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ গান বাধ্যতামূলক করা এবং হিন্দি ভাষার একচেটিয়া প্রচারের মাধ্যমে কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা ও আরএসএস নেতাদের হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার গোপন পরিকল্পনা একদিকে প্রকাশ হতে থাকে। অন্যদিকে অবহেলিত পশ্চাৎপদ মুসলমান ও দলিতদের দাবিদাওয়া এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জিন্নাহর প্রস্তাব কংগ্রেস নেতারা বারবার উপেক্ষা করেন। এর ফলে জিন্নাহ বুঝতে পারেন কংগ্রেসের মাধ্যমে মুসলমানদের অধিকার আদায় হবে না, তাই তিনি কংগ্রেস ছেড়ে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তার রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি ছিল ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ (Two-Nation Theory), যার মতে ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতিসত্তা; ফলে মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রয়োজন। এই ধারণার ভিত্তিতেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্ম হয়।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত থেকে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম কেন হলো, সেজন্য আমাদের পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের সেই প্রেক্ষাপট জানতে হবে। পাকিস্তান যে দ্বিজাতি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ বা উপমহাদেশে এখনো প্রাসঙ্গিক কি না, সেটিও ইতিহাসের জরুরি আলাপ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, জিন্নাহ ও দ্বিজাতি তত্ত্বের ইতিহাস আমাদের দেশে সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়, পাঠ্যক্রমেও দ্বিজাতি তত্ত্ব ও জিন্নাহকে নিয়ে তেমন কোনো পাঠ নেই। সাহিত্য বা ইতিহাসেও সেরকম বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা নেই; অথচ জিন্নাহ ও দ্বিজাতি তত্ত্বের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতেই ভারত ভেঙে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে এবং পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। তাই বলা চলে, বাংলাদেশের জন্ম দ্বিজাতি তত্ত্বের পরোক্ষ ফল। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্ম না হলে বাংলাদেশেরও জন্ম হতো না।
জিন্নাহ মনে করতেন, উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠিত হলে মুসলমানরা হিন্দুদের অধীনস্থ জাতিতে পরিণত হবে। তাই দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ব্রিটিশ ভারত ভেঙে পাকিস্তানের জন্ম কেবল ভূখণ্ডের বিভাজন নয়; এটি ছিল একজন রাজনীতিবিদের নিজ জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে দূরদর্শী চিন্তা বাস্তবায়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন সেই চিন্তা ও রাজনৈতিক মাইলফলক বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। সেটা আমরা বুঝতে পারি আজকের ভারতের দিকে তাকালে। ভারত সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমান ভারতের দিকে যদি আমরা তাকাই, তবে আমরা দেখতে পাই বিজেপি, আরএসএস ও শিবসেনার ছত্রছায়ায় উগ্র হিন্দুত্ববাদের আস্ফালন। ভারত আজ তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের বিপরীতে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। মুসলমান সম্প্রদায় আজ সেখানে নানাভাবে নিষ্পেষিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত ও চরম বৈষম্যের শিকার।
সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত সংঘপরিবারের হিন্দু রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে ধর্ম ও ভাষা কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে একের পর এক দাঙ্গা, যার বলি হয়েছে মুসলমান সম্প্রদায়। গুজরাট দাঙ্গার প্রধান হোতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ঘটা করে কথিত রামমন্দির প্রতিষ্ঠা এবং নানা নতুন আইন করে সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়কে দমন করা—সব একসূত্রে বাঁধা। ১৯২৫ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের জন্মলগ্নে যা স্বপ্ন দেখেছিলেন সংঘ নেতারা, এত বছর পর তা বাস্তব হতে চলেছে। গরু কোরবানির কারণে মুসলমানদের পিটিয়ে কিংবা গায়ে আগুন লাগিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে মুসলমানদের হত্যা করা, গণপিটুনি দেওয়া, নিশানা করে খুন করা, হেফাজতে হত্যা করা, ভুয়া ‘পুলিশ এনকাউন্টার’ এবং মিথ্যা অজুহাতে কারাগারে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এখন সেই তালিকায় তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা যুক্ত হয়েছে বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যে। পাকিস্তানের জন্ম না হলে আজকের বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মুসলমানরা ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের এসব নির্যাতনের শিকার হতেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সাতচল্লিশের ইতিহাস যখন নতুন করে মূল্যায়নের চেষ্টা চলছে, তখন জিন্নাহ প্রশ্ন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। যদিও কেউ কেউ রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গ টেনে জিন্নাহকে খলনায়ক বানানোর চেষ্টা করে থাকেন, অথচ জিন্নাহ বাংলা ভাষার বিপক্ষে ছিলেন না। জিন্নাহ নিজেও উর্দুভাষী ছিলেন না। সে সময় পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে আলাদা আলাদা ভাষা চালু ছিল। তাই তিনি চেয়েছিলেন পাকিস্তানের সব প্রদেশের যোগাযোগ ও প্রশাসনিক সুবিধার্থে সাধারণ ভাষা বা লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চালু করতে। কারণ সমগ্র পাকিস্তানের সাধারণ ভাষা ছিল উর্দু। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ও ২৪ মার্চ ঢাকার দুটি ভাষণে জিন্নাহ স্পষ্ট করে বলেছেন, পূর্ব পাকিস্তানের দাপ্তরিক ভাষা কী হবে, তা ঠিক করবে এ অঞ্চলের মানুষ। কিন্তু সমগ্র পাকিস্তানের সব অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি সাধারণ ভাষা থাকবে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে এবং সেটা হবে উর্দু। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে জিন্নাহ যেমন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিলেন, তেমনি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও হিন্দিকে সমগ্র ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেছিলেন। বাংলাদেশে জিন্নাহকে বাংলা ভাষাবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করা হলেও রবীন্দ্রনাথকে কিন্তু সেভাবে চিত্রিত করা হয় না।
এভাবেই জিন্নাহকে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশবিরোধী হিসেবে ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে। যিনি ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের কথা চিন্তা করেছেন, তাদের রাজনৈতিক মুক্তির কথা চিন্তা করেছেন, তাকেই খলনায়ক হিসেবে দেখানো হয় বাংলাদেশে।
জিন্নাহকে নিয়ে বিতর্ক কেবল ব্যক্তিগত মতপার্থক্যের ইতিহাস নিয়ে নয়; বরং এটি উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক হতে পারে।
লেখক: সাবেক প্রফেসর, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস (কাস্ট)
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


