চোখের সামনেই লুকিয়ে ছিল নতুন প্রজাতির বনবিড়াল

চোখের সামনেই লুকিয়ে ছিল নতুন প্রজাতির বনবিড়াল
বিড়ালটিকে ডাকনাম দেওয়া হয়েছে টিগ্রিনো। ছবি: সংগৃহীত

বলিভিয়ার বনাঞ্চলে পাওয়া ছোপ ছোপ দাগযুক্ত একটি ছোট বনবিড়ালকে নতুন প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। গৃহপালিত বিড়ালের মতো আকারের এই প্রাণীটি এত দিন বিজ্ঞানীদের নজরের বাইরে ছিল। একই ধরনের দাগ ও ডোরার কারণে একে অন্য কয়েকটি বন্য বিড়ালের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হতো।

বিজ্ঞাপন

তবে ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রাণীটি আলাদা একটি প্রজাতির সদস্য। নতুন এই প্রজাতির নাম দেওয়া হয়েছে লেপার্ডাস তিলকায়ো (Leopardus tilcayo)। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে কারেন্ট বায়োলজি সাময়িকীতে।

গবেষকেরা বলছেন, আবিষ্কারটি দেখিয়ে দিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্লভ কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণী সম্পর্কে এখনও কত কিছু অজানা। একই সঙ্গে এর ফলে টাইগার ক্যাট বা বাঘ-বিড়াল সংরক্ষণেও মনোযোগ বাড়তে পারে।

টাইগার ক্যাট হলো দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার ছোট, ছোপযুক্ত বন্য বিড়াল। কোস্টা রিকা থেকে বলিভিয়া ও আর্জেন্টিনা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় এদের দেখা যায়। এদের দেখতে এতটাই মিল যে বিশেষজ্ঞদেরও অনেক সময় আলাদা প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত করতে সমস্যা হয়।

বলিভিয়ার লা পাজে অবস্থিত ইউনিভার্সিদাদ মেয়র দে সান আন্দ্রেসের গবেষক পাওলা নোগালেস-আস্কারুনজ বলেন, বিশ্বের জন্য নতুন একটি প্রজাতি শনাক্ত করতে পারা চমৎকার ফলাফল। তিনি বলেন, নতুন প্রজাতি আবিষ্কারের জন্য কোনো আগ্নেয়গিরি, দ্বীপ বা গভীর সমুদ্রে যেতে হয়নি—এটিই বিস্ময়কর।

এখন পর্যন্ত লেপার্ডাস তিলকায়োর নিশ্চিত সদস্য হিসেবে মাত্র একটি বিড়ালের কথা জানা গেছে। সেটি বলিভিয়ার একটি উদ্ধারকেন্দ্রে রয়েছে। বিজ্ঞানীরা অবশ্য মনে করছেন, বন্য পরিবেশে এ প্রজাতির আরো সদস্য রয়েছে।

১০ বছর বয়সি ওই বিড়ালের ডাকনাম ‘টিগ্রিনো’। এই বিড়ালটিই বিজ্ঞানীদের নতুন প্রজাতি শনাক্ত করার পথে নিয়ে যায়।

বলিভিয়ার বিজ্ঞানী নোগালেস-আস্কারুনজ একটি অভয়ারণ্যে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার সময় টিগ্রিনোকে দেখেন। তখনই তার মনে হয়, বিড়ালটি দেখতে কিছুটা অস্বাভাবিক।

স্থানীয় এক বাসিন্দা বন থেকে প্রাণীটিকে উদ্ধার করেছিলেন। প্রথমে তিনি এটিকে গৃহপালিত বিড়ালের বাচ্চা ভেবেছিলেন। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি সাধারণ গৃহপালিত বিড়ালের মতো আচরণ করছে না।

নোগালেস-আস্কারুনজ আরো জানতে পারেন, বলিভিয়ার ইয়ুঙ্গাস অঞ্চলের ঘন বনাঞ্চলে ছোট আকারের আরো কিছু বন্য বিড়াল দেখার ঘটনা রয়েছে। তবে এসব প্রাণী নিয়ে বিজ্ঞানীদের তেমন কোনো অনুসন্ধান ছিল না।

এরপর তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকদের সঙ্গে যুক্ত হন। জীবিত প্রাণী ও জাদুঘরে সংরক্ষিত নমুনা থেকে পাওয়া ডিএনএ বিশ্লেষণ করে তারা টাইগার ক্যাটদের পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধান করেন।

ব্রাজিলের পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব রিও গ্রান্ডে দো সুলের সংরক্ষণ জিনতত্ত্ববিদ এদুয়ার্দো এইজিরিক বলেন, এ প্রাণী সম্পর্কে রেকর্ড বা ছবি খুবই কম ছিল। জাদুঘরেও কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি।

তার ভাষায়, প্রাণীটি একরকম লুকিয়েই ছিল, কারণ কেউ তাকে খুঁজছিল না।

গবেষণায় আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। এতে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, টাইগার ক্যাটের প্রজাতি তিনটি নয়, পাঁচটি। এর মধ্যে সদ্য শনাক্ত হওয়া বলিভিয়ার টিলকায়ো ক্যাটও রয়েছে।

তবে নতুন প্রজাতি শনাক্ত করাই শেষ নয়। এখন বিজ্ঞানীদের জানতে হবে, লেপার্ডাস তিলকায়ো ঠিক কোন কোন এলাকায় বাস করে, তার পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য কী এবং বন্য পরিবেশে কী ধরনের হুমকির মুখে রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন রিসার্চ ইউনিটের সহগবেষক ক্যারোলিন সার্টর বলেন, সংরক্ষণের জন্য এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো প্রজাতি কী এবং কোথায় বাস করে, তা জানা না থাকলে তাকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, এই প্রাণীগুলো আকারে গৃহপালিত বিড়ালের মতো। তাই মনে হতে পারে, এদের সম্পর্কে মানুষ সবই জানে। কিন্তু নতুন এই আবিষ্কার দেখিয়েছে, বিশ্বের কিছু অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে এখনও অনেক কিছু আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।

বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস ও অবৈধ শিকারের কারণে টাইগার ক্যাট প্রজাতিগুলো বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে বিবেচনা করা হয়।

সম্প্রতি পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি টাইগার ক্যাট প্রজাতি স্বীকৃত ছিল। এগুলো হলো উত্তরাঞ্চলীয় টাইগার ক্যাট বা অনসিলা (Leopardus tigrinus) এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় টাইগার ক্যাট (Leopardus guttulus)। পরে ক্লাউডেড টাইগার ক্যাট (Leopardus pardinoides)-কেও পৃথক প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতিটি প্রজাতি সম্পর্কে আরো তথ্য পাওয়া গেলে এসব বিড়াল ও তাদের আবাসস্থল রক্ষায় কার্যকর সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হবে।

নতুন এই আবিষ্কারের প্রভাব বিশ্বের বিড়ালদের শ্রেণিবিন্যাসেও পড়তে পারে। বন্য ও গৃহপালিত সব বিড়ালই জীববৈজ্ঞানিক পরিবার ফেলিডি (Felidae)-এর অন্তর্ভুক্ত। এই পরিবারে ছোট গৃহপালিত বিড়াল থেকে শুরু করে বিশালাকার বাঘ পর্যন্ত সব জীবিত বিড়াল প্রজাতি রয়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমানে ৪১টি প্রজাতি স্বীকৃত। তবে নতুন এই আবিষ্কার এবং টাইগার ক্যাটের একাধিক প্রজাতি থাকার সম্ভাবনা বিবেচনায় সেই সংখ্যা ৪৪ বা ৪৫-এ পৌঁছাতে পারে।

জিনগত গবেষণা আরো এগোলে বিশ্বের বিড়াল প্রজাতির সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ অতীতে ছোট আকারের বন্য বিড়াল বড় ও বেশি আকর্ষণীয় প্রজাতির তুলনায় অনেক কম বৈজ্ঞানিক মনোযোগ পেয়েছে।

গবেষণার সঙ্গে যুক্ত না থাকা স্কটল্যান্ডের ন্যাশনাল মিউজিয়ামসের স্তন্যপায়ী প্রাণী বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু কিচেনার বলেন, দক্ষিণ আমেরিকার ছোট দাগযুক্ত বিড়ালগুলো টাইগার ক্যাট, টিগ্রিনা বা অনসিলা নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে এগুলোকে শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে জটিল প্রাণী হিসেবে দেখা হয়।

কিচেনারের মতে, এসব বিড়াল দেখতে খুবই একই রকম। আবার জাদুঘরে সংরক্ষিত নমুনাও কম। ফলে জিনগত গবেষণার মাধ্যমে নতুন প্রজাতি শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানীরা এখনও শিখছেন, কীভাবে তাদের আলাদা করা যায়।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তির উন্নতি এবং নির্দিষ্ট এলাকা থেকে আরো বেশি বন্য নমুনা সংগ্রহের ফলে এই শ্রেণিবিন্যাসের জট ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে। তবে এটি কয়েকটি ধাপের মধ্যে সর্বশেষ ধাপ। ভবিষ্যতে আরো বিস্ময় অপেক্ষা করতে পারে।

বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের জোনাস লেস্ক্রোয়ার গবেষণাটিতে জাদুঘরের সংগ্রহশালার গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। তার মতে, এসব সংগ্রহ না থাকলে বলিভিয়া থেকে পাওয়া তথ্যের সঠিক ব্যাখ্যা করার মতো যথেষ্ট তথ্য গবেষকদের হাতে নাও থাকতে পারত।

লেস্ক্রোয়ার বলেন, প্রাকৃতিক ইতিহাসভিত্তিক এসব সংগ্রহ স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকার কারণেই নতুন প্রজাতিটি সম্পর্কে পাওয়া তথ্যের সঠিক ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়েছে।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন