সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মানুষের জীবন বাঁচাতে নির্মাণ করা হয়েছিল ট্রমা সেন্টার। ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের একেবারে পাশে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল আধুনিক এই চিকিৎসাকেন্দ্র। ২০২২ সালের নভেম্বরে ঘটা করে উদ্বোধনও করা হয় এ ট্রমা সেন্টারটি । কিন্তু উদ্বোধনের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সেখানে শুরু হয়নি চিকিৎসাসেবা। চিকিৎসক নেই, নার্স নেই, নেই প্রয়োজনীয় জনবল। এমনকি সরকারি এই স্থাপনা পাহারা দেওয়ার জন্যও নেই কোনো নিরাপত্তাকর্মী।
ফলে মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য নির্মিত হাসপাতালটি এখন নিজেই যেন মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা এক পরিত্যক্ত স্থাপনা। অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে ভবন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। এরই মধ্যে চুরি হয়ে গেছে এসি, ফ্রিজ, টেলিভিশন, পানির মোটর, স্যানিটারি সামগ্রীসহ বিভিন্ন মূল্যবান জিনিস। সন্ধ্যার পর নির্জন এই স্থাপনায় মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আড্ডা বসার অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের।
মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার সন্ন্যাসীরচর ইউনিয়নের দৌলতপুর এলাকায় ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রমা সেন্টারটির বর্তমান চিত্র সরকারি অর্থ ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নের পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরীর নামে নির্মিত ট্রমা সেন্টারটি ২০২২ সালের নভেম্বরে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক উদ্বোধন করেন।
নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর উদ্বোধন হলেও কার্যত সেদিন থেকেই হাসপাতালটি পড়ে আছে। কারণ, ভবন নির্মাণের আগে কিংবা নির্মাণের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় জনবল ও পরিচালন কাঠামো নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো দাঁড়িয়ে গেলেও চিকিৎসাসেবা চালু করার মতো লোকবল পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ট্রমা সেন্টার পরিচালনার জন্য সাতজন কনসালট্যান্ট, তিনজন অর্থোপেডিক সার্জন, দুজন অ্যানেসথেটিস্ট, দুজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা, ১০ জন নার্স এবং ফার্মাসিস্ট, রেডিওগ্রাফার ও টেকনিশিয়ানসহ মোট ৩৪টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু সেই পদ সৃষ্টির অনুমোদন না পাওয়ায় হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ডা. শরীফুল আবেদীন কমল বলেন, ট্রমা সেন্টারটি আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল এখনো পাওয়া যায়নি। আমরা জনবল চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করছি দ্রুত এ সংকটের সমাধান হবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ট্রমা সেন্টারের একাধিক ভবন থাকলেও পুরো এলাকা অরক্ষিত। কোথাও নিয়মিত পাহারার ব্যবস্থা নেই। ভবনের চারপাশে আগাছা, ভেতরে নোংরা পরিবেশ। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে মরিচা পড়েছে। বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও এসিগুলোও নষ্ট হওয়ার উপক্রম।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নির্মাণ ও উদ্বোধনের সময় হাসপাতালটি ছিল ঝকঝকে ও সাজানো-গোছানো। এরপর ধীরে ধীরে কর্মকর্তাদের আনাগোনা বন্ধ হয়ে যায়। এখন ভবনগুলো পড়ে আছে অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায়। এরই মধ্যে বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী চুরি হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফাতিমা মাহজাবীন বলেন, আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। তাই সেখানে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগও সম্ভব হয়নি। চুরির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, সন্ধ্যার পর এখান দিয়ে চলাচল করতে ভয় লাগে। এখানে মাদক ও জুয়ার আড্ডা হয়। প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখতে পাচ্ছি না। আমরা চাই হাসপাতালটি দ্রুত চালু হোক।
স্থানীয় নারী আলেয়া বেগমের অভিযোগ, একদিন সন্ধ্যার দিকে মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি ট্রমা সেন্টারের ভেতরে কয়েকজন যুবককে গান-বাজনা ও নাচ করতে দেখেন। বিষয়টি জানতে চাইলে তাকে হুমকি দেওয়া হয় বলেও তিনি দাবি করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন বলেন,ট্রমা সেন্টারটি অনৈতিক কর্মকাণ্ডের আস্তানা হয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি দ্রুত হাসপাতালটি চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।
শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন বলেন,ট্রমা সেন্টারটি শহর থেকে কিছুটা দূরে এবং ওই এলাকায় মানুষের যাতায়াত কম। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব। আমাদের মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে এখন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। পদ্মা সেতু চালুর পর এ পথে যানবাহনের চাপ আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক বছরে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে ১৩৭টি দুর্ঘটনায় ১৩২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা-মাওয়া অংশে ৭৫টি দুর্ঘটনায় ৬৪ জন এবং জাজিরা-ভাঙ্গা অংশে ৬৩টি দুর্ঘটনায় ৬৭ জন নিহত হন। আহত হয়েছেন আরও শতাধিক মানুষ।
এর আগের এক বছরেও মহাসড়কটিতে ১৩৫টি দুর্ঘটনায় ১৩১ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে কুতুবপুরে একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে ১৯ জন নিহত ও ২৫ জন আহত হন।
দুর্ঘটনার পর গুরুতর আহতদের অনেক সময় ফরিদপুর কিংবা ঢাকায় নিতে হয়। স্থানীয় পর্যায়ে উন্নত ট্রমা চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
শিবচর হাইওয়ে থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন,যেখানে সড়কে আহত রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালটি গড়ে তোলা হয়েছিল,সেটি এখন অচল অবস্থায় পড়ে আছে। জায়গাটি দেখলে পরিত্যক্ত ও ভুতুড়ে মনে হয়। দ্রুত এটি চালু হলে ফরিদপুর, মাদারীপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের আহত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া সহজ হবে।ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে নিয়মিত চলাচলকারী পরিবহন চালকদের কাছেও ট্রমা সেন্টারটি দ্রুত চালুর দাবি জোরালো।
চালক আবুল হাসান বলেন,মহাসড়কের পাশে ট্রমা সেন্টার থাকা অত্যন্ত জরুরি। দুর্ঘটনায় একজন আহত রোগীকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা বা ফরিদপুর নিতে হয়। এখানে উন্নত চিকিৎসা পাওয়া যায় না। ট্রমা সেন্টার চালু থাকলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
আরেক চালক সোহেল বেপারী বলেন, দুর্ঘটনার পর সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। আহত রোগীকে দূরে নিতে নিতে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এই হাসপাতালটি চালু হলে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল ইসলাম বলেন, তিন বছর আগে ট্রমা সেন্টার উদ্বোধন হয়েছে, কিন্তু এখনো এর কার্যক্রম চালু হয়নি। রক্ষণাবেক্ষণের লোক নেই, জিনিসপত্র চুরি হচ্ছে। আমরা দ্রুত হাসপাতাল চালুর দাবি জানাই।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অবকাঠামো থাকলেই হাসপাতাল চালু করা যায় না। প্রয়োজন চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানসহ প্রয়োজনীয় জনবল এবং অর্থ বরাদ্দ। কিন্তু এসবের অনুমোদন না থাকায় ট্রমা সেন্টারটি চালু করা যাচ্ছে না।
মাদারীপুরের সিভিল সার্জন জানান, জনবলের চাহিদা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে কবে নাগাদ অনুমোদন মিলবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি তিনি।
একটি দুর্ঘটনাপ্রবণ মহাসড়কের পাশে মানুষের জীবন বাঁচানোর উদ্দেশ্যে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হলো ট্রমা সেন্টার। উদ্বোধনও হলো। কিন্তু চিকিৎসাসেবা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও অর্থের ব্যবস্থা হলো না। ফলে তিন বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে আছে পুরো প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয়দের দাবি, আর সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত ট্রমা সেন্টারটি চালু করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদার করে সরকারি সম্পদ চুরি বন্ধ, চুরি যাওয়া সরঞ্জামের বিষয়ে তদন্ত এবং মাদক ও জুয়ার আড্ডা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য নির্মিত হাসপাতালটি যেন শেষ পর্যন্ত সরকারি অর্থের অপচয় ও অব্যবস্থাপনার স্মারক হয়ে না থাকে এটাই এখন শিবচরবাসীর প্রত্যাশা।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

