উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বারখ্যাত বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন—বগুড়ার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, যা স্থানীয়ভাবে ‘বড় মসজিদ’ নামে অধিক পরিচিত। প্রায় ২৩৮ বছরের পুরোনো এই মসজিদ শুধু একটি উপাসনালয় নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয়, সামাজিক ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আজও সগৌরবে টিকে আছে ইবাদতের এই প্রশান্তিময় স্থান।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মোগল শাসক শাহ আলমের শাসনামলে ১৭৮৭ সালে বগুড়ার বড় মসজিদ নির্মিত হয়। এটি বগুড়া শহরের অন্যতম প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন এবং শহরের সবচেয়ে পুরোনো মসজিদ হিসেবে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটির বেশ কয়েকবার সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তবে প্রতিবারই এর মূল কাঠামো ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
মসজিদটির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি চমৎকার ঐতিহাসিক কাহিনি। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার কুন্দগ্রামের জমিদার সৈয়দ আকবর হোসেন চৌধুরী স্বপ্নে নির্দেশিত হয়ে করতোয়া নদীর তীরে সুফি সাধক হজরত শাহ সুফি ফতেহ আলী (রহ.)-এর মাজারের কাছে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তিনি নির্মাণকাজ শুরু করলেও কাজ সম্পন্ন করার আগেই মৃত্যুবরণ করেন। পরে তার মেয়ে লতিফাতুন নেছা বাবার অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন।
মসজিদের অদূরেই শায়িত আছেন আধ্যাত্মিক সাধক হজরত শাহ সুফি ফতেহ আলী (রহ.)। ফলে এই স্থানটি ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে একদিকে যেমন ইবাদতের জায়গা, অন্যদিকে তেমনি আধ্যাত্মিক প্রশান্তিরও এক বিশেষ কেন্দ্র।
স্থাপত্য ও সৌন্দর্য
মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য ধারণ করে নির্মিত বগুড়ার বড় মসজিদটি মূলত তিন গম্বুজের। চুন ও সুরকি দিয়ে নির্মিত মূল মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭০ ফুট এবং প্রস্থ ৩৫ ফুট। দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৪০ ইঞ্চি। মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে পাঁচটি দরজা—তিনটি পূর্বদিকে এবং একটি করে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে।
মূল মসজিদের তিন কাতারে প্রায় ৭৫ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। পুরোনো অংশের সঙ্গে সম্প্রসারিত অংশ মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় তিন হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের চারপাশে বর্তমানে মার্কেট ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠায় দূর থেকে এর পুরোনো গম্বুজগুলো সহজে দেখা যায় না। তবে মসজিদের সুবিশাল ও দৃষ্টিনন্দন আধুনিক মিনারটি দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষের নজর কাড়ে।
ইবাদত ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র
শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় ফজরের নামাজ ছাড়া দিনের অন্যান্য চার ওয়াক্তেই মসজিদটি মুসল্লিদের পদচারণে মুখর থাকে। নুরানি পরিবেশে এখানে নামাজ আদায়ের তৃপ্তি ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তি মুসল্লিদের মনে বিশেষ অনুভূতি সৃষ্টি করে।
মসজিদের সাবেক খাদেম আনছার আলী বলেন, ‘আমি বিশ বছরের অধিক সময় এই মসজিদে খেদমত করেছি। বহু মুসল্লির কাছ থেকে শুনেছি এবং নিজেও উপলব্ধি করেছি—এই মসজিদে নামাজ আদায়ের যে তৃপ্তি ও আধ্যাত্মিক পরশ পাওয়া যায়, তা সচরাচর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।’
সব মিলিয়ে বগুড়ার বড় মসজিদ শুধু ইট-পাথরের একটি প্রাচীন স্থাপনা নয়; এটি বগুড়ার ইতিহাস, ধর্মীয় চেতনা ও সামাজিক ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষী। ২৩৮ বছরের পথচলায় অসংখ্য মানুষের ইবাদত, প্রার্থনা ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই মসজিদ আজও মানুষের হৃদয়ে গভীর শ্রদ্ধার স্থান দখল করে আছে। এর আধ্যাত্মিকতা শুধু উপাসনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি এমন এক জীবন্ত কেন্দ্র, যেখানে ঈমান জাগ্রত হয়, হৃদয় পরিশুদ্ধ হয় এবং মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন।
লেখক: খতিব, খণ্ডক্ষেত্র কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, শাজাহানপুর, বগুড়া
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

