মানুষের মনে ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা এক চিরন্তন প্রবৃত্তি। তবে এই আকাঙ্ক্ষা যখন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার উন্মাদনায় রূপ নেয়, তখন তা সমাজের জন্য ভয়ংকর ধ্বংস ডেকে আনে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘবদ্ধ জনতার আক্রমণ বা ‘মব জাস্টিস’-এর ঘটনা আমাদের সমাজে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মানুষ যখন দলবদ্ধ বা ‘মব’-এ পরিণত হয়, তখন তার ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও বিচারবোধ লোপ পায়—মনস্তত্ত্বের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘ডি-ইন্ডিভিজুয়েশন’। ক্ষুব্ধ জনতার এই উন্মত্ততা মূলত কোনো বিচার নয়; বরং এটি একধরনের যৌথ অপরাধ। আবেগতাড়িত হয়ে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ জনতা কখনোই সত্যের গভীরে পৌঁছাতে পারে না। অন্যায় প্রতিহত করার নামে এমন নৈরাজ্য সৃষ্টি কখনো প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, যা ইসলামি শরিয়ত ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
ইসলামি জীবনব্যবস্থায় মানবজীবনের পবিত্রতা ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং যেকোনো মূল্যে তা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-মায়িদার ৩২ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি হত্যার অপরাধ কিংবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের কারণ ছাড়া কাউকে হত্যা করে, তবে সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল।’ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মক্কা বিজয়ের মতো চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও মহানবী (সা.) সাধারণ মানুষের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন এবং যেকোনো ধরনের সংঘবদ্ধ প্রতিশোধস্পৃহাকে কঠোরভাবে দমন করেছিলেন। অথচ একদল উন্মত্ত জনতা যখন কোনো ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করে, তখন তারা সরাসরি স্রষ্টার এই অলঙ্ঘনীয় বিধানকে পদদলিত করে। একজন মানুষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সামান্যতম সুযোগ না দিয়ে তার প্রাণ কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না; বরং এটি সুস্পষ্ট ও পরিকল্পিত হত্যা। সুতরাং উন্মত্ত জনতার অংশ হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার চরম লঙ্ঘন ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।
মব জাস্টিসের প্রধান জ্বালানি হলো যাচাই-বাছাইহীন সংবাদ বা গুজব, যা আধুনিক যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে মানুষের যৌক্তিক চিন্তাকে গ্রাস করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সত্য খবরের চেয়ে মিথ্যা খবর বা গুজব মানুষের মাঝে ছয় গুণ দ্রুত ছড়ায়। ইসলামে তথ্য যাচাইয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। সুরা আল-হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো ফাসেক বা অনির্ভরযোগ্য ব্যক্তি যদি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যেন অবশ্যই যাচাই করে নেওয়া হয়। সংঘবদ্ধ জনতা কখনোই তথ্যের সত্যতা যাচাই করে না; তারা শুধু গুজবের স্রোতে গা ভাসিয়ে অন্ধভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। সত্যতা নিরূপণের এই ঐশী নির্দেশনাকে পাশ কাটিয়ে মানুষ যখনই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, তখনই নির্দোষ মানুষের রক্ত ঝরে এবং বহু পরিবার ধ্বংসের মুখে পড়ে। একটি দায়িত্বশীল ও নিরাপদ সমাজ সর্বদা যাচাই করা সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, নিছক গুজবের চোরাবালিতে নয়।
একটি সভ্য সমাজে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব থাকে নির্দিষ্ট ও যোগ্য কর্তৃপক্ষের হাতে; রাস্তার বিক্ষুব্ধ জনতার আবেগ বা আক্রোশের ওপর নয়। ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে প্রমাণের মানদণ্ড এতটাই কঠোর যে, খলিফা আলী (রা.)-এর মতো অর্ধ-পৃথিবীর শাসককেও একজন সাধারণ ইহুদি নাগরিকের বিপরীতে কাজি শুরাইহের আদালতে সাধারণ অভিযোগকারীর মতো উপস্থিত হতে হয়েছিল এবং উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে মামলায় হার মানতে হয়েছিল। ইসলামি আইনে অভিযোগকারী, বিচারক এবং শাস্তি কার্যকরকারী কখনোই এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হতে পারে না। কিন্তু মব জাস্টিসের ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ জনতা একই সঙ্গে অভিযোগ গঠন করে, রায় ঘোষণা করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে তা কার্যকর করে, যা ইসলামি বিধানে সম্পূর্ণ হারাম। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার একক এখতিয়ার রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার; সাধারণ মানুষের দায়িত্ব কেবল সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে অক্ষত অবস্থায় আইনের হাতে সোপর্দ করা। বিচারব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে রাজপথে আদালত বসানো কখনোই ন্যায়বিচারের সংক্ষিপ্ত পথ হতে পারে না; বরং এটি জুলুমের এক অন্ধকার গহ্বরে নিপতিত হওয়ার শামিল।
ভয়াবহ এই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো সমাজে গভীর নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি এবং আইনের শাসনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করা। বৈশ্বিক অপরাধবিজ্ঞানের বিভিন্ন সূচক প্রমাণ করে, যেসব সমাজে বিচারব্যবস্থা দ্রুত ও কার্যকর এবং আইনের প্রতি মানুষের আস্থা সুদৃঢ়, সেসব স্থানে মব জাস্টিসের মাধ্যমে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। মুসলিম হিসেবে আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব হলো মহানবীর (সা.) সেই অসীম ধৈর্য, পরম সহনশীলতা ও সুবিচারের নীতিকে জীবনে ধারণ করা এবং সংঘবদ্ধ সহিংসতার মতো আদিম প্রবৃত্তি সমূলে প্রত্যাখ্যান করা। কোনো গুজব বা উত্তেজনা ছড়ালে তাৎক্ষণিক আবেগকে সংবরণ করে বিবেক জাগ্রত করতে হবে এবং আইনের প্রতি আস্থাশীল হতে হবে।
আমাদের সর্বদা মনে রাখা উচিত, উন্মত্ত জনতার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আঘাত হানায় কোনো বীরত্ব নেই; বরং একটি প্রাণ বাঁচাতে এবং ন্যায়বিচারের মর্যাদা রক্ষায় সেই উন্মত্ত জনতার সামনে দৃঢ়ভাবে রুখে দাঁড়ানোই প্রকৃত বীরত্ব।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

