বিষণ্ণতা (ডিপ্রেশন) শুধু মন খারাপের নাম নয়; এটি একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কর্মক্ষমতা এবং সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় ধারাবাহিকভাবে দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে বিষণ্ণতার হার বেশি। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে আরো ইঙ্গিত মিলেছে, নারীদের ক্ষেত্রে বিষণ্ণতার জেনেটিক বা বংশগত ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে। তবে এ ঝুঁকির পেছনে শুধু জিন নয়, হরমোনের পরিবর্তন, মানসিক চাপ, সামাজিক বাস্তবতা এবং জীবনযাপনের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জেনেটিক ঝুঁকি কী?
জেনেটিক ঝুঁকি বলতে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এমন বৈশিষ্ট্যকে বোঝায়, যা কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়াতে পারে। বিষণ্ণতার ক্ষেত্রেও একাধিক জিন একসঙ্গে কাজ করে ঝুঁকি তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, একই ধরনের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য নারী ও পুরুষের শরীরে সমানভাবে প্রভাব ফেলে না।
কেন নারীদের ঝুঁকি বেশি?
বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নারীদের ক্ষেত্রে বিষণ্ণতার ঝুঁকি বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে—
• জেনেটিক সংবেদনশীলতা তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে
• ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের ওঠানামা মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে।
• কৈশোর, গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের পর এবং মেনোপজের সময় মানসিক পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
• পরিবার ও কর্মক্ষেত্রের দ্বৈত দায়িত্ব দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তৈরি করে।
• পারিবারিক সহিংসতা, বৈষম্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক চাপও বিষণ্ণতার ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
জিন ও হরমোনের সম্পর্ক
মস্তিষ্কে সেরোটোনিন, ডোপামিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ মানুষের আবেগ ও মানসিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। নারী হরমোনের পরিবর্তন এসব রাসায়নিক পদার্থের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। জেনেটিক সংবেদনশীলতা থাকলে এই পরিবর্তনের প্রভাব আরো বেশি হতে পারে, ফলে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ে।
কোন সময়গুলোয় ঝুঁকি বেশি?
জীবনের কিছু পর্যায়ে নারীদের মানসিক পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়; যেমন বয়ঃসন্ধিকাল, গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের পরের সময়, মেনোপজের আগে ও পরে এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ থাকাকালে।
বিষণ্ণতার সাধারণ লক্ষণ
নিচের লক্ষণগুলো দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে থাকলে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—
• দীর্ঘসময় মন খারাপ বা শূন্যতা অনুভব করা।
• আগের মতো কোনো কাজে আগ্রহ না থাকা।
• অতিরিক্ত ক্লান্তি বা শক্তির অভাব।
• ঘুম কমে যাওয়া বা অতিরিক্ত ঘুম।
• ক্ষুধার পরিবর্তন।
• মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা।
• নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়া।
• অতিরিক্ত হতাশা বা অপরাধবোধ।
ঝুঁকি কমাতে করণীয়
• প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট শারীরিক ব্যায়াম করুন।
• পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম নিশ্চিত করুন।
• সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান।
• পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখুন।
• মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
• প্রয়োজন হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিন।
পরিবার ও সমাজের ভূমিকা
নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনো নানা ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই বিষণ্ণতার লক্ষণকে সাময়িক মন খারাপ বলে এড়িয়ে যান। অথচ সময়মতো বিষয়টি চিহ্নিত করা গেলে চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ মানুষই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। তাই পরিবারের সদস্যদের উচিত সমালোচনা নয়, সহানুভূতি ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে পাশে দাঁড়ানো।
পরিশেষে বলা যায়, বিষণ্ণতা এমন একটি সমস্যা, যা নারী-পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, নারীদের ক্ষেত্রে জেনেটিক, হরমোনজনিত এবং সামাজিক নানা কারণ একসঙ্গে কাজ করায় ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। তাই বিষয়টিকে অবহেলা না করে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্যকে শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্ব দিলে এবং পরিবার-সমাজ সহায়ক ভূমিকা পালন করলে বিষণ্ণতা মোকাবিলা করা অনেক সহজ হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

