বাংলাদেশকে স্বাগত জানাল আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস

বাংলাদেশকে স্বাগত জানাল আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস

দূর জাপানের আকাশে তখন গোধূলির আলো আসি আসি করছে। নাগোয়ার মাটিতে একে একে উড়ছে এশিয়ার নানা দেশের পতাকা। সেই রঙের মেলায় হঠাৎ করেই চোখে পড়ে চেনা লাল-সবুজ। মুহূর্তেই যেন হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশ এসে দাঁড়ায় নাগোয়ার অ্যাথলেট প্লাজায়। মুহূর্তেই ফুটে উঠল একটি দেশের গল্প, মানুষের ভালোবাসা আর হাজার মাইল দূরের স্বদেশের প্রতিচ্ছবি। নাগোয়ায় এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ। এশিয়ান গেমসের মূল আসর শুরুর আগে ‘ওয়েলকাম সিরেমোনি’র মধ্য দিয়ে বাংলাদেশসহ অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানাল আয়োজক আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস।

গার্ডেন পিয়েরে গেমসের অ্যাথলেট প্লাজায় বসেছিল সংক্ষিপ্ত অথচ প্রাণের উচ্ছ্বাসে ভরা সেই আয়োজন। নানা দেশের পতাকার ভিড়ে সেখানে বাংলাদেশের লাল-সবুজও জানান দিল নিজেদের উপস্থিতি। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন এবারের এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ দলের সেফ দ্য মিশন এবং বিওএর ভাইস প্রেসিডেন্ট মেজর (অব.) ইমরোজ আহমেদ। আয়োজকদের হাতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তুলে দেওয়া হয় উপহার স্মারক। বিনিময়ে জাপানের নাগোয়ার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির স্মারক তুলে দেওয়া হয় বাংলাদেশ দলের সেফ দ্য মিশনের হাতে। এরপর মঞ্চে ডেকে নেওয়া হয় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদের। উপস্থিত অতিথিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় লাল-সবুজ প্রতিনিধিদের।

বিজ্ঞাপন

এরই মধ্যে সংক্ষিপ্ত এক স্বাগত বক্তব্যে এশিয়ান গেমস আয়োজক কর্মকর্তা নাউকি মাতসুই বলেন, ‘আজ এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও সংবাদমাধ্যমের সদস্যদের স্বাগত জানাতে পেরে আমরা আনন্দিত। আইচি-নাগোয়ার ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে এমন আতিথেয়তার সঙ্গে আমরা আপনাদের বরণ করে নিচ্ছি। আমরা আশা করি, আপনারা এ অঞ্চলের অনন্য আকর্ষণ উপভোগ করবেন। প্রিয় খেলোয়াড়রা, আমরা আপনাদের সাহায্য করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

তারপর যেন বদলে গেল পুরো পরিবেশ। জাপানের প্রাচীন ঐতিহ্য আর আধুনিক আয়োজনের মিশেলে একের পর এক পরিবেশনা মুগ্ধ করে উপস্থিত সবাইকে। সামুরাই নৃত্য, নিনজা ফাইটের আদলে আর্ট ফাইট এবং কিমোনো পরিহিত গেইশা তরুণীদের প্রাণবন্ত পরিবেশনায় ফুটে উঠল জাপানের চিরায়ত সংস্কৃতির নানা রঙ। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ভূগোল; তবু খেলাধুলার এক সুতোয় বাঁধা এশিয়ার দেশগুলো যেন একই পরিবারের সদস্য হয়ে উঠেছিল।

বাংলাদেশের পালা আসতেই অনুষ্ঠানে তৈরি হয় অন্যরকম এক আবহ। উপস্থাপিকা যখন বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও ক্রীড়াঙ্গনের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরছিলেন, তখন উপস্থিত অতিথিদের করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে অ্যাথলেট প্লাজা। দূর জাপানের মাটিতে নিজের দেশের নাম উচ্চারিত হতে শুনে গর্বে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন বাংলাদেশ প্রতিনিধিরা। তবে সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি আসে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের সময়।

যখন লাল-সবুজ পতাকা ধীরে ধীরে ওপরে উঠছিল, তখন চারপাশের কোলাহল যেন কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়ায়। আর পেছনে বেজে ওঠেÑ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। প্রবাসে, দেশের সীমানা থেকে বহু দূরে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীতের সেই সুরে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি বাংলাদেশ প্রতিনিধিরা। কারো চোখের কোণে জমে ওঠে অশ্রু, কারো মুখে ফুটে ওঠে নীরব গর্ব। সে মুহূর্তে নাগোয়া আর বিদেশ ছিল না; মনে হচ্ছিল লাল-সবুজের সঙ্গে বাংলাদেশও যেন দাঁড়িয়ে আছে ঠিক পাশেই।

প্রতিযোগিতা শুরুর আগেই তাই বাংলাদেশের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকল এ আয়োজন। কারণ, এশিয়ান গেমস শুধু মাঠের লড়াই নয়, এটি একে অন্যের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অস্তিত্বকে জানারও এক বড় উপলক্ষ।

সেই সম্প্রীতির বার্তাকেই আরো অর্থবহ করে তুলতে অনুষ্ঠান শেষে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অ্যাথলেট প্লাজা প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারাও রোপণ করা হয়। একটি ছোট্ট চারা যেন বন্ধুত্বের প্রতীক, এশিয়ার সংহতির প্রতীক। আজকের মাটিতে রোপণ করা সেই চারা একদিন বড় হবে, ছায়া দেবে। আর তার শেকড়ে হয়তো থেকে যাবে একদিনের সেই স্মৃতি, যেদিন নাগোয়ার মাটিতে বাংলাদেশকে ভালোবাসা ও উষ্ণতায় স্বাগত জানিয়েছিল আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন