জাতীয় সংসদ: সংখ্যায় সচল, সংস্কারে স্থবির

জাতীয় সংসদ: সংখ্যায় সচল, সংস্কারে স্থবির

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন ২৭ আগস্ট শুরু হয়ে ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। এই সংক্ষিপ্ত অধিবেশনে ছয়টি বিল উত্থাপিত এবং ছয়টিই পাস হয়েছে। আইনপ্রণয়ন, প্রশ্নোত্তর, সংসদীয় কমিটি গঠন, জরুরি জনস্বার্থের নোটিস ও রাজনৈতিক বিতর্ক—সব মিলিয়ে সংসদের তৃতীয় অধিবেশন সংখ্যার হিসাবে বেশ সক্রিয় ছিল। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫, গণভোটে দেওয়া জনগণের রায় এবং সরকারি দল বিএনপির বহুল প্রচারিত ৩১ দফার আলোকে অধিবেশনটি মূল্যায়ন করলে ভিন্নচিত্র দেখা যায়। সংসদীয় কার্যক্রম এগোলেও রাষ্ট্রসংস্কারের মৌলিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখনো দৃশ্যমান নয়।

বিজ্ঞাপন

অধিবেশন শেষে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য ১৪৪টি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উত্তরদানের জন্য ২ হাজার ৬৭৬টি প্রশ্ন ছিল। প্রধানমন্ত্রীর ও মন্ত্রীদের কাছে পাঠানো ২ হাজার ৮২০টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৬৯৩টির সরাসরি উত্তর পাওয়া গেছে; বাকিগুলোর উত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়েছে। সরাসরি উত্তর পাওয়া প্রশ্নের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী উত্তর দিয়েছেন ১৫টির এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা উত্তর দিয়েছেন ১ হাজার ৬৭৮টির।

এই পরিসংখ্যান সংসদীয় জবাবদিহির একটি ইতিবাচক সূচনা নির্দেশ করে। তবে প্রশ্নের সংখ্যা কিংবা উত্তর টেবিলে উত্থাপন করাই যথেষ্ট নয়। উত্তর কতটা সুনির্দিষ্ট ছিল, সম্পূরক প্রশ্নের মাধ্যমে মন্ত্রীদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা গেছে কি না এবং উত্থাপিত সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে—এসবই সংসদীয় কার্যকারিতার প্রকৃত মানদণ্ড। বিশেষ করে, প্রধানমন্ত্রীর জন্য জমা পড়া ১৪৪টি প্রশ্নের বিপরীতে সরাসরি উত্তর মাত্র ১৫টি হওয়ায় সংসদে সরকারপ্রধানের প্রত্যক্ষ জবাবদিহি আরো সম্প্রসারণের প্রয়োজন স্পষ্ট।

সংসদীয় নোটিসের ক্ষেত্রেও সদস্যদের অংশগ্রহণ দেখা গেছে। কার্যপ্রণালি-বিধির ৬৮ বিধিতে পাওয়া সাতটি নোটিসের মধ্যে দুটি গ্রহণ করে আলোচনা করা হয়েছে। ৭১ বিধিতে ১৫টি নোটিস গ্রহণ করা হয় এবং ১৪টির ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ৭১(ক) বিধিতে দুই মিনিটের বক্তব্য দেওয়ার জন্য ১২৪টি নোটিস পাওয়া যায়। ১৪৭ বিধিতে পাওয়া দুটি নোটিসের মধ্যে একটি আলোচিত হয়েছে এবং ৩০২ বিধিতে একটি নোটিস উত্থাপিত হয়েছে। এসব তথ্য সংসদ সদস্যদের আগ্রহের পরিচয় দেয়। তবে সাতটির মধ্যে মাত্র দুটি নোটিস আলোচনার জন্য গ্রহণ কিংবা দুই মিনিটের বক্তব্যের মধ্যে জনস্বার্থের গুরুতর সমস্যাকে সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা সংসদের গভীর ও ফলপ্রসূ আলোচনার পরিসর নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

অধিবেশনে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, সৌরবিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা, বিদেশের কারাগারে বাংলাদেশিদের অবস্থা, বিডিআর বিদ্রোহ-সংশ্লিষ্ট বন্দি, শ্রমশক্তি, সার সরবরাহ, ডেঙ্গু, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের অডিট আপত্তির মতো বিষয় উঠে এসেছে। সম্পত্তি হস্তান্তর, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং র‌্যাবের পরিবর্তে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন গঠনসংশ্লিষ্ট আইনও গুরুত্ব পেয়েছে। গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আইনপ্রণয়ন অবশ্যই ইতিবাচক। তবে কোনো বাহিনীর নাম বদলানোকে সংস্কার বলা যাবে না, যদি তার কমান্ড কাঠামো, বলপ্রয়োগের সীমা, বিচারযোগ্যতা এবং নাগরিক নজরদারির ব্যবস্থা নিশ্চিত না হয়।

আইনপ্রণয়নের পাশাপাশি ৩৫টি সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন এবং একটি বিশেষ কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে কমিটিই সরকারের ব্যয়, নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গভীর পরীক্ষা করার প্রধান ক্ষেত্র। কিন্তু কমিটি গঠনের সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলোÑকে সেগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব কতটা এবং কমিটিগুলো নির্বাহী বিভাগের কাছ থেকে নথি ও জবাব আদায় করতে পারছে কি না। গঠিত কমিটিগুলোর চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জবাবদিহির ক্ষেত্রটি শক্তিশালী হওয়ার আশা খুব বেশি নেই।

জুলাই জাতীয় সনদের অন্যতম চেতনা ছিল সংসদকে নির্বাহী বিভাগের অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে কার্যকর তদারকি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। সেজন্য জুলাই সনদ অনুযায়ী, সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে আনুপাতিক হারে স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার অঙ্গীকার ছিল। সনদের অন্যতম মূল চেতনাই ছিল—সরকারি হিসাব, সরকারি প্রতিষ্ঠান, অনুমিত হিসাব এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তদারকি কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের ওপর স্বাধীন সংসদীয় নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা। অথচ তৃতীয় অধিবেশনে ব্যাপকভাবে কমিটি গঠিত হলেও বিরোধী দলকে আনুপাতিক সদস্যপদ ও অর্থবহসংখ্যক সভাপতির পদ দেওয়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়নি। বিরোধী দলের কাউকে সাধারণ সদস্য হিসেবে রাখা আর সরকারের আয়-ব্যয় পর্যালোচনাকারী কমিটির নেতৃত্ব দেওয়া এক বিষয় নয়।

সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সংবিধান সংস্কার নিয়ে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ বৈধ ভোট সংবিধান সংস্কারের পক্ষে পড়েছে। অর্থাৎ গণভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের রায় দিয়ে দিয়েছে। জনগণের সেই রায়কে কার্যকর করাই বর্তমান সংসদ ও সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে নীরব, যা জনগণের গণরায়ের প্রতি অবজ্ঞারই শামিল।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোটের প্রশ্নে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন’ এবং প্রথম অধিবেশন শুরুর পর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত সংস্কার সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছিল। অথচ সংসদে গঠন করা হয়েছে ‘সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি’। দুটি নামের পার্থক্যকে নিছক ভাষাগত বিষয় ভাবার সুযোগ নেই। সংস্কার পরিষদ জনগণের গণভোটে অনুমোদিত একটি বিশেষ ম্যান্ডেটের প্রতিষ্ঠান; সংসদীয় বিশেষ কমিটি প্রচলিত কার্যপ্রণালির অধীনে গঠিত একটি কমিটি। প্রথমটি রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামো পুনর্বিন্যাসের দায়িত্ব বহন করে, দ্বিতীয়টি সংবিধানের নির্দিষ্ট সংশোধনী পরীক্ষা ও সুপারিশের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে।

সরকার বলতে পারে, সংবিধান সংশোধনের এখতিয়ার সংসদের, তাই বিশেষ কমিটিই যথেষ্ট। কিন্তু জনগণও জানত, শেষ পর্যন্ত সংসদকেই সাংবিধানিক পরিবর্তন অনুমোদন করতে হবে। তারপরও গণভোটে আলাদা সংস্কার পরিষদ, নির্দিষ্ট কর্মপরিধি এবং সময়সীমার পক্ষে ম্যান্ডেট নেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাইরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা। এখন ‘সংস্কার’কে ‘সংশোধন’ এবং ‘পরিষদ’কে ‘বিশেষ কমিটি’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হলে গণরায়ের পরিধি সংকুচিত হয়। এটি বোঝার জন্য রকেট সায়েন্স পড়ার প্রয়োজন পড়ে না। এখানে রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের খেলা বললে বেশি বলা হবে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ যে শেষ কথা নয়, তা জনগণ বুঝিয়ে দিয়েছে। রাজনীতিবিদদের সেটি মনে রাখা দরকার। তাতেই দেশ-জাতি তথা সবার মঙ্গল।

অধিকন্তু, এখানেই সরকারি দল বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে সরকারের আচরণের বড় অসামঞ্জস্য। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বিএনপি সংবিধান সংস্কার কমিশন, ক্ষমতার ভারসাম্য, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা, কার্যকর সংসদীয় নজরদারি, বিরোধী দলের যথাযথ ভূমিকা, ন্যায়পাল, বিচার বিভাগীয় কমিশন, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন, অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষ পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই ৩১ দফা ছিল রাষ্ট্র মেরামতের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। কিন্তু ক্ষমতায় এসে একটি যথাযথ সংবিধান সংস্কার পরিষদ বা প্রতিশ্রুত সংস্কার কমিশনের পরিবর্তে সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে সীমাবদ্ধ থাকা ওই অঙ্গীকার পূরণের প্রমাণ নয়।

৩১ দফার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত। ন্যায়পাল নিয়োগ, সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের আগে সংসদীয় শুনানি, প্রশাসন ও পুলিশ সংস্কার, ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য এবং বিরোধী নেতৃত্বাধীন সংসদীয় তদারকি এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। বিএনপি যদি ক্ষমতায় এসে নিজস্ব ৩১ দফাকেই অগ্রাধিকার না দেয়, তাহলে জনগণ যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন করবে—প্রস্তাবগুলো কি রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা ছিল, নাকি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনৈতিক কৌশল?

তৃতীয় অধিবেশনে বিরোধী দলের ভূমিকা দৃশ্যমান হলেও তা এখনো পূর্ণাঙ্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধী রাজনীতিতে পরিণত হয়নি। সংবিধান সংস্কার পরিষদের পরিবর্তে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রতিবাদে অধিবেশনের প্রথম দিন বিরোধী দলের ওয়াকআউট একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা, জনজীবনের সমস্যা এবং ভারতের সঙ্গে সৎ ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলেছেন। বিরোধী সদস্যরা প্রশ্ন ও নোটিসও দিয়েছেন। তবে শুধু বক্তব্য ও ওয়াকআউট যথেষ্ট নয়। জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকারের অগ্রগতি নিয়ে ছায়া প্রতিবেদন, বিকল্প সাংবিধানিক খসড়া, বেসরকারি সদস্য বিল এবং মন্ত্রণালয়ভিত্তিক জবাবদিহি প্রতিবেদন দেওয়া দরকার।

তৃতীয় অধিবেশন প্রমাণ করেছে, সংসদ আবার রাজনৈতিক আলোচনা ও প্রশ্নোত্তরের একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠছে—এটি স্বস্তির। কিন্তু নতুন সংসদের প্রকৃত পরীক্ষা ছয়টি বিল পাস কিংবা ৩৫টি কমিটি গঠনে নয়। প্রকৃত পরীক্ষা হলো—ক্ষমতাসীন দল নিজের ক্ষমতা সীমিত করতে এবং বিরোধী দলকে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর ক্ষমতা দিতে প্রস্তুত কি না। জুলাই সনদ ও বিএনপির ৩১ দফা—দুটির কেন্দ্রীয় দর্শনই ছিল ক্ষমতার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ। সেই দর্শন বাস্তবায়িত না হলে সংখ্যায় সক্রিয় সংসদও সংস্কারে স্থবির থেকে যাবে।

লেখক: প্রফেসর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...