রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ হচ্ছে আইনসভা (সংসদ), নির্বাহী বিভাগ (প্রশাসন) ও বিচার বিভাগ। এই বিষয়গুলো যেকোনো রাষ্ট্রকে কার্যকর রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর কোনো একটি অচল হয়ে গেলে রাষ্ট্র সঠিকভাবে চলে না। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় গণমাধ্যমকে। একটি রাষ্ট্রে গণমাধ্যম যদি তার সঠিক দায়িত্ব পালন করতে না পারে, তাহলে সেই রাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গণমাধ্যম একই সঙ্গে অনেকগুলো কাজ করে। এটি যেমন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক নীতি ও চেতনা সমুন্নত রাখতে সহযোগিতা করে, তেমনি শাসকগোষ্ঠীকে অন্যায় থেকে বিরত রাখতে ভূমিকা পালন করে।
জনগণের সঙ্গে শাসকদের সেতুবন্ধ গড়ে দিতেও কাজ করে গণমাধ্যম। জনগণ কী চায়, সেটি গণমাধ্যমে চোখ রাখলেই সরকার বুঝতে পারে, আবার সরকার কোন নীতিতে চলছে, সেটিও জনগণ জানতে পারে মিডিয়ার মাধ্যমে। সে হিসেবে স্বাধীন গণমাধ্যমকে দেশের আয়না বলা যেতে পারে। আয়না যেমন চেহারার সৌন্দর্য ও খুঁত দুটোই দেখিয়ে দেয়, গণমাধ্যমের কাজটিও একই রকম।
গত দেড় যুগে বাংলাদেশের বেশিরভাগ গণমাধ্যম ফ্যাসিবাদের সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। যে কারণে পাঠক বা দর্শকদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ছিল একেবারে তলানিতে। বিপরীতে হু হু করে বেড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুরুত্ব।
অথচ চিত্রটা হওয়ার কথা ছিল ভিন্ন। রাষ্ট্র বা শাসক ভুল করলে সেটি ধরিয়ে দেওয়ার কথা গণমাধ্যমের। কিন্তু সেটি হয়নি। বরং হয়েছে উল্টোটা। মিডিয়ার বড় বড় পদে থেকে একেকজন সাংবাদিক শাসকগোষ্ঠীর তোষামোদ করে গেছেন। টেলিভিশনে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন যারা দেখেছেন, তারা নিশ্চিত হেসেছেন। ‘প্রশ্ন করতে আসিনি, প্রশংসা করতে এসেছি।’ তৈলমর্দন ছিল তাদের দর্শন। এসব তথাকথিত সাংবাদিক সেখানে যেতেন শেখ হাসিনাকে খুশি করে নিজেদের সুবিধা আদায় করে নিতে। ফ্যাসিস্টরা এটির নাম দিয়েছিলেন ‘উন্নয়ন সাংবাদিকতা’, যেখানে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাফাই গাওয়া হতো। বাংলাদেশের অধিকাংশ সাংবাদিকের যেখানে অবস্থা শোচনীয়, সেখানে ফ্যাসিস্টের দোসর কথিত অনেক সাংবাদিক শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।
আবার তখন কিছুদিন চলেছে ‘স্প্যান সাংবাদিকতা’। সাংবাদিকতার কোনো অভিধানে এ নামটি না থাকলেও বাংলাদেশে সেটি প্রচলন হয়ে গিয়েছিল মুখে মুখে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পদ্মা সেতু নির্মাণের বছরগুলোতে এই সেতুর প্রতিটি স্প্যান বসানোর খবরসহ সব ধরনের অগ্রগতি নিয়ে প্রতিদিন খবর হতো জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে। বিশ্বের আর কোথাও কোনো ব্রিজের প্রতিটি স্প্যান বসানোর ঘটনা সংবাদ হওয়ার নজির দেখা যায়নি।
শেখ হাসিনার পতনের দু-এক দিন আগেও তথাকথিত একদল সাংবাদিক গণভবনে হাজির হয়ে ছাত্র আন্দোলন দমনের নানা কৌশল বাতলে দিয়েছেন। তারা বলেছেন, সরকারকে টিকিয়ে রাখতে গণমাধ্যম সবকিছু করতে প্রস্তুত। প্রকৃত সাংবাদিকতা মানে যেখানে শাসকগোষ্ঠীর বিরাগভাজন হওয়া, সেখানে বাংলাদেশেই বোধহয় দেখা গেছে শাসককে টিকিয়ে রাখতে সাংবাদিকদের ‘মাঠে নামতে’। একটি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরাপারসনের কণ্ঠে পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলতে শোনা গেছে, ভাই, গুলি করেন ও ফুটেজ নেব।
শেখ হাসিনার স্বৈরশাসক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে তথাকথিত অনেক গণমাধ্যমের ভূমিকা খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কিছু সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রমে দেখা গেছে, সরকারি চাপ নয়, বরং তারা নিজেরাই অতিউৎসাহী হয়েই চাটুকারিতা করেছে। সরকারপ্রধানকে খুশি রাখতে রীতিমতো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় নামত তারা। এর ফলে সাংবাদিকদের প্রতি মানুষের যে শ্রদ্ধা অতীতে ছিল, তার জায়গায় এখন বিরাজ করছে ক্ষোভ।
অথচ গণমাধ্যম হওয়ার কথা ছিল গণমানুষের প্রত্যাশাবান্ধব। জনগণের প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরলে তারা দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করবে, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর দেশের অনেক গণমাধ্যম দ্রুত তাদের চরিত্র বদলাতে শুরু করে। কিছু গণমাধ্যম বর্তমান সরকারের প্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। অতীতে তারা হাসিনারও প্রিয় হতে কাজ করেছে এবং সুবিধা নিয়েছে। সরকারকে বুঝতে হবে, কারা ‘মুখ’ আর কারা ‘মুখোশ’। এসব চিহ্নিত করতে না পারলে সরকার বিপদে পড়বে। চাটুকার গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর নয়। তাদের একমাত্র লক্ষ্য নিজেদের আখের গোছানো।
লেখক: সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

