বুদ্ধিবৃত্তিক দাদাগিরি: সময় কি তবে বদলায়নি

বুদ্ধিবৃত্তিক দাদাগিরি: সময় কি তবে বদলায়নি

গান্ধীর ব্যক্তিত্ব ও জীবনযাপন সম্পর্কে ভারতের বিশিষ্ট কবি ও রাজনীতিবিদ সরোজিনী নাইডুর একটা রসিকতা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তিনি বলতেন, ইট কস্টস এ গ্রেট ডিল অব মানি টু কিপ গান্ধীজি লিভিং ইন পভার্টি (It costs a great deal of money to keep Gandhiji living in poverty)Ñঅর্থাৎ গান্ধীকে দারিদ্র্যের মধ্যে রাখতেও অনেক টাকা খরচ হয়।

বিজ্ঞাপন

গান্ধী অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন, কিন্তু তার আশ্রম, ভ্রমণ, নিরাপত্তা, খাদ্য, চিকিৎসা, ছাগলের দুধ ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে তার অনুসারী ও ধনী সমর্থকদের যথেষ্ট অর্থ ব্যয় হতো। তাছাড়া নিজের ইন্দ্রিয় বা রিপুকে টেস্ট করার জন্য ওনার দুই পাশে দুই তরুণীকে নিয়ে রাত্রিযাপনের জন্যও একটা আলাদা খরচ ছিল। কারণ ছাগলের দুগ্ধপানের নিমিত্তে ছাগল ও তার বাচ্চার সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রিয় টেস্টিংয়ের এই সাকুল্য ল্যাবরেটরি দুটিও নাকি সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতেন!

ভাগ্যিস সেই প্রজন্মে দু-একজন ঠোঁটকাটা সরোজিনী নাইডু জন্ম নিলেও আজকের জেন-জি প্রজন্ম কিংবা ককরোচ জনতা পার্টির জন্ম হয়নি। তা না হলে প্রত্যহ সকালে সেই দুই তরুণীর ডাক্তারি পরীক্ষার দাবি উঠত।

উপমহাদেশের মাইন্ড সেটটি আসলেই অদ্ভুত! যাকে ভালোবাসি বা যতক্ষণ ভালোবাসি ততক্ষণ দুই পাশে দুই নারী নিয়ে রিপু টেস্টের দাবি করলেও তা সন্তুষ্টির সঙ্গে মেনে নিই। আবার যাকে দেখতে নারী তাকে নিয়ে একসময় তৈলাক্ত কবিতা লিখলেও মুহূর্তেই ‘গোলামের-পুত-গোলাম’ ডাকতে ইতস্তত করিনি। জিন্নাহকে নিয়ে যেমন করেছেন বেগম সুফিয়া কামাল।

মাফিয়া রানির আমলে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাদের ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা হতো। অথচ পাকিস্তান আমলেও সাধারণ রাজবন্দিদেরও সমীহের সঙ্গে ট্রিট করা হতো। পাকিস্তানের জেলে আমাদের রাজবন্দিরা কেমন দিন কাটাতেনÑতা জানতে নিচের হিসাবটি মিলিয়ে দেখুন।

শেখ কামালের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট। যদি সাধারণ ৩৮ সপ্তাহের গর্ভকাল ধরে হিসাব করা হয়, তাহলে তার সম্ভাব্য কনসেপশন পিরিয়ড (conception period) বা মাতৃগর্ভে আসার শুভক্ষণটি নভেম্বর ১৯৪৮-এর শেষ দিক থেকে ডিসেম্বর ১৯৪৮-এর প্রথম দিকের কাছাকাছি, যা শেখ মুজিবের ১৯৪৮-৪৯ সালের কারাবাসের সময়ের মধ্যে পড়ে। তিনি ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮-এ গ্রেপ্তার হন এবং ২১ জানুয়ারি ১৯৪৯ পর্যন্ত আটক ছিলেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে জেলে আটক থাকলেও মুজিব দম্পতি দাম্পত্য জীবনের আস্বাদন থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত ছিলেন না।

এখানে ইতিহাসের কিছু আনকমফোর্টেবল ট্রুথ আমাদের সামনে চলে আসে। সংখ্যালঘু সাদা প্রভুদের বন্দিশালায় নেলসন ম্যান্ডেলার জেলজীবন আর আয়ুব-ইয়াহিয়া-মোনায়েম খাঁদের জেলখানায় শেখ মুজিবের জেলজীবন এক রকম ছিল না। পাকিস্তানি শাসকদের যতটুকু অমানবিক ও নিষ্ঠুর হিসেবে দেখানো হয়Ñবাস্তব ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। শেখ কামালের মাতৃগর্ভে আসার ইতিহাস আমাদের চেতনাজাত অনেক বয়ানকে অসার করে তোলে! শেখ মুজিব কিংবা বেগম মুজিব এ ক্ষেত্রে অন্যায় কিছু করেছেনÑআমি সেটি প্রমাণ করতে চাচ্ছি না। আমি বলতে চাচ্ছি, পাকিস্তানি শাসকদের আপনারা যতটুকু নাপাক ও চশমখোর হিসেবে তুলে ধরছেনÑএ ঘটনা প্রমাণ করে তারা ততটুকু ছিলেন না।

আর এ কারণেই পাকিস্তানি শাসকদের জেলখানাগুলো কমিউনিস্টদের একেকটা চমৎকার রেসিডেন্সিয়াল কলেজ হয়ে পড়েছিল। সরকার সহজ-সরল ছাত্রদের এখানে ঢোকাত এবং সরকারি খরচে খেয়ে-দেয়ে একেকজন নাদুসনুদুস কমরেড হয়ে বের হতেন। সরকারি কর্মকর্তা বাপ কমিউনিস্টদের ঠেঙাত আর ছেলে ছাত্র ইউনিয়ন করে দিব্যি ঘুরে বেড়াত । আর মা পান খেতে খেতে সুখের এই গল্প সবাইকে বলে বেড়াত।

কাজেই শেখ মুজিবের জীবনের বিশাল ত্যাগ সম্পর্কে আমাদের যে কাহিনি শোনানো হয়, সেখানেও অনেক ভেজাল রয়েছে। তাকে মহামানব বা অতিমানব বানানোর বিশেষ একটা উদ্দেশ্য থেকে একটা মিথ তৈরি করা হয়েছে!

গান্ধীকে গরিব হিসেবে দেখানোর জন্য ইন্ডিয়ান ব্যবসায়ীদের যেমন অনেক খরচ করতে হতোÑএর চেয়েও লাখো কোটি গুণ খরচ করা হয়েছে শেখ মুজিবের ত্যাগের এই কাহিনি প্রচার করতে। রাষ্ট্রযন্ত্র এবং আইন-আদালত ব্যবহার করা হয়েছে মানুষের মুখ বন্ধ করে রাখতে। সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক লাঠিয়াল বাহিনীর সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ইতরামো তো ছিলই।

তখন ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের ঘটনা। চারদলীয় জোট সরকারের আমল। আমি চট্টগ্রাম স্টেশনের একটা বুক শপে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘আমার ফাঁসি চাই’ বইটি আছে কি না! দোকানদার চোখের ইশারায় কাছে নিয়ে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলেন, ‘আছে, তবে আস্তে বলুন।’ কিছুক্ষণ পরে এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটি বই নিউজ-পেপারে মোড়ে আমার হাতে দিলেন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আমি সেভাবেই কিনে বইটি নিয়ে এসে একটানে পড়ে ফেললাম। এই বইটিতে জাতির জন্য অনেক ওয়ার্নিং ছিল, যা আমরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছি।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী একটা অনুষ্ঠানে প্রণিধানযোগ্য কিছু কথা বলেছেন। আমাদের বোধ ও ভাবনার জগতে প্রাক্তন এই উপদেষ্টা কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। তার এই প্রশ্নগুলো নতুন না হলেও তার মতো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মুখ থেকে এর আগে বেশি শোনা যায়নি। তিনি জানতে চেয়েছেন, ‘আপনি কি ভেবে দেখেছেন যে ১৬ ডিসেম্বর কেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন না? এটি নিয়ে আমাদের কোনো ইতিহাসবিদ কি প্রশ্ন করেছেন? এটি নিয়ে আপনি কি কোনো সিনেমা দেখেছেন? না, দেখেননি। ৭২ থেকে ৭৫ নিয়ে আমাদের কোনো সাহিত্যিক কোনো উপন্যাস লিখেছেন? আমার মতো কোনো ফিল্ম মেকার সিনেমা বানিয়েছেন? না, বানাননি কেউ। ফলে আপনাকে বুঝতে হবে আমরা শিল্পীরা এবং মিডিয়া কোনটা দেখাই আর কোনটা দেখাই নাÑএর মধ্য দিয়েও আমরা কিন্তু নেরেটিভ সেট করি। আমরা যে অংশগুলো দেখাই না, যেমন ৭২ থেকে ৭৫ দেখাই না, রাইট? কারণ ওটা দেখালেই বোঝা যাবে যে ফ্যাসিবাদের পয়লা সূচনাটি আসলে ৭২ থেকে ৭৫ সালেই হয়েছিল। এই যে কোনটা দেখাব আর কোনটা দেখাব নাÑএই বিপদ তো আমাদের ৫৪ বছর নাÑতার আগে থেকেই শুরু হয়েছে, এটি সিক্সটিজ থেকেই শুরু হয়েছে। ভাসানী কেন (ইতিহাস থেকে) নাই হয়ে গেল? খোঁজ নেন, তাহলে বুঝবেন এগুলো কেন কেয়ারফুলি ওমিট করা হয়েছে, আবার কোনটা কেয়ারফুলি ইতিহাসে গ্লোরিফাই করা হয়েছে।’

প্রাক্তন এই উপদেষ্টা এবং দেশের অন্যতম একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আমাদের হৃদয়ের একটি বদ্ধ দুয়ার আরেকটু খুলে দিয়েছেন। ‘পাছে-লোকে-রাজাকার-বলে’ এ রকম হীনম্মন্যতায় আক্রান্ত একটা গ্রুপের মনে কিছুটা সাহস জুগিয়েছেন।

এই মাটি ও মানুষের ভেতর থেকে গজিয়ে ওঠা ন্যাচারাল লিডারশিপ মওলানা ভাসানীকে ছাপিয়ে শেখ মুজিবকে ত্যাগী ও আপসহীন নেতা হিসেবে তৈরি করা হয়। শেখ মুজিবের সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ সেই ১৯৬০ সালের গোড়া থেকেই শুরু হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। আগরতলার ষড়যন্ত্র মামলাটিও নাকি ‘ষড়যন্ত্র’ ছিল না। সেই কথা আবার আওয়ামী লীগ নেতারাই প্রকাশ করে দিয়েছেন। এই সবগুলো ডট একসঙ্গে মেলানো হলে ইতিহাসের নতুন এক সমীকরণ আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জীবিত মুজিবকে এই দেশ ও জাতির স্বার্থের বিরুদ্ধে যতটুকু না ব্যবহার করা হয়েছেÑমৃত মুজিবের ছবি বা মূর্তিকে তার চেয়ে আরো বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। মুজিবকে আবার চেতনার লাইনে তোলা হচ্ছে। সাদা চুলের উর্দু বিভাগের এক আদু ভাইকে দিয়ে বলানো হচ্ছেÑএটি জিন্নাহর বাংলাদেশ নয়Ñএটি মুজিবের বাংলাদেশ, এটি ভাসানীর বাংলাদেশ, এটি জিয়ার বাংলাদেশ। দেখেন, কীভাবে আলগোছে ভাসানী আর জিয়ার কোটিং দিয়ে সেই মুজিবকে সেট করে দিচ্ছে।

একশ্রেণির জ্ঞানপাপী আমাদের গোল্ডফিশ মেমরির সুযোগ নিয়ে মাফিয়া রানির সব অপকর্ম ও মানবতাবিরোধী অপরাধ ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আপাতত ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে টার্গেট করেছে। বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে মাল-মসলা সংগ্রহ করা হচ্ছে। সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াত এবং এনসিপির অভিযোগকে নবনীতারা সুকৌশলে ‘আগেই-ভালো-ছিলাম’ এই বয়ান তৈরিতে কাজে লাগাচ্ছে। কাজেই সাধু সাবধান।

জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর হাফিজ বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা ছিলেন বিশ্বের সেরা ভিলেন অভিনেত্রী। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের গণভবনে ডেকে তাদের স্ত্রী-সন্তানদের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতেন।’ চিন্তা করুন, যে অসহায় স্ত্রী, কন্যা বা মাকে জড়িয়ে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন, তাদের সবাই জানত যে তাদের প্রিয়জনকে ওনার নির্দেশেই গুম বা হত্যা করা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সেই ডায়ালগ তো ছিলইÑস্বজন হারানোর বেদনা আমার চেয়ে আর কেউ বেশি বুঝে না।

মাফিয়া রানির এক সিরিয়াল কিলারের লোমহর্ষক কাহিনি জানা যাচ্ছে। ভিক্টিমকে কাছ থেকে মাথায় গুলি করে অথবা ইনজেকশন পুশ করে হত্যা করা হতো। ফিনকি দিয়ে বের হওয়া মগজের স্পর্শে বিশেষ সুখ অনুভব করত নরপিশাচ জিয়াউল আহসান। এরপর পেট কেটে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে কীভাবে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলা দেওয়া হতো, সেসব কাহিনি হরর মুভিকেও হার মানাবে! আমার মনে হয়, এসব ঘটনা ভিডিও করে সেই ডাইনিকে দেখানো হতো! সেসব ভিডিও দেখে ডাইনির ভাত খাওয়া বেড়ে যেত। রেন্টু তার বইটিতে এই ভাত খাওয়ার পরিমাণ বৃদ্ধির কথাটি লিখে গেছেন! আমাদের পারস্পরিক ক্ষোভ ও হতাশা সেই ডাইনিকে ফিরিয়ে আনার বন্দোবস্ত পাকা করছে।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-কে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালকে যেমন আমাদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না, তেমনি ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭-এর সংগ্রাম এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসনকে আমাদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না। আবার গায়ের জোরে একপেশে ব্যাখ্যাকেও পুরো জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

রাষ্ট্রভাষা হিসেবে একমাত্র উর্দুকে ঘোষণা করার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঘোষণাটি নিঃসন্দেহে ভুল ছিল। সেই ভুলকে সংশোধন করা হয়েছিল। এটিকে রাষ্ট্রভাষা না বলে Lingua Franca বা সব প্রদেশের পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য কমন ভাষা বললে এতটুকু স্পর্শকাতর হয়ে উঠত না। যদিও ১৯৫৬ সালে উর্দু ও বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। যে জিন্নাহকে বাংলাবিদ্বেষী বলে প্রচার করা হয়েছে, ১৯৪৮ সালে মৃত্যুর পর মাজারের নাম ফলকটিতে উর্দুর পাশাপাশি বাংলায়ও জন্ম-মৃত্যুর তারিখ খোদাই করা রয়েছে।

ভারত বর্ষে আটশ বছর ফারসি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বলবৎ ছিল, দেড়শ বছর ছিল ইংরেজি। তারপরও আমাদের কিংবা ভারতবর্ষের অন্যদের মাতৃভাষা কেউ ‘কাইড়া’ নিতে পারেনি। পৃথিবীতে এক জাতি অন্য জাতিকে পদানত করেছেÑএ রকম শত শত উদাহরণ রয়েছে কিন্তু কেউ কারো মাতৃভাষা কেড়ে নিয়েছে এ রকম উদাহরণ একটাও নেই। অথচ Lingua Franca হিসেবে উর্দুকে নিয়ে আমরা তাই ভাবলাম। পুরো ভাষা আন্দোলনে লাশ গুনলে পাঁচ-ছয়জনের বেশি শহীদ পাওয়া যায় নাÑঅথচ আমরা গান বাঁধলাম ‘শত মায়ের অশ্রুঝরা একুশে ফেব্রুয়ারি’ । শেখ হাসিনার সিরিয়াল কিলার এক জিয়াউল হাসান সকাল-বিকাল নাশতাই করত এ রকম চার-পাঁচজন শিবির ও ছাত্রদল ধরে ধরে।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দিকে তাদের ক্ষোভের মূল কারণ ভারত মাতাকে বিভক্তকরণ এবং তারই ধারাবাহিকতায় পূর্ববাংলায় জমিদার প্রথার উচ্ছেদ। কিন্তু এই ক্ষোভের কথাটি বললে তো আর পাবলিক সমর্থন পাওয়া যাবে না। ৪৭-এ ভাগ না হলে ৭১-এ কি আদৌ বাংলাদেশ হতো? অথবা এখনো কলকাতা থাকত আমাদের প্রাদেশিক রাজধানী এবং পুরো বাংলাদেশ হতো নমঃশূদ্র ও ম্লেচ্ছদের ভাগাড়। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করলে আমাদের অবস্থা হতো কাশ্মীরের চেয়েও ভয়াবহ ও অগ্নিগর্ভ।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রবক্তা হিসেবে গণ্য করা হতো। প্রথম জীবনে কংগ্রেসে যোগ দেন। ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দিলেও ত্রিশের দশক পর্যন্ত কংগ্রেসের সঙ্গেও যুগপৎ কাজ করে গেছেন। বিজেপির সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যশবন্ত সিং জিন্নাহ এবং দেশভাগের সত্য ঘটনা নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন। বইটি প্রকাশের পর বিজেপি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। এই বইটিতে সিং দেখিয়েছেন, হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অগ্রদূত জিন্নাহ চেয়েছিলেন একটি শিথিল ফেডারেল ভারত যেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর যথেষ্ট স্বায়ত্তশাসন থাকবে। কিন্তু নেহরু-প্যাটেলের শক্তিশালী কেন্দ্রের ধারণা এবং এটি নিয়ে তাদের একগুঁয়েমি জিন্নাহকে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের ধারণার দিকে ঠেলে দেয়।

গান্ধীসহ কংগ্রেসের হিন্দু নেতাদের শঠতা তিনি ধরে ফেলেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বর্ণবাদী হিন্দুদের নির্যাতন থেকে উপমহাদেশের মুসলিমদের রক্ষাকল্পে আলাদা রাষ্ট্রের দাবি তোলেন। তার এই দাবি কতটুকু সঠিক ছিল, তা হিন্দুত্ববাদী গ্রুপ কর্তৃক ইন্ডিয়ান মুসলিমদের ওপর শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক নির্যাতনের কাহিনি থেকেই আন্দাজ করা যায়। দুদিন আগে দেখলাম, এক বৃদ্ধ মুসলমান ভাইকে একটি গরুর সামনে শুইয়ে প্রণাম করানো হচ্ছে। সেই বৃদ্ধের অসহায় চোখ ও মুখটি দেখে উপলব্ধি করলামÑএই ভদ্রলোক আমাদের জন্য কী কাজটিই না করে গেছেন।

১৯৪৮ সালে জিন্নাহ মারা গেছেন আর কবি আল্লামা ইকবাল মারা গেছেন পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই। আমাদের চেতনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ পারলে তাদেরও ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী বানিয়ে দেয়। আমার তো মনে হয়, শিথিল ফেডারেল সিস্টেমের প্রবক্তা জিন্নাহ আরো কয়েক বছর বেঁচে থাকলে পাকিস্তানের শুরুতেই শিথিল ফেডারেল সিস্টেম চালু করে ফেলতেন। তখন তো আর ১৯৭১-এ রক্তক্ষয়ী ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের প্রশ্নই উঠত না। আমরা যাকে ভালোবাসি, জানি না কেন ভালোবাসি? যাকে ঘৃণা করিÑসেখানেও জানি না, কেন ঘৃণা করি?

একটা জাতি কতটুকু ইতিহাসবিমুখ হলে সেই জিন্নাহর ছবিকে এমনভাবে অপমান করা হয়। জুলাই বিপ্লবের হাত ধরে গদিতে বসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও অন্যান্য কর্মকর্তা সেই তাণ্ডবের প্রতি নৈতিক সমর্থন দেন। এমনকি যারা এই ভালো কাজটি করেছিলেন, তারাও এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। এরাও কথিত চেতনাজীবীদের চাপে সেই জিন্নাহকে অনেকটা খলনায়ক হিসেবেই রেখে দিতে চাইলেন। ডাকসুর জিএসের সুরে অনেকটা এমনটাই দেখা গেছে।

মাঝে মাঝে মনে হয়, জিন্নাহ সম্পর্কে সত্য কথা বলতে বিজেপি নেতা যে সাহস দেখিয়েছেনÑআমাদের দেশে বিএনপি তো দূরের কথা, জামায়াত নেতারাও সেই সাহস দেখাতে পারছেন না। ইনহাস্ত ওয়াতনাম। এটাই আজ আমার জন্মভূমি!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন