সৌদিতে হুতিদের হামলা : কী করবে পাকিস্তান

সৌদিতে হুতিদের হামলা : কী করবে পাকিস্তান
ছবি: সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকার কারণে তেল রপ্তানির জন্য সৌদি আরবের কাছে এখন লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালির গুরুত্ব অনেক। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযোগকারী মান্দেব প্রণালির আশপাশে থাকা সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে গত সপ্তাহে অভিযান শুরু করে দেশটির হুতি বিদ্রোহীরা। তারা দ্রুতই মোচা শহর দখলের পর বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এই অভিযানের সময় হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে ও তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতি করে। এর ফলে বাব আল-মান্দেব দিয়েও সৌদির তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়।

দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদমাধ্যম এক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে হুতিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দুবার অনুরোধ করেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। কিন্তু যুবরাজের অনুরোধ ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে এই কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আপাতত হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করছে না ট্রাম্প প্রশাসন।

বিজ্ঞাপন

সৌদি আরবে হুতিদের হামলা ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি দখল তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কার্যকারিতার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে। চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের এগিয়ে আসার কথা। যদি দেশ দুটি সত্যিই এগিয়ে আসে, তাহলে পাকিস্তান ও তুরস্কের হস্তক্ষেপের ধরন কেমন হতে পারে সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট জানা প্রয়োজন। উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান নিরাপত্তা সহযোগী যুক্তরাষ্ট্র কিছুদিন ধরে ইঙ্গিত দিয়ে আসছে যে, তারা আশা করে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধব্যবস্থার মূল দায়িত্ব নিজেরাই নেবে, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সীমিত পরিসরেই থাকবে। বাস্তবেও যুক্তরাষ্ট্রের সেই অবস্থান ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসন শুরুর পর থেকে তার আঞ্চলিক মিত্রদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষায় কার্যকর সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের সামরিক ঘাঁটির ওপর ইরানের কয়েক দফা হামলাও ঠেকাতে পারেনি মার্কিন বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি কমে আসা এবং ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আঞ্চলিক পর্যায়ে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়ার ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোকে একটি নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামোর কথা ভাবতে হয়েছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান প্রথম পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এরপর চলতি বছরের আগস্টে তুরস্ক এতে যোগ দেয় এবং চুক্তিটি ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে রূপ নেয়।

চুক্তিটি এখনো প্রাথমিক বা প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে রয়েছে। কোনো সদস্যরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পদক্ষেপ নেবে—এমন কোনো নির্দিষ্ট সীমা বা পরিস্থিতির কথা এতে প্রকাশ্যে উল্লেখ করা হয়নি।

এখন মূল প্রশ্নে হচ্ছে—কোনো সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে এই চুক্তিটি কীভাবে কার্যকর হবে? চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কোনো উসকানিবিহীন আগ্রাসন চালানো হলে কিংবা ইয়েমেন সংঘাতের আঁচ দেশটির ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়লে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ কার্যকর হবে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

তবে এই চুক্তিটি ঠিক কীভাবে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে আসিফ কোনো সুনির্দিষ্ট বিবরণ বা ব্যাখ্যা দেননি। তবে গত মাসে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পষ্ট করে বলেছিলেন, মক্কা চুক্তি ন্যাটোর মতোই কাজ করবে। অর্থাৎ, কোনো সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে তাকে সক্রিয়ভাবে সহায়তার অনুরোধ জানাতে হবে এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

ন্যাটোর গঠনতন্ত্রের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জোটের কোনো সদস্যরাষ্ট্র পরামর্শ ও তথ্য আদান-প্রদানের জন্য বৈঠক আহ্বান করতে পারে। ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে মিত্রদের কাছ থেকে পারস্পরিক সহায়তার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেই সহায়তার ধরন কী হবে, তা নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালে সিরিয়া তুরস্কের একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার পর আঙ্কারা পরামর্শের জন্য ৪ নম্বর অনুচ্ছেদটি কার্যকর করে এবং সুনির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছিল। সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের দাবি জানানোর পরিবর্তে তুরস্ক সরকার স্পষ্টভাবে ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (ব্যাটারি) চেয়েছিল। ন্যাটো সেই অনুরোধ অনুমোদন করে এবং তুরস্কের আকাশসীমা সুরক্ষায় ওই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে।

এই প্রেক্ষাপটে, ‘মক্কা চুক্তি’ যদি কার্যকর করতে হয়, তবে সৌদি আরবকেই নির্ধারণ করতে হবে যে তাদের কী ধরনের সামরিক সহায়তা ও সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, রিয়াদ যদি শুধু সামরিক সরঞ্জাম ও গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তার বাইরে গিয়ে পাকিস্তানের কাছ থেকে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানায়, তবে ইসলামাবাদ তা মেনে চলতে বাধ্য থাকবে।

এরই মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল-সৌদ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ইসলামাবাদ প্রকাশ্যে ইরানকে আহ্বান জানিয়ে বলেছে, যেন তারা হুতিদের সৌদি আরবে হামলা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির জন্য হুমকি সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখে। পাশাপাশি, চুক্তির আওতায় রিয়াদের প্রতিরক্ষায় পাকিস্তানের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সেটিও তারা তেহরানকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। কূটনৈতিক উপায়ে হুতি ও ইরানকে সংযত রাখার ক্ষেত্রে আঙ্কারাও সম্ভবত তার ভূমিকা পালন করবে।

কিন্তু কূটনীতি যদি ব্যর্থ হয় এবং সৌদি আরবে বা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের হামলা অব্যাহত থাকে, তবে তুরস্ক ও পাকিস্তান তাদের আকাশপথ ব্যবহার করা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়িয়ে দিতে পারে। সৌদি আরবে পাকিস্তানের প্রায় ১৬টি ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান-সংবলিত একটি স্কোয়াড্রন, বিভিন্ন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং হাজার হাজার সৈন্য আগে থেকেই মোতায়েন রয়েছে।

তবে, এই মুহূর্তে ইয়েমেনে পাকিস্তানি বাহিনীর সরাসরি হামলার সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিপর্যয়কর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কথা মাথায় রেখে পাকিস্তান ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে সতর্ক থাকবে।

সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো—পাকিস্তান হুতিদের নিবৃত্ত করার জন্য ইরানের ওপর যৌথ কূটনৈতিক চাপ বাড়াবে, সৌদি প্রতিরক্ষায় সহায়তা আরো জোরদার করবে এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বহুজাতিক নৌ-জোট গঠনের উদ্যোগ নেবে। সংযমের এই পথ অবলম্বন করলে ‘মক্কা চুক্তি’র মূল চেতনা অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টাও জোরদার হবে।

মক্কা চুক্তির মতো প্রতিরক্ষা সমঝোতাগুলোর মাধ্যমে যে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে, তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে কয়েক বছর সময় লাগবে। সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া ও নিয়মকানুন গড়ে না ওঠা পর্যন্ত সৌদি আরব এবং অন্যান্য আরব অংশীদারের সঙ্গে পাকিস্তানের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্ক মূলত প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা পূরণের ওপরই গুরুত্ব দেবে।

আলজাজিরা অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন