বর্তমান বিশ্বে মানবসভ্যতার জন্য ইসরাইল সবচেয়ে বিপজ্জনক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল মুসলমান নয়, পৃথিবীর সব মানুষের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য এই ভয়ংকর মানবতাবিরোধী এবং সামরিক দিক দিয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী রাষ্ট্রটি সম্পর্কে আমাদের বিশদভাবে জানা প্রয়োজন। সারা পৃথিবীর চোখের সামনে ইসরাইল ফিলিস্তিন ও লেবাননে বছরের পর বছর ধরে গণহত্যা চালাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সব আরব দেশ তো বটেই, এমনকি ইসরাইল থেকে বেশ দূরের প্রাচীন পারসিক সভ্যতার ইরান পর্যন্ত ইসরাইলের অব্যাহত আক্রমণের শিকার হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থনপুষ্ট ইসরাইলি বাহিনী আন্তর্জাতিক আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে বিশ্বের যেকোনো দেশের রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতাদের খুন করতে কিছুমাত্র দ্বিধা করছে না।
দেশটির সেনাবাহিনীর উন্মত্ত সদস্যরা হাসতে হাসতে যেভাবে নিশানা করে মুসলিম শিশুদের হত্যা করে চলেছে, সেটা কোনো মানবসন্তানের মধ্যে বিন্দু পরিমাণ মনুষ্যত্ব অবশিষ্ট থাকলে সম্ভব নয়। সেনা পোশাকে ইসরাইলি দানবদের হাতের বন্দুকের শত শত গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে নিহত, ছয় বছরের ফিলিস্তিনি বালিকা, হিন্দ রাজাব আজ সারা বিশ্বের নিষ্পাপ নিপীড়িত শিশুদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। গাজায় হিন্দ রাজাবকে হত্যার সময় আমি ইস্তানবুলে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলাম। ছয় বছরের বালিকাটির নির্মম হত্যাকাণ্ডে আমি বহু রাত ঘুমাতে পারিনি। সে সময় তুরস্কে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনের ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে ওদের বাবা-মা, ভাই-বোন ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে ইসরাইলি সৈন্যদের হাতে নির্মম হত্যার কথা শুনে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দেওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারিনি। কাকতালীয়ভাবে, আজকের লেখাটিও আমি সেই ইস্তানবুলে বসেই লিখছি।
শিরোনামে আমি ইসরাইলকে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বলেছি। সে প্রসঙ্গে দেশটির জন্মের ইতিহাস খানিকটা বর্ণনা করা আবশ্যক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির সংখ্যালঘু ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হিটলারের বর্বর নাৎসি বাহিনীর মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের ‘ভিকটিমহুড’কে (Victimhood) ব্যবহার করে এই ‘নিও-কলোনিয়াল সেটলার’ (Neo-colonial settler) রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তৎকালীন
জাতিসংঘের সব প্রভাবশালী দেশকে ফিলিস্তিনের জনগণকে অমানবিকভাবে বাস্তুচ্যুত করে ইসরাইল নামক কৃত্রিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অপরাধের দায় গ্রহণ করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল নামক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তারাই সৃষ্টি করেছিল। আজকের প্রজন্ম গাজায় যে গণহত্যা দেখছে, তার শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে নেতানিয়াহুর পূর্বসূরি ‘জায়নিস্ট টেরোরিস্ট’ মেনাহেম বেগিন ও আইজাক শামিরের হাতে। ১৯৪৮ সালের ৯ এপ্রিল মেনাহেম বেগিনের ইরগুন এবং আইজাক শামিরের লেহি দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ফিলিস্তিনের ‘দেইর ইয়াসিন’ নামের গ্রামে গভীর রাতে আক্রমণ চালিয়ে অসহায় নারী, পুরুষ ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করেছিল। সেই থেকে ফিলিস্তিনের জনগণের বিরুদ্ধে যে ইহুদিবাদী গণহত্যা শুরু হয়েছিল, তার অবসান আজ পর্যন্ত হয়নি।
সন্ত্রাসী মেনাহেম বেগিন এবং আইজাক শামির, উভয়ই তথাকথিত গণতান্ত্রিক ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। আরো পরিহাসের বিষয় হলো, কট্টর ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী মেনাহেম বেগিনকে ১৯৭৮ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সঙ্গে যৌথভাবে ‘শান্তিতে’ নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। মানবতার এর চেয়ে বড় অপমান আর বোধহয় হতে পারে না। বিধ্বংসী বিস্ফোরকের অন্যতম উপাদান, ডিনামাইটের আবিষ্কারক, সুইডেনের বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল জায়নিস্ট বেগিনের মতো গণহত্যাকারীকে পুরস্কার দেওয়ার জন্য তার সম্পদ নিশ্চয়ই দান করে যাননি। আমি মনে করি, শান্তিতে এ ধরনের নোবেল পুরস্কার প্রদান প্রকৃতপক্ষে বিশ্বশান্তির সঙ্গে এক নির্মম তামাশা মাত্র।
বাংলাদেশের শান্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রফেসর ইউনূস আমার এই মন্তব্যে হয়তো খানিকটা আহত বোধ করতে পারেন। আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাসঙ্গিক তথ্য এখানে দিয়ে রাখা প্রয়োজন। এই নরপিশাচ মেনাহেম বেগিন কিংবা তার বাবা-মা কেউই কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে জন্মগ্রহণ করেননি। তারা সবাই বেলারুশের বাসিন্দা ছিলেন। মেনাহেম বেগিন ১৯৪২ সালে পোল্যান্ডের হিটলারবিরোধী সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে সর্বপ্রথম ফিলিস্তিনের মাটিতে পা রাখেন। তারপর তিনি ফিলিস্তিনের ভূমিতে বসতি স্থাপন করেন এবং সেখানে ইরগুন নামের ইহুদি সন্ত্রাসী দল গঠন করেন। এই সাবেক সন্ত্রাসী ও গণহত্যাকারী ১৯৭৭ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। প্রকৃতপক্ষে ১৯৯২ সালে আইজাক রাবিন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগপর্যন্ত আগের সব ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ইউরোপ থেকে আগত বসতি স্থাপনকারী ছিলেন।
১৯৪৮ সালের ১৪ মে স্বাধীন ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রথম ঘোষণা দানকারী ইহুদি নেতা ডেভিড বেন গুরিয়ানও বংশ এবং জন্মসূত্রে পোল্যান্ডের অধিবাসী ছিলেন। এই ব্যক্তির প্রকৃত নাম ছিল ডেভিড গ্রুন। তিনি পরবর্তীকালে আসল নাম গ্রুনকে হিব্রু ভাষায় বেন গুরিয়ানে পরিবর্তন করেছিলেন। ১৯২২ সালে ফিলিস্তিনের মাটিতে জন্মগ্রহণকারী প্রথম ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী আইজাক রাবিনের বাবা-মাও যথাক্রমে ইউক্রেন এবং বেলারুশে জন্মগ্রহণ করে ইসরাইলে বসতি স্থাপন করেছিলেন।
কাজেই বাবা-মার সূত্রে রাবিনও বসতি স্থাপনকারী পরিবারের সদস্য ছিলেন। ইসরাইলের নেতাদের জন্মের ইতিহাস এই কারণে বর্ণনা করছি যাতে করে পাঠকদের ‘সেটলার কলোনিয়াল’ দেশটির প্রকৃত চরিত্র অনুধাবন করতে সুবিধা হয়। বাংলাদেশের তরুণদের প্রতি আহ্বান থাকবে তারা যেন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল রাষ্ট্র স্থাপনের ইতিহাস এবং সেদেশের ‘নিও-কলোনিয়াল’ জায়নিস্ট রাজনীতি নিয়ে অধিকতর পড়াশোনা করে। এসব বিষয়ে বিশদ তথ্য জানা না থাকলে আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের অপরাধের প্রমাণ যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারব না। উপরে বর্ণিত আইজাক রাবিনসহ ৭ ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর জন্ম হয়েছে ফিলিস্তিনের মাটিতে। এদের মধ্যে আইজাক রাবিনের পূর্বপুরুষের কাহিনি ইতোমধ্যে বর্ণনা করেছি। এবার বাকি ৬ জনের পরিবারের ইতিহাস অতি সংক্ষেপে লিখছি।
এরিল শ্যারন
লেবাননের শাবরা ও শাতিলা উদ্বাস্তু শিবিরে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনের নাগরিকদের ওপর গণহত্যা চালানো জেনারেল এরিল শ্যারনের প্রকৃত নাম ছিল এরিক শিনারম্যান। তার বাবা ও মা বেলারুশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ১৯২২ সালে ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করেন। এরিক শিনারম্যান প্রধানত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এরিল শ্যারনে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
এহুদ বারাক
১৯৯৯ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এহুদ বারাকের প্রকৃত নাম এহুদ ব্রগ। ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণকারী এহুদ ব্রগ ১৯৭২ সালে হিব্রুতে নাম পরিবর্তন করেন। তার বাবা-মা পূর্ব ইউরোপের লিথুয়ানিয়া থেকে প্যালেস্টাইনে বসতি গেড়েছিলেন।
এহুদ ওলমার্ট
সাবেক এই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর বাবা ও মা, মোরদেচাই ওলমার্ট এবং বেলা ওয়াগম্যান যথাক্রমে রাশিয়া এবং ইউক্রেন থেকে প্যালেস্টাইনে বসতি স্থাপন করেছিলেন। এহুদ ওলমার্ট ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
নাফতালি বেনেট
এই সাবেক ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর বাবা এবং মায়ের পরিবার যথাক্রমে পোল্যান্ড এবং রাশিয়া থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। নাফতালি বেনেটের বাবা ও মা ১৯৬৭ সালে সান ফ্রান্সিসকো থেকে ইসরাইলে এসে বসতি স্থাপন করেন এবং তিনি ১৯৭২ সালে ইসরাইলে জন্মগ্রহণ করেন। ২০২১ এবং ২০২২ সালে নাফতালি বেনেট ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
ইয়াইর লাপিদ
সাবেক সাংবাদিক এবং বর্তমানে রাজনীতিবিদ ইয়াইর লাপিদের বাবা যুগোস্লাভিয়া থেকে ফিলিস্তিনে এসেছিলেন। লাপিদের মা রোমানিয়ার বাবা-মায়ের সন্তান হলেও পরিবারের বসতি স্থাপনের পর ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ২০২২ সালে নাফতালি বেনেটের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রিত্ব ভাগাভাগি করে ইয়াইর লাপিদ ২০২২ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু
গাজার গণহত্যাকারী ইসরাইলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বাবা পোল্যান্ড থেকে ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তার লিথুয়ানিয়ান মায়ের পরিবার জন্মভূমি থেকে প্রথমে ভাগ্যান্বেষণে আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন। এরপর ১৯১১ সালে নেতানিয়াহুর মায়ের পরিবার ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করে। নেতানিয়াহুর বাবার প্রকৃত নাম ছিল বেঞ্জিয়ন মিলেকস্কি যা পরবর্তীকালে তিনি হিব্রু নেতানিয়াহুতে পরিবর্তন করেন। পোলিশ বসতি স্থাপনকারী মিলেকস্কির সন্তান বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু বিভিন্ন মেয়াদে ১৭ বছর প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে থেকে ইসরাইলের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ানের সময়কালকে অতিক্রম করেছেন। বেন গুরিয়ান ১৩ বছর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
ইসরাইলের রাজনীতিবিদদের ইতিহাস থেকে আমরা জানলাম যে, রাষ্ট্রটির মোট ১৪ প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ৭ জন সরাসরি বাইরে থেকে আসা নিজেরাই বসতি স্থাপনকারী এবং বাকি ৭ জন ফিলিস্তিনের ভূমিতে জন্মগ্রহণ করলেও তাদের প্রত্যেকের বাবা ও মা ইউরোপ কিংবা আমেরিকা থেকে ফিলিস্তিনে এসেছেন। প্রকৃতপক্ষে এদের সবার পরিবার দখলদার এবং কারো ধমনিতে মধ্যপ্রাচ্যের রক্ত ছিল না। কিন্তু তাদের দাবি হলো, ঈশ্বর নাকি তিন হাজার বছর আগে ফিলিস্তিনের জমি সারা বিশ্বের তাবৎ ইহুদিদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কট্টরপন্থি জায়নিস্ট ইহুদিরা মনে করে যে, ফিলিস্তিনের জনগণের ওপর গণহত্যা চালানো এবং তাদের জাতিগত নিধন করা ইহুদি ধর্মের ঈশ্বর দ্বারা কেবল অনুমোদিতই নয়, এটা খুবই পুণ্যের কাজ।
এই ইহুদি ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ফিলিস্তিনের মুসলমান জনগণকে মানুষ বলেই গণ্য করে না। রাষ্ট্র কর্তৃক ক্রমাগত মগজ ধোলাইয়ের ফলে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মধ্যে বর্বরতা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি ঘৃণা এমন দানবীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে তারা পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে গাজায় ত্রাণ নিতে আসা অভুক্ত শিশুদেরও নির্বিচারে গুলি করে মেরেছে। আগেই বলেছি, বিশ্বের জন্য ইসরাইল নামক ভয়ানক রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নসহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সব শক্তিশালী দেশের দায় রয়েছে। তবে সর্বাধিক দায় অবশ্যই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় খেলাফতের পতনের পর ব্রিটেন জেরুসালেমসহ ফিলিস্তিন দখল করে নিয়েছিল। সে সময় তারাই প্রধানত ইউরোপ থেকে ইহুদিদের ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনের জন্য উৎসাহিত করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে হিটলারের বর্বর নাৎসি বাহিনী জার্মানি এবং জার্মান অধিকৃত ইউরোপে ইহুদিদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন চালালে সারা বিশ্বের জনগণ মানবিক কারণে ইহুদিদের প্রতি সমবেদনা অনুভব করেছিল।
সেই ‘ভিকটিমহুডের’ সুযোগ গ্রহণ করে ফিলিস্তিনের ভূমি দ্বিখণ্ডিত করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তৎকালীন দখলদার ব্রিটেন অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ফিলিস্তিনের জনগণকে বাস্তুচ্যুত করা হয় এবং পশ্চিমাদের সমর্থনে তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক ইসরাইল রাষ্ট্র অনুমোদিত হলে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্র ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও আধুনিক অস্ত্রের অভাব এবং সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতায় শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। সেই থেকে মুসলিম বিশ্ব আর উঠে দাঁড়াতে সক্ষম হয়নি।
তদুপরি উম্মাহর মধ্যকার দীর্ঘদিনের অনৈক্যের সুযোগ গ্রহণ করে ইসরাইলের শাসক গোষ্ঠী হিটলারের ইহুদি নিধনের কায়দায় ফিলিস্তিনের জনগণের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অব্যাহত রেখেছে। এক সময়কার ‘ভিকটিমরা’ আজ ইতিহাসের নৃশংসতম জালিমে পরিণত হয়েছে। ২৭ অক্টোবর ইসরাইলে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে নির্বাচনের ফলাফলে দেশটির আগ্রাসী নীতির কোনো পরিবর্তন ঘটবে না বলেই আমি মনে করি। ইসরাইলের ইহুদি ভোটাররা গত কয়েক দশকে এতটাই কট্টরপন্থার দিকে সরে গেছেন যে তারা নিশ্চিতভাবে নেতানিয়াহু কিংবা তার চেয়েও বেশি মাত্রায় ইসলামবিদ্বেষী ও নির্মম কোনো রাজনীতিবিদকেই প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য নির্বাচিত করবেন। উদারপন্থি ইহুদিরা ইসরাইলের রাজনীতি থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন।
১৯৯৩ এবং ১৯৯৫ সালে পিএলও (প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন) নেতা ইয়াসির আরাফাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের চাপে ইসরাইলের সঙ্গে অসলো চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের ভূমিতে ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান মেনে নেওয়ার তিন দশকের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও ফিলিস্তিনের জনগণের মুক্তি আজও মেলেনি। ইয়াসির আরাফাত ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিলেও ইসরাইল সরকার বিভিন্ন অজুহাতে ফিলিস্তিনকে পাল্টা স্বীকৃতি দেয়নি। অসলো চুক্তি স্বাক্ষরের পুরস্কার হিসেবে ইয়াসির আরাফাত, শিমন পেরেস এবং আইজাক রাবিন ১৯৯৪ সালে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেও ফিলিস্তিনের জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এসব পুরস্কার যে এক ধরনের তামাশা, সেটা ১৯৯৪ সালে নোবেল কমিটি পুনরায় প্রমাণ করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ইসরাইলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সম্প্রতি অসলো চুক্তিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে কোনোরকম রাখঢাক না রেখেই ঘোষণা দিয়েছেন যে, ইসরাইল কোনোদিন ফিলিস্তিনের ওপর তার দখলদারিত্ব পরিত্যাগ করবে না। নেতানিয়াহু গাজা এবং পশ্চিম তীর আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন।
দেশটির বসতি স্থাপনকারী ইহুদি সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদতে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ মুসলমানদের বাস্তুচ্যুত করার জন্য প্রতিদিন হামলা চালাচ্ছে। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইহুদি সন্ত্রাসীরা ১৮ শিশুসহ পশ্চিম তীরে ৭৬ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। ইসরাইলের এই সীমাহীন ঔদ্ধত্য ও চরম নির্মমতা দীর্ঘ আটাত্তর বছর বিনা প্রতিবাদে মেনে নেওয়ার পর এই গত সপ্তাহে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা ইসরাইলের ওপর সীমিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। স্পেন, আয়ারল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ড অবশ্য গত বছর ইসরাইলের বিরুদ্ধে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশ শিগগির একই পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যে কেবল জার্মানি ও ইতালি এখনও ইসরাইলকে অন্ধভাবে সমর্থন করে চলেছে।
যাহোক, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, ওয়াশিংটনের ইসরাইল নীতির পরিবর্তন ব্যতিরেকে এই দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রটিকে আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য করার সম্ভাবনা একেবারেই কম। তার ওপর দুর্ভাগ্যবশত মুসলিম বিশ্বের মধ্যে আরব আমিরাত, বাহরাইন, জর্ডান, মরক্কো এবং তিউনিসিয়া যার যার সংকীর্ণ স্বার্থে ইসরাইলকে নির্লজ্জভাবে তোষণ করে চলেছে। অতি সম্প্রতি আলজিরিয়া আরব আমিরাতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। উম্মাহর অভ্যন্তরের চিহ্নিত ইসরাইলি দালালদের বিরুদ্ধে ওআইসিভুক্ত অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্র ঐক্যবদ্ধভাবে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক পদক্ষেপ নিলে হয়তো ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ এমন পর্যায়ে বৃদ্ধি করা সম্ভব হতে পারে, যার ফলে বিশ্বশান্তির জন্য বিপজ্জনক রাষ্ট্রটি আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য হবে।
গাজা, পশ্চিম তীর এবং লেবাননে ইসরাইলি বাহিনীর অব্যাহত গণহত্যার ফলে মার্কিনি তরুণরাও ক্রমেই ইসরাইলের বর্বরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শুরু করেছে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ এবং কানাডা গত সপ্তাহে যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাতে করে আন্তর্জাতিকভাবে ইসরাইলের একঘরে হয়ে পড়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এবং সিনেটের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কট্টর ইসরাইল সমর্থক রিপাবলিকান দল পরাজিত হলে ওয়াশিংটনের ইসরাইল নীতিতেও খানিকটা পরিবর্তন আশা করা যায়। তাই গাজা ও পশ্চিম তীরে এত হতাশার মধ্যেও ফিলিস্তিনের জনগণের মুক্তি হয়তো আর বেশি দূরে নয়Ñএই আশাবাদ ব্যক্ত করে আজকের মন্তব্য প্রতিবেদন সমাপ্ত করছি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


